জাতিসংঘের আয়োজনে প্রতি বত্সরই জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। ‘কপ২৫’ নামে পরিচিত এইবারের সম্মেলন ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের সকল দেশকে ‘ন্যাশনাল ক্লাইমেট অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরির কাজ শেষ করিতে হইবে। অর্থাত্, হাতে আছে আর মাত্র এক বত্সর। তবে এইবারের সম্মেলনে বিশ্ববাসী দেখিল, প্রায় ৪০ ঘণ্টা জুড়িয়া চলিল শুধু দোষারোপের পালা। আংশিক ঐকমত্য ছাড়া মিলিল না তেমন কোনো সমাধানসূত্র। ২০১৫-এর প্যারিস চুক্তির শর্ত মানিয়া কোন দেশ কতটা অগ্রসর হইয়াছে, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রার বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে বাঁধিয়া রাখিতে কোন দেশ কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাইতে সকল দেশ মিলিয়া ঐক্যবদ্ধভাবে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়—তাহা লইয়া ঘুরিয়া-ফিরিয়া অনেক আলোচনাই হইল। কিন্তু দেখা গেল, সেইখানে বেশির ভাগ দেশ নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করিতে ব্যস্ত থাকিলেও কার্বন নির্গমন হ্রাসের ব্যাপারে উন্নত দেশগুলি প্রায় কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করে নাই। এই পরিস্থিতিতে সম্মেলন শেষের প্রাপ্তি হিসাবে বলিতে হয়, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন শূন্যে লইয়া যাইবার লক্ষ্যমাত্রা অনুমোদন করিয়াছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। একই সঙ্গে, প্রত্যেক দেশই গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমাইতে নিজেদের মতো করিয়া পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়াছে। যেই সকল বিষয় লইয়া মতদ্বন্দ্ব রহিয়াই গেল, সেইগুলির সমাধান পরের বত্সরের সম্মেলনে মিলিবে—এই আশ্বাসে শেষ হইল মাদ্রিদের সম্মেলন।
জলবায়ু পরিবর্তন লইয়া ইতঃপূর্বে বান কি মুন একটি তাত্পর্যপূর্ণ কথা বলিয়াছিলেন। তাহার মতে, প্ল্যান বি বলিয়া এই সমস্যার দ্বিতীয় কোনো সমাধান নাই, কারণ আমাদের প্ল্যানেট বি নাই। অর্থাত্ আমাদের এই ‘একমাত্র ধরিত্রী’কে রক্ষা করিতে যাহা করিবার তাহা ‘এখনই’ করিতে হইবে এবং ইহার জন্য ‘আগামীকাল’ অবধি অপেক্ষার সুযোগ নাই। আমরা দেখিতে পাইতেছি যে, ফি বত্সর জলবায়ু সম্মেলনগুলিতে জলবায়ু অর্থায়নের ব্যাপারে ব্যাপক শোরগোল হয়। বৈশ্বিক চিত্রপটে ইহা খুবই সমন্বয়হীন, জটিলতাপূর্ণ ও অত্যন্ত অপ্রতুল। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বিশ্বে বাংলাদেশ সর্ববৃহত্ ডেল্টা। এই কারণে জলবায়ু সম্মেলন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পূর্বাভাস অনুযায়ী জলবায়ুর বিরূপ দশা ঘটিলে আমরাই সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হইব। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ ঝুঁকিতে রহিয়াছে। আশঙ্কা করা হইতেছে যে, আমাদের প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হইবে এবং এই অবস্থা চলিতে থাকিলে ২০৫০ সাল নাগাদ এই হার ৯ শতাংশে গিয়া দাঁড়াইবে। সুতরাং, ইহা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে, আমরা আমাদের সময়ের এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানব ইতিহাসের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করিতেছি। এই সময়টি সিদ্ধান্তহীনতার মধ্য দিয়া পার করিলে এই পৃথিবী ধ্বংসের মুখোমুখি হইবে। সুতরাং প্রত্যেকটি দেশকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে যাহা করণীয়, তাহা করিতে হইবে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সহিত।