দাসত্বশৃঙ্খল হইতে মুক্তির মহান এই দিন

শতাধিক বত্সর পূর্বে কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বলিয়া গিয়াছেন—স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়/ দাসত্বশৃঙ্খল কে পরিবে পায় হে কে পরিবে পায়।’ আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আমরা স্বাধীনতার সূর্যকে আমাদের পলিমাটির পূর্বদিগন্তে উদয় ঘটাইতে পারিয়াছি। পাইয়াছি একটি স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ড, পাইয়াছি আত্মপরিচয়। ইহার মূল্য যে কী অপরিসীম—তাহা স্বাধীনতার জন্য যাহারা যুগ যুগ ধরিয়া রক্ত দিয়া যাইতেছে, মাথা কুটিতেছে অন্ধকুঠুরিতে—তাহারাই সবচাইতে ভালো জানেন। যদিও বিজয়ের এই সূর্য ছিনাইয়া আনিতে আমাদের মূল্য চুকাইতে হইয়াছে এক সাগর রক্ত। ত্রিশ লক্ষ শহিদ আর দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিয়মে অর্জিত হইয়াছে এই বিজয়। এই কারণে এই বিজয় আমাদের কাছে এত বেশি আবেগের, ভালোবাসার। এই জন্য বিজয়ের এই দিনটির অনুভূতি তুলনারহিত। অনিঃশেষ ইহার অনুরণন। এই দিনটিই ছিল সেই অভাবিত মাহেন্দ্রক্ষণ—যাহার জন্য এই জনপদের মানুষ হাজার বত্সর ধরিয়া বুনিয়া আসিতেছিল একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের অমরাবতীর স্বপ্ন।

স্বাধীনতার পূর্বে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি দুঃশাসনের দগদগে স্মৃতি এখনো আমাদের স্মৃতি হইতে মুছিয়া যায় নাই। পাকিস্তানের অত্যাচার-নিপীড়ন আর সীমাহীন বঞ্চনার শৃঙ্খল ভাঙিয়া বাহির হইয়া আসিবার অভিপ্রায়ে পঞ্চাশ-ষাটের দশক হইতেই এই দেশের সূর্যসন্তানেরা দিনের পর দিন জেল-জুলুম-অত্যাচারের শিকার হইয়াছিলেন। শত অত্যাচার দমন-পীড়নেও কেহ মাথা নত করেন নাই। এইজন্য একাত্তর মানে মাথা নত না করা। এই একাত্তরের সাতই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছিলেন—‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অতঃপর ২৫ মার্চের কালো রাত এবং ২৬ মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণা। দীর্ঘ প্রায় নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে সকল দিক দিয়া বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত আমাদের যেইভাবে সহযোগিতা করিয়াছিল, তাহারও তুলনা হয় না। বিজয়ের সকল সূর্যসন্তানকে আমরা জানাই অন্তর নিঃসৃত অসীম ভালোবাসা। এই বিজয়ের মাধ্যমেই আমাদের সম্মুখে খুলিয়া যায় সম্ভাবনার অসীম দিগন্ত। যদিও স্বাধীনতার পরপর বলা হইয়াছিল এই দেশটি যেন একটি তলাবিহীন ঝুড়ি! কিন্তু বিজয়ের ৪৮ বত্সর পর আমরা বিশ্বের কাছে প্রমাণ করিতে পারিয়াছি, অসীম আকাশের মতোই সম্ভাবনার উজ্জ্বল দিগন্তে আমরাও ফানুস উড়াইতে পারি। ব্যর্থতার পরিসংখ্যান সকলেই জানেন, তবে অর্জন যাহা হইয়াছে তাহা সার্বিক ব্যর্থতাকে ছাপাইয়াই বিশ্বের কাছে সমীহ অর্জন করিয়াছি আমরা। সেই অভাবনীয় অর্জন দিনদিন মূর্ত হইয়া উঠিতেছে সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে। আর এইভাবেই বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার প্রত্যয়দীপ্ত পদশব্দ স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। বাংলাদেশ এখন আর কাহারো অবহেলার পাত্র নহে।

আমাদের নূতন প্রজন্ম ইহা যেন কখনো ভুলিয়া না যায়—স্বাধীনতার পরবর্তীকালে আমাদের যেই অর্জন সম্ভব হইয়াছে—তাহার নেপথ্যে রহিয়াছে আসমুদ্র রুধিরধারার আত্মত্যাগ। আমরা যদি বাংলাদেশকে একটি কল্যাণকর ও উন্নত রাষ্ট্র হিসাবে গড়িয়া তুলিতে পারি, তবেই না এই নিযুত নিযুত মানুষের আত্মত্যাগের প্রতি সত্যিকারের সম্মানজ্ঞাপন করা হইবে। আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য ইহাই হওয়া উচিত।