১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বহুকাঙ্ক্ষিত বিজয় এলো। বাংলাদেশ তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, হাহাকার। মানুষের খাবার নেই, ঘরবাড়ি ঠিক নেই। সদ্য স্বাধীন দেশে চারপাশে অভাব-অনটন-সংকট। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি সামাল দেওয়াই ছিল বড়ো চ্যালেঞ্জ। বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির জন্য ছিল না নিজস্ব কোনো বৈদেশিক মুদ্রা তহবিল বা রিজার্ভ। এমনকি সে সময় বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো মুদ্রাও ছিল না। ফলে পুরোটাই ছিল বিদেশি সাহায্য নির্ভর। এখন বিজয়ের ৪৮ বছরে উলটো চিত্র হয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
স্বাধীনতার পর অর্থনীতির স্বস্তিদায়ক জায়গাগুলোর অন্যতম ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায় আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য বাংলাদেশের সক্ষমতাও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রার মজুদ থাকতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে এখন যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে, তাতে সাড়ে ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটর-এর সর্বশেষ প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শূন্য থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার যে পথচলা শুরু হয়েছিল, আজ তা ৩ হাজার কোটি ডলারের ওপরে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রায় বাংলাদেশ স্বস্তিদায়ক অবস্থানেই রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একবার সর্বোচ্চ উঠেছিল ৩৩ দশমিক ৬০ বিলিয়ন (৩ হাজার ৩৬০ কোটি) ডলারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে গত ১১ ডিসেম্বর রিজার্ভের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ২২০ কোটি ডলার। ফলে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে হলে সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যান্য সূচকের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও রিজার্ভ ইস্যুতে সংকটে পড়ার আশঙ্কা নেই বাংলাদেশের।
বৈদেশিক সাহায্য ও অনুদানই ছিল স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উত্স। আর এর ওপর ভর করেই গড়ে উঠে রিজার্ভের ভিত্তি। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ২৭ কোটি ডলারে। এরপর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তালিকায় যুক্ত হয় রপ্তানি খাত। ১৯৭৪ সালে প্রবাসীদের আয়ও এতে যোগ হয়। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উত্স হচ্ছে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়। এ দুটি খাতই বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ভিত শক্ত করে ধরে রেখেছে। ফলে এক সময়ে সাহায্যনির্ভর হলেও বর্তমানে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে আছে আমাদের অর্জনের ওপর। মূলত, বিভিন্ন নীতিগত সহায়তার ফলে বাংলাদেশের রিজার্ভ বাড়তে থাকে ৯০ দশকের পর থেকে। ২০১০ সাল থেকে রপ্তানি খাতে বিভিন্ন প্রণোদনা ও প্রবাসী আয় যোগ হওয়ায় রিজার্ভেরও পরিমাণ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য মতে, স্বাধীন বাংলাদেশের এক দশক পরে ১৯৮০ সালে এই রিজার্ভ দাঁড়ায় ২৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারে, যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। ১৯৯০ সালে তা ৬২ কোটি ৮০ লাখ হয়ে যায়। ২০০০ সালে হয় ১৪৮ কোটি ৬০ লাখ।
গত কয়েক বছরে আগের তুলনায় দ্রুত গতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৯ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬ সালের ২১ জুন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে।