চিকিত্সাসেবা কেন বিদেশমুখী?

চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের কাছে তার এক শিষ্য জানতে চেয়েছিলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক উপাদানগুলো কী কী?’ জবাবে কনফুসিয়াস বলেন, ‘খাদ্য, নিরাপত্তা এবং জনগণের আস্থা অর্জন’। শিষ্য পুনরায় জানতে চাইল, ‘দুর্যোগ মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে যদি কোনো কিছু উত্সর্গ করতে হয়, তবে সেটি কী?’ কনফুসিয়াস উত্তরে বলেন, ‘খাদ্য বা নিরাপত্তা যদি বিসর্জন দিতেও হয়, তবুও জনগণের আস্থা যেন কখনো না হারায়।’ আমাদের দেশে চিকিত্সা ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট দৃশ্যমান। আমরা সবাই কম-বেশি চিকিত্সাসেবা নিয়ে শঙ্কিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা রোগে আক্রান্ত অসংখ্য মানুষ চিকিত্সার উদ্দেশ্যে অন্য দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। উচ্চবিত্তরা সিঙ্গাপুর ও ব্যাংককে ছুটছেন; আর মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষ যাচ্ছেন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। এর ফলে দেশ হচ্ছে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং বিতর্কিত হচ্ছে আমাদের চিকিত্সা খাতের মান। এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন আসতেই পারে, তবে কী আমাদের দেশের চিকিত্সকরা অযোগ্য?

 মোটেই বিষয়টি তা নয়। সম্প্রতি আমার দুই নিকট আত্মীয় সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে জখম হলে জরুরি ভিত্তিতে একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। আমিও সেই সুবাদে হাসপাতালে বেশ কিছু দিন ছিলাম। আমাদের হাসপাতালগুলোর চিকিত্সাসেবার অপর্যাপ্ততা, সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার কিছু বাস্তবচিত্র খুব কাছ থেকে দেখেছি। হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সা সরঞ্জামের অপর্যাপ্ততা দেখে মনে হয়েছে ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’ এ কথাটা এদেশের ডাক্তারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সংগতিপূর্ণ। হাসপাতালগুলোতে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ রোগী বেশি থাকেন প্রতিদিন। বহির্বিভাগে সামর্থ্যের চেয়ে তিন চার গুণ বেশি রোগী দেখতে হয় ডাক্তারদের। স্বাভাবিকভাবেই সব রোগীর প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। কোনো কোনো ডাক্তারের আচরণগত সমস্যা আছে, তা বিবেচনায় নিয়েই বলছি। ডাক্তাররা প্রতিদিন তার সামর্থ্যের বাইরে পরিশ্রম করছেন। যোগ্যতার প্রশ্ন যদি আসে তবে বলতেই হয়, এইতো কিছু দিন আগে দেশের সরকারি হাসপাতালে প্রথমবারের মতো মিনিমালি ইনভাসিব কার্ডিয়াক সার্জারি করা হয়েছে, যেখানে বুক ফাঁক না করে, পাঁজরের হাড় না কেটে সফল অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। বোনমেরো ট্রান্সপ্লান্টেশন থেকে শুরু করে লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্তদের স্টেমসেল প্রতিস্থাপন করার মতো সাফল্য বাংলাদেশের ডাক্তারদের রয়েছে। এত সাফল্য থাকার পর বাংলাদেশের ডাক্তারদের অবহেলার কোনো অবকাশ থাকতে পারে না। আমাদের দেশে চিকিত্সা ক্ষেত্রে প্রকৃত সমস্যা হচ্ছে হাসপাতাল বা চিকিত্সা ব্যবস্থাপনার। চিকিত্সক চিকিত্সা ব্যবস্থাপনার একটি অংশ মাত্র। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না, আমাদের দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনা প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সংগঠনের নেতারা এবং তারা সরাসরি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। দেশের চিকিত্সা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে এসব অসাধু কর্মচারীরা যাতে কোনো হাসপাতালে আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে সেজন্যে ক্রমাগত বিভিন্ন হাসপাতালে তাদেরকে বদলি প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখা উচিত। পর্যাপ্ত চিকিত্সা সরঞ্জাম ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা করাসহ প্রতিটি হাসপাতালকে দালালমুক্ত করা উচিত। দেশের চিকিত্সকদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে অপপ্রচার বন্ধ করতে হবে। মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর বলেছিলেন ‘নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়?’ আমাদের বর্তমান সমাজে প্রতিটা পেশার লোকের মধ্যেই পচন ধরেছে। ডাক্তাররাও সেটা থেকে রেহাই পাবে না, এটাই স্বাভাবিক। দেশ থেকে প্রতি বছর চিকিত্সা বাবদ যে পরিমাণ অর্থ বিদেশি ডাক্তারদের হাতে চলে যাচ্ছে, তা দিয়ে বিশ্বের যে কোনো বড়ো হাসপাতালের মতো কয়েকটি বিশ্বমানের চিকিত্সাকেন্দ্র বাংলাদেশেই করা সম্ভব হতো।

n লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়