আলোকপাত

করাঙ্গীর অস্তিত্ব রক্ষা করুন

নাজমুল হোসেন

হবিগঞ্জ জেলার পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী নদী করাঙ্গী। এটি অত্র জেলার চুনারুঘাট, বাহুবল ও নবীগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে প্রবাহের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করেছে। ছোটো দৈর্ঘ্যের এই নদীর উত্পত্তিস্থল ভারতের আসাম রাজ্য। ব্যবহারিক দিক থেকে আশপাশের এলাকার প্রায় কয়েক হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নদীটির ওপর নির্ভরশীল রয়েছে। গোসল করা, শুকনো মৌসুমে বোরো ধান উত্পাদন, নানা রকম শাক-সবজির চাষ করা, মাছ ধরাসহ বিভিন্নভাবে ছোটো এই নদীকে হাজার বছর ধরে ব্যবহার করে আসছে এর দুই পারের বাসিন্দারা। মিঠাপানির জন্য এই নদীর মাছ এতই সুস্বাদু, যা হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সমাদৃত। নদীটির সঙ্গে রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের গভীর মিতালি, যা অনেকটা মায়ের মতোই।

পরিতাপের বিষয়, কয়েক বছর ধরেই নদীটিতে বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যসহ অন্যান্য ক্ষতিকারক বর্জ্য ফেলায় সেটি মারাত্মক দূষণের কবলে পড়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য উক্ত নদীতে নিষ্কাশন করার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে এলাকাবাসীর দাবি। এতে কৃষিজ ফসল উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। অথচ নিয়মানুযায়ী বর্জ্য পরিশোধন পদ্ধতি ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও পদ্ধতিটি ব্যয়বহুল হওয়ায় নিয়ম-নীতির পাশ কাটিয়ে প্রভাবশালী কোম্পানিগুলো এই প্ল্যান্ট স্থাপন করেনি বলেই জানা যায়। এ কারণে চরম ভোগান্তিতে রয়েছে বিশেষ করে ইউনিয়নের সফিয়াবাদ, চক্রামপুর, কাশিরামপুর, অলিপুর, শাহাপুর, নিজগাঁও, ভাদেশ্বর এবং বাহুবল ও নবীগঞ্জের বেশ কিছু এলাকার মানুষ। প্রজননব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় আগের মতো নদীতে এখন আর মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাত্, এখানকার জীববৈচিত্র্য রয়েছে মারাত্মক হুমকির মুখে। কিছুদিন পরপরই দেখা যায় নদীতে বিক্ষিপ্তভাবে কেরোসিনের মতো বিষাক্ত তেলের ছোপ এবং বিভিন্ন রকম মৃত মাছ ভেসে ওঠে। মাছগুলোতে বিষাক্ত কেরোসিনের দুর্গন্ধ থাকায় কোনোভাবেই খাওয়া যায় না। তাছাড়া নদীর পানির রং পরিবর্তন হওয়ার কারণে রীতিমতো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা বিষাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতেই বাধ্য হয়ে গোসল করছে। এতে অনেকেই নানা রকম চর্মরোগ এবং অন্যান্য পানিবাহিত জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এখানকার হাঁস-মুরগি ও অন্যান্য গবাদি পশু-পাখি এই পানি পান করে মারা যাচ্ছে। তাছাড়া নিকটবর্তী কৃষিজমিতে আগের মতো ধান বা অন্যান্য শাক-সবজিও হচ্ছে না। দেশের উন্নয়নে শিল্পায়নের প্রয়োজন হলেও নদীকে হত্যা করে নয়। নদী না বাঁচলে পরিবেশ ও দেশ কোনোটাই বাঁচবে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বর্তমান সরকার শতভাগ নদীবান্ধব ও নদী রক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

তাই নদীটিকে এমন ভয়াবহ দূষণ থেকে তথা নির্ভরশীল হাজারো মানুষকে এবং বিভিন্ন রকম সুস্বাদু মাছের আবাসস্থলকে বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর দ্রুতই কোনো কঠিন ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এমনটাই ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।

n লেখক :প্রকৌশলী