পেঁয়াজ চাষে ঝুঁকছেন পাবনার চাষিরা

পাবনা প্রতিনিধি

পাবনা অঞ্চলের কৃষক পেঁয়াজ চাষে ঝুঁকেছেন। মূলকাটা (কন্দ) পেঁয়াজ লাগিয়ে উত্পাদনকারী চাষিরা ইতিমধ্যে ফসলের উচ্চমূল্য পেয়েছেন। তারা এই  চাষের পেঁয়াজ ঘরে তোলার সময় ভালো দামের আশায় পেঁয়াজের আমদানি বন্ধের দাবি করেছেন। পাশাপাশি পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। পেঁয়াজ আবাদে কৃষকদের পরামর্শসহ বিভিন্ন সহযোগিতা প্রদান করছে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট।

পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আজাহার আলী সোমবার জানান, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুসারে দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা রয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টন। এর এক চতুর্থাংশের বেশি পেঁয়াজের যোগান আসে পাবনা জেলা থেকে। এ কারণে পাবনাতে পেঁয়াজ আবাদ বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। চলতি রবি মৌসুমে পাবনা জেলার ৯ উপজেলায় ৪৯ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ভেতর সুজানগর উপজেলাতেই আবাদ হবে ১৮ হাজার ৪০০ হেক্টর। এরপর সাঁথিয়া উপজেলাতে ১৬ হাজার ৯৭০ হেক্টর। বাদবাকি অন্যান্য উপজেলাতে। এ আবাদ থেকে প্রায় ৭ লাখ টন পেঁয়াজ উত্পন্ন হবে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে পেঁয়াজের আবাদ ত্বরান্বিত করার জন্য কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছেন।  ইতিমধ্যে অনেক জমিতে পেঁয়াজের চারা লাগানো হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার আশা করা যায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হবে। তার আশা, এ পেঁয়াজ উত্পাদন হলে দেশের মোট পেঁয়াজের চাহিদার এক চতুর্থাংশের যোগান দিতে পারবে এ জেলা।

জেলার সুজানগর ও সাঁথিয়া  উপজেলায় গিয়ে দেখা যায়, পেঁয়াজ আবাদের জন্য ইতিমধ্যে ছোটো ছোটো প্লট করে চারা উত্পাদন করেছে কৃষক। মূলকাটা পেঁয়াজ লাগিয়ে আগাম যেসব পেঁয়াজ আবাদ করা হয়েছিল সেসব উচ্চমূল্যে বিক্রি করে দিয়েছেন কৃষকরা। মূলকাটা পেঁয়াজে খুশি সুজানগরের কৃষক ইসহাক আলি (৫৬)। তিনি বলেন, তিনি বাড়ি সংলগ্ন ১৬ শতক জমিতে মূলকাটা পেঁয়াজ লাগিয়েছিলেন। প্রতি  কেজি পেঁয়াজ ৮০ টাকায় বিক্রি করেছেন। যেহেতু দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে, তাই আবার চারা পেঁয়াজ  লাগানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই ১৬ শতক জমির পেঁয়াজ তিনি ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। তার দাবি মৌসুমি পেঁয়াজ চৈত্র-বৈশাখ মাসে ঘরে ওঠার সময় যেন বিদেশ হতে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। না হলে পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাবে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পাবনা অঞ্চলের একজন কর্মকর্তা বলেন, সুজানগরের বিল গন্ড হস্তি বা গাজনার বিল জুড়েই আবাদ হয় পেঁয়াজের। বিলে পদ্মা-যমুনার তীরবর্তী বর্ষা মৌসুমে পানি প্রবেশ করে পলি মাটি পড়ার কারণে জমির উর্বরতাশক্তি বেশি থাকায় সেখানে পেঁয়াজের ফলন আশাতীত হয়ে থাকে। যে কারণে গাজনার বিলে কৃষকরা রবি মৌসুমে শুধু পেঁয়াজ আবাদ করে থাকে।

সাঁথিয়া  উপজেলার নারিন্দা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক দুলাল সরকার (৬২) বলেন, কয় দিনের মধ্যে জমিতে পেঁয়াজ লাগাব, মাস তিনেক পর ঘরে তুলতে পারব। দুঃখ করে বললেন, পেঁয়াজ করে লাভ কী। রাখার জন্যে হিমাগার তো নাই। পেঁয়াজ সারা বছর রাখা গেলে অন্য দেশ থেকে তো আর আনতে  হয় না। পাবনায় সবজি, পেঁয়াজ, রসুন, সিম পর্যাপ্ত হয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ এগুলো রাখবার জন্যে তিনি যেন একটা হিমাগার করেন।

 এদিকে পাবনা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. ফারুক হোসেন জানান, চলতি রবি মৌসুমে রাজস্ব খাতের আর্থিক সহায়তায় সুজানগর ও আটঘরিয়া উপজেলাতে ১০০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাটি পরীক্ষা করে সার সুপারিশমালা দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে পেঁয়াজ আবাদের ঘাঁটি সুজানগরের গাজনার বিলে মাটি পরীক্ষা করে কৃষকদের সার সুপারিশমালা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পেঁয়াজের উত্পাদন বৃদ্ধি পাবে। বাকি সাতটি উপজেলাতে সরকারি নির্দেশনা ও আর্থিক যোগান না থাকায় পেঁয়াজ আবাদের জন্য সার সুপারিশমালা দেওয়া সম্ভব হয়নি।