জনবল সংকটে রেলওয়ে

আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থায় রেলওয়ের আলাদা গুরুত্ব রহিয়াছে। আমরা দেখিতে পাই, উন্নত দেশগুলিতে রেল যোগাযোগব্যবস্থা কতটা অত্যাধুনিক। ইহার পিছনে কারণও রহিয়াছে :পাশাপাশি রেল সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম। আমাদের মতো অধিক জনঘনত্বপূর্ণ দেশে ইহা আরো প্রযোজ্য। ইহার সহিত আমাদের অধিকাংশ ভূমিরূপ সমতল হওয়ায় এইখানে রেলব্যবস্থা গড়িয়া তোলা অপেক্ষাকৃত সহজতর। ১৮৬২ সালে দর্শনা হইতে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেল যুগে প্রবেশ করে। ইহার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হইয়াছে। সম্প্রসারিত হইয়াছে রেলওয়ে। বর্তমানে ৪ হাজার ৪৪৩ কিলোমিটার রেলওয়ে লাইন রহিয়াছে; কিন্তু সার্বিকভাবে দেশের রেলব্যবস্থা কতটা উন্নত ও যাত্রীবান্ধব হইয়াছে তাহা লইয়া প্রশ্ন আছে। ব্যবসায়ের দিক দিয়া বিবেচনা করিলে ইহা লাভজনকও নহে। রেলওয়ের যখন সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করিবার কথা তখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইহার আরও অবনমন ঘটিতেছে। সম্প্রতি প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রেলপথমন্ত্রী জানাইয়াছেন, জনবল সংকটে সারাদেশে ১০৪টি রেল স্টেশন বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। জানা যায়, মূলত স্টেশন মাস্টারের অভাবে স্টেশনগুলি বন্ধ হইয়াছে। তিনি আরো জানাইয়াছেন, সত্তরের দশকে রেলের জনবল ছিল ৭০ হাজারে, ইহা এখন কমিয়া আসিয়া দাঁড়াইয়াছে ২৭ হাজারে। রেলওয়ে কারখানাগুলিতে যেইখানে যাত্রীবাহী কোচ, ওয়াগন তৈরি করা হয় সেইখানকার ৪/৫ হাজার শ্রমিকের জায়গায় এখন আছে মাত্র ১ হাজার ১০০ হইতে ১ হাজার ২০০ শ্রমিক।

 রেলওয়েতে ১৯৮৬ সালের পর হইতে নতুন কোনো নিয়োগ দেওয়া হয় নাই। ফলে অভিজ্ঞ লোকের অভাব দেখা দিয়াছে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের যে সক্ষমতা রহিয়াছে তাহা দিয়া আপ-ডাউন মিলাইয়া ২২টি ট্রেন চলিবার কথা; কিন্তু সব মিলাইয়া চলিতেছে ৪২টি ট্রেন। ইহার ফলে রেলের শিডিউল বিপর্যয় হয়। আমরা সরকারের তরফ হইতে রেলওয়ের উন্নয়নের কথা শুনিতেছি। ২০১১ সালে আলাদা করিয়া রেল মন্ত্রণালয় গঠন করা হইয়াছে। কমলাপুর হইতে টঙ্গী চার লেন এবং টঙ্গী হইতে জয়দেবপুর দুই লাইন হইবে। আখাউড়া হইতে লাকসাম ডাবল লাইন হইতেছে। বঙ্গবন্ধু ব্রিজে নূতন করিয়া ডেটিকেটেড রেলব্রিজ হইবে। এইসব উন্নয়নের মধ্যেও যদি লোকবলের অভাব থাকিয়া যায় তাহা হইলে রেলওয়ে জনবান্ধব হইতে পারিবে বলিয়া মনে হয় না। যে, বিপুল পরিমাণ লোকবলের ঘাটতি রহিয়াছে তাহা লইয়া রেলওয়ে কোনোরকমে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া চলিতে পারে; কিন্তু ইহা দ্বারা কখনই একটি উন্নত রেলব্যবস্থা গড়িয়া তোলা যাইবে না।

ইহা ছাড়া সারাদেশে রেলের ১ হাজার ৪০২টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ৯৪৬টিতে কোনো গেটকিপার নাই। ইহার মধ্যে পূর্বাঞ্চলে গেটকিপারবিহীন অরক্ষিত ক্রসিং রহিয়াছে ৪৩৪টি ও পশ্চিমাঞ্চলে ৯৬৮টি। এই সকল সংকটের অবসান ঘটাইতে রেলওয়েতে আশু লোকবল নিয়োগ দিতে হইবে। যাহাদের নিয়োগ দেওয়া হইবে তাহাদের অবশ্যই দক্ষ, কর্মঠ ও দায়িত্বশীল হইতে হইবে। রেলওয়ের উন্নয়ন সার্বিকভাবে দেশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখিতে পারে।  আমরা আশা করি, চলমান সংকট কাটাইয়া রেলওয়ে একটি উন্নত আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে পারিবে।