ঢাকায় একটি গেরিলা অপারেশন

মোসলেহউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী

২৫ মার্চ, ১৯৭১। বাঙালিদের জীবনে নৃশংসতম কালোরাত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শুরু করে পৈশাচিক গণহত্যা। প্রতিরোধ গড়ে তোলে বাঙালি জাতি। ছাত্র, সাধারণ জনতা, সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার-সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার  জীবনকে বাজি রেখে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দেশে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজমান আছে তা প্রমাণ করার জন্য জুলাই ১৯৭১ এস এস সি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ঠিক একই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশনা এস এস সি পরীক্ষা বর্জন কর—শীর্ষক কিছু লিফলেট আমার হাতে এসে পড়ে। আমি নিজে এস এস সি পরীক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেই এবং অন্যদের পরীক্ষা থেকে বিরত রাখার জন্য স্থানীয়ভাবে যথাসম্ভব কারফিউ চলাকালীন সময়েও অলি-গলি দিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষার্থীর বাড়িতে লিফলেটগুলো ছড়িয়ে দেই। এ ব্যাপারে আমাকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবু জাফর শামস্উদ্দিন আহমেদের ছেলে পারভেজ (বর্তমানে কানাডাতে বসবাসরত)।

এস এস সি পরীক্ষার প্রথম দিন অর্থাত্ ১৫ জুলাই, ১৯৭১ (বৃহস্পতিবার) যথাসম্ভব আরো লিফলেট ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে মালিবাগ থেকে আজিমপুর গার্লস স্কুলসংলগ্ন (৩৪-এইচ আজিমপুর কলোনিতে) আমার খালাতো ভাই সাঈদুর রহমান চৌধুরীর (মিন্টু) সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাকে তাত্ক্ষণিকভাবে তার এক পরিচিত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। পরিচিত হওয়ার পর আমি তাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সীমান্তের ওপারে ট্রেনিংয়ের বিষয়ে সহযোগিতা চাই। তিনি আমাকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করার জন্য পাশের একটি বাসায় নিয়ে যান ও আমার হাতে একটি গ্রেনেড তুলে দিয়ে তা কিভাবে বিস্ফোরণ ঘটাতে হয় কয়েকবার বুঝিয়ে দেন এবং বলেন, এ গ্রেনেডটি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য আজিমপুর গার্লস স্কুল মাঠে বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে।

১৫ জুলাই, ১৯৭১ (বৃহস্পতিবার) তখন প্রথম দিনের প্রথম সেশনের বাংলা পরীক্ষা চলছিল। বাইরে তখন বৃষ্টি। আমি দ্বিতীয় পর্বের পরীক্ষার সময়ে আনুমানিক বেলা আড়াইটার দিকে মাঝারি বৃষ্টির মধ্যে গ্রেনেডটি বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রস্তুতি নিয়ে আজিমপুর মেটারনিটির পেছন দিক দিয়ে আজিমপুর গার্লস হাইস্কুলের দেওয়ালের সঙ্গে অবস্থান গ্রহণ করি। এবং নির্দেশমতো সুযোগ বুঝে দেওয়ালের ওপর দিয়ে স্কুলের পূর্ব-দক্ষিণ কোণের মাঠে গ্রেনেডটি বিস্ফোরণ ঘটাই। তখন স্কুলের ছাদে অবস্থানরত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গ্রেনেড বিস্ফোরণের স্থানে গুলি ছুড়তে শুরু করে। আমি ত্বরিত সেখান থেকে দৌড়ে আজাদ অফিসের সামনে দিয়ে সরে পড়ি। এ ঘটনার পর আমি আমার মালিবাগের বাসায় না গিয়ে সদরঘাট হয়ে মুন্সিগঞ্জে আমার দূর সম্পর্কের এক নানার বাসায় চলে যাই। উদ্দেশ্য ছিল সেখান থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা। উল্লেখ্য যে, নানা জানতেন আমার মেজোভাই সালাহ্উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী(হেলাল) এরই মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তাই আমার বয়স এবং পরিবারের কথা বিবেচনা করে আস্থাভাজন লোক মারফত আমাকে জোরপূর্বক ঢাকার মালিবাগের বাসায় মা-বাবার কাছে পৌঁছে দেন।

এখানে আরো উল্লেখ্য যে, আমার মেজো ভাই সালাহ্উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী (হেলাল) প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িত্ কৌশল বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। এ সূত্রে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে আরো বলা প্রয়োজন যে, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আমার মেজো ভাই সালাহ্উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের একজন মহান শহিদ। তার নাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য শাখার মূল ফটকের পাশে, উল্লিখিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও কর্মী যারা মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে নির্মিত শহিদ স্মৃতিফলকে লিপিবদ্ধ আছে।

আমাদের পরিবারে আরো একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হলো, আমার বড়ো ভাই মিনহাজ আহমেদ চৌধুরী যিনি তখন আমেরিকান ওষুধ কোম্পানি অ্যাবট ল্যাবরেটরিজে কর্মরত ছিলেন। তিনি ও তার বন্ধু মইনুল ইসলাম (স্বপন) প্রয়াত ১৯৭১ সালের, এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে আমাদের মালিবাগের বাসায় একটি ফুটফুটে বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে আসেন। তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে বাচ্চাটির মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার জন্য বোনদের নির্দেশ প্রদান করেন। বাচ্চাটি দুদিন আমাদের বাসায় ছিল। আমার বড়ো ভাই বাচ্চাটির নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে যত দ্রুত সম্ভব তার বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এবং বাচ্চাটিকে তার এক আত্মীয়/পরিচিত স্বজনের কাছে হস্তান্তর করেন।

এখানে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এস এস সি পরীক্ষা ভণ্ডুল করার বিষয়টি এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত ঢাকায় গেরিলাযুদ্ধ ১৯৭১ পুস্তকের ৩৩০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে। একইসঙ্গে শহিদ জননী জাহানারা ইমামের লেখা :Of Blood And Fire-The Untold Story of Bangladesh’s War of Independence বইয়ের ১২৪ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে।

n লেখক :মুক্তিযোদ্ধা