শিফারুল শেখ
ব্রিটেনে বড়ো জয় পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কনজারভেটিভ পার্টি (রক্ষণশীল দল)। জরিপের ফলকেও তিনি ছাড়িয়ে গেছেন। বলা হচ্ছে, ব্রেক্সিট নামের স্বপ্নকে বিক্রি করেই প্রধানমন্ত্রী বরিসের এই নিরঙ্কুশ জয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যেখানে ৩২৬ আসন দরকার ছিল সেখানে টোরি দল জিতেছে ৩৬৫টিতে। কিন্তু এই জয় বরিসের জন্য সামনে বড়ো দুটি চ্যালেঞ্জ এনে দিয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ব্রেক্সিটের পুরোপুরি বাস্তবায়ন এবং দেশের অখণ্ডতা ধরে রাখা।
বিভক্ত ব্রিটিশ সমাজ
ভোটারদের এক অংশ বলছেন, যেহেতু দেশটির ইতিহাসে ব্রেক্সিটের পক্ষে সবচেয়ে বড়ো রায় এসেছে, তাই ব্রিটেনকে ইইউ ত্যাগ করতেই হবে। অন্যদিকে আরেক অংশ বলছেন, ব্রেক্সিট হলে ব্রিটেনের অর্থনীতির গুরুতর এবং সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হবে। তাই ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন-ইইউ সম্পর্ক ও বাণিজ্য কীভাবে চলবে তা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট চুক্তি হতে হবে। ব্রেক্সিটপন্থিরা বলছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ থাকার ফলে নানাভাবে ব্রিটেনের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা খর্ব হচ্ছে এবং ইউরোপ থেকে ব্যাপকহারে অভিবাসন হচ্ছে যার চাপ ব্রিটেনের অবকাঠামো সামলাতে পারছে না।
বিবিসির রাজনৈতিক সংবাদদাতা রব ওয়াটসনের মতে, ব্রেক্সিট ইস্যুটি এমনভাবে ব্রিটেনকে বিভক্ত করে ফেলেছে যে সপ্তদশ শতকের পর গত ৩০০ বছরে এমনটা আর হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনে আর কখনো এত গভীর রাজনৈতিক সংকট দেখা যায়নি। এই বিভক্তির দুটো দিক আছে। ব্রিটেনের রাজনীতিতে বহুকাল ধরেই লেবার ও কনজারভেটিভ এই দুই দলেরই প্রাধান্য চলছে। দু’দলেরই অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির মূলে ছিল ইইউর সদস্যপদ। ফলে ইইউ ত্যাগের ব্যাপারটা তাদের ভেতর এক বিরাট আলোড়ন তৈরি করবে এটাই স্বাভাবিক। আরেকটা হচ্ছে ব্রিটেনের সমাজে বহুকাল ধরে চলে আসা নানারকম বিভক্তি। উচ্চশিক্ষিত ও অল্প শিক্ষিতদের মধ্যে বিভক্তি, অভিবাসন নিয়ে বিভক্তি, কেউ মাল্টিকালচারাল সংস্কৃতির পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। ব্রেক্সিট এই বিভক্তিগুলোকে আরো প্রকট করে তুলেছে বলে মনে করেন রব ওয়াটসন।
যুক্তরাজ্যে ভাঙন?
ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে বিভক্তির আরো সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া হতে পারে ব্রিটেনের ওপর। স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের অধিবাসীদের বড়ো অংশই চায় ব্রিটেন ইইউতে থাকুক। তাই ব্রেক্সিট হলে যুক্তরাজ্য ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। অন্যদিকে, ব্রেক্সিটে ইউরোপের ঐক্য হুমকির মুখে পড়তে পারে এমন সম্ভাবনার কথাও অনেকে বলেন। এমনকি ইইউ নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করে আসছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইইউ ভাঙার চেষ্টা করছেন। রব ওয়াটসনের মতে, ব্রেক্সিটপন্থিরা হয়তো আশা করছে, যুক্তরাজ্য অক্ষুণ্ন রেখেও ব্রেক্সিট সম্ভব, কিন্তু তারা হয়তো খুব ভেবেচিন্তে কথাটা বলছে না। ব্রেক্সিট যে যুক্তরাজ্যের ঐক্যের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করবে এতে কেউই দ্বিমত করবে না। বরিস জনসন হয়তো ব্রেক্সিট পেতে পারেন কিন্তু তার মূল্য হতে পারে যুক্তরাজ্যের ভেঙে যাওয়া। ব্রিটেনের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কই নির্ভর করছে তাই নয়, বিশ্বে তার অবস্থান, তার পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক মডেল সব কিছুই নির্ভর করছে।
স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতাকামী দল স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) পার্লামেন্টে তাদের আসন সংখ্যা বাড়িয়েছে ১৯টি। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্কটল্যান্ডের জন্য নির্ধারিত ৫৯টি আসনের ৮১ শতাংশই জিতেছে এসএনপি। এসএনপি নেত্রী নিকোলা স্টারজেন বলেছেন, এই ফলাফল স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার জন্য আরেকটি গণভোটের ম্যানডেটকে আরো জোরালো করবে। তিনি বলেছেন, ইচ্ছা না থাকলেও প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে সেই গণভোট করার ক্ষমতা তাকে (স্টারজেনকে) দিতে হবে। যদিও শুক্রবার টেলিফোন আলাপে প্রধানমন্ত্রী বরিস বলেছেন, তিনি এই অনুমতি দেবেন না। উত্তর আয়ারল্যান্ডে ডিইউপি দলের ভরাডুবি হয়েছে। এই প্রথমবারের মতো, জাতীয়তাবাদী দলগুলো ব্রিটেনের সঙ্গে থাকতে চায় এমন দলগুলোর চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে।
ইইউ ছাড়তে প্রধানমন্ত্রী বরিস যে ব্রেক্সিট চুক্তি করেছেন, তাতে ইইউর সঙ্গে উত্তর আয়াল্যান্ডের যে সম্পর্কের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে তা যুক্তরাজ্যের অন্যান্য অংশের থেকে আলাদা। বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণের সময় নিজেকে বর্ণনা করেছেন ‘অখণ্ডতার পক্ষের মন্ত্রী’ হিসেবে। সেটা তিনি করেছেন সঙ্গতকারণেই অর্থাত্ ব্রিটেন ভেঙে যেতে পারে এমন আশঙ্ক থেকেই। কাজেই ব্রিটেনকে একসঙ্গে রাখা অর্থাত্ ইংল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের অখণ্ডতা টিকিয়ে রাখার চাপটা সামলানো খুবই চ্যালেঞ্জের।
ব্রেক্সিটও চ্যালেঞ্জ
সাংবাদিক ক্রিস মরিসের মতে, প্রধানমন্ত্রী বরিসকে এখন অনেক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। এখন এটা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছে যে ব্রিটেন ৩১ জানুয়ারি ইইউ থেকে বেরিয়ে যাবে। সেটা আইনগত দিক দিয়ে প্রতীকী অর্থে একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিন। এরপরও আছে আরো অনেক প্রতিশ্রুতি।
প্রথমত, ২০২০ সাল শেষ হওয়ার আগেই প্রায় রেকর্ড সময়ের মধ্যে ইইউর সঙ্গে একটা বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। কারণ ইইউ ছাড়ার পর বাণিজ্য ব্যবস্থা চূড়ান্ত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সময়সীমা শেষ হবে ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ সালে। সেটা প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটা কঠিন কাজ হবে যদি বরিস চান যে বর্তমানে ইইউর যেসব নিয়মবিধি ব্রিটেন মেনে চলে সেগুলো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা ব্রিটেন চায়।
দ্বিতীয় অঙ্গীকার হচ্ছে— বরিস বলেছেন, তিনি ব্রেক্সিট পরবর্তী এই অন্তর্বর্তী সময়ের মেয়াদ বাড়াতে চান না। কাজেই তার বাণিজ্য চুক্তি যদি সময়মতো তৈরি না হয় তিনি কী করবেন? তাহলে কি তিনি অঙ্গীকার ভঙ্গ করে সময়সীমা বাড়াবেন, নাকি চুক্তি ছাড়াই ইইউ থেকে বেরোনোর একটা নতুন পথ তিনি খুঁজবেন? তাই ৩১ জানুয়ারির পর তাকে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা পার হতে হবে। এখন সব দৃষ্টিই এই ব্রেক্সিট প্রশ্নকে ঘিরেই। কাজেই ৩১ জানুয়ারি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। সেদিন আইনগতভাবে ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু ইইউর সঙ্গে ভবিষ্যত্ সম্পর্কের কাঠামো কী হবে সেই গোটা ব্যাপারটার মীমাংসা করাই হবে তার জন্য সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ।