১৮ ডিসেম্বর সারাদেশে পালিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ২০১৯। ‘দক্ষ হয়ে বিদেশ গেলে, অর্থ-সম্মান দুই-ই মেলে’। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯ ডিসেম্বর সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অভিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানমালা প্রধান অতিথি হিসেবে উদ্বোধন করবেন। টেকসই ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাসহ শ্রমবাজার সম্প্রসার করতে প্রয়োজনীয় দিক তুলে ধরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ও ভবিষ্যতে করণীয় নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম রেজাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও অভিবাসী দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আশা করা যাচ্ছে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি করে নিরাপদ ও টেকসই অভিবাসন নিশ্চিত করতে এই দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, যা প্রবাসী আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকাকে আরো গতিশীল ও বেগবান করবে।
কেননা উন্নত ও ভারী শিল্প তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও বিকাশ না হওয়ায় আমাদের রপ্তানি আয় মূলত তৈরি পোশাকশিল্প-নির্ভর হয়ে পড়েছে। কিন্তু চীন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম ও ইথিওপিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। গত টানা চার মাসে পোশাক রপ্তানির আয় ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে দশমিক .৩৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ১ দশমিক ১৬ শতাংশ, অক্টোবরে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং নভেম্বরে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ পোশাক রপ্তানি কমে যায়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন প্রবাসী আয় ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নিম্নমুখী। তাই প্রবাসী আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরো গতিশীল করা খুবই জরুরি।
প্রতি বছর শিক্ষিত-অশিক্ষিত, দক্ষ-অদক্ষ মিলিয়ে ২২-২৫ লাখ কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে আমরা মাত্র ৭ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারি। কর্মসংস্থানে সরকারি খাতের অবদান মাত্র ৩.২ শতাংশ। আর বাকি চাহিদা পূরণ করে বেসরকারি খাত। তন্মধ্যে অভিবাসী খাতের মাধ্যমে অনেকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতটি হলো এই অভিবাসী খাত। তাই অভিবাসী খাতেও রেডিমেইড গার্মেন্টস বা আরএমজি খাতের ন্যায় সব ধরনের সরকারি প্রণোদনাসহ পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা প্রয়োজন। আমি মনে করি আরএমজি খাতের মতো অভিবাসী খাতটিও যদি সরকারের সব ধরনের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সুবিধা পায় তাহলে এই খাতটিও ফরেন রেমিট্যান্স অর্জনে পোশাক রপ্তানি খাতকে ছাড়িয়ে যাবে। তবে এখন সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন জনশক্তি পাঠানোর খাতে আরো শৃঙ্খলা আনা। সেজন্য রিক্রুটিং এজেন্টগুলোকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে আরো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তৈরি করে অভিবাসন খাতকে আরো বেশি এগিয়ে নিতে হবে। তবেই বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের অবস্থান আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী করতে পারবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৪৩২ জন নারী কর্মী গমন করে। এসব নারী কর্মীর বেশিরভাগই হতদরিদ্র, বিধবা অথবা স্বামী পরিত্যক্তা। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অনিরাপদ কর্মপরিবেশের কারণে প্রায় ৩ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরে এসেছে। গত ৪ বছরে ১৫২ জন নারী কর্মী মারা গেছেন বিদেশে। চলতি বছর ৫০ জনেরও বেশি নারী কর্মীর লাশ দেশে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বেসরকারি এনজিওসহ কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারী গৃহকর্মী না পাঠানোর কথা বলছে। কিন্তু এই যে লাখ লাখ বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও অসচ্ছল নারী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে নিজের ও পরিবারের অভাব দূর করে ছেলেমেয়েদের লেখপড়া শেখানো, নতুন ঘরবাড়ি তৈরি, সঞ্চয় বৃদ্ধি করাসহ সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন তাও কিন্তু আমাদের ভেবে দেখতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা যদি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিই তাহলে এই সব অসচ্ছল নারীদের কর্মসংস্থান কীভাবে তৈরি হবে। তাই এখনই উপযুক্ত সময়, মধ্যপ্রাচ্যে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধের কথা না ভেবে কীভাবে বেশি নিরাপদ ও টেকসই করে তাদের পাঠানো যায়, সেটা নিয়ে ভবিষ্যত্ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা উচিত।
তবে আশার দিক হচ্ছে প্রবাসীকল্যাণ সচিব সেলিম রেজার নেতৃত্বে গত ২৭ নভেম্বর রিয়াদে অনুুষ্ঠিত যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে নারী কর্মী পাঠানোয় প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যার মাধ্যমে সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি নারী কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা যায়। একই সঙ্গে মাননীয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যে নারী কর্মী পাঠানোয় আরো বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাই সৌদি আরবে আরো বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে নিরাপদভাবে নারী কর্মী পাঠানো গতিশীল করা উচিত। তাই এই বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে নারী কর্মী পাঠানোয় সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে একযোগে কাজ করবে বলে আশাবাদী হতে চাই। তাহলেই কেবল আমরা পুরুষ কর্মী পাঠানোর পাশাপাশি মর্যাদাশীলভাবে নারী কর্মী পাঠানোকেও নিরাপদ ও টেকসই করা সম্ভব হবে।
n লেখক :শ্রম-অভিবাসন বিশ্লেষক এবং চেয়ারম্যান,
ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি