মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত রাজাকারের তালিকা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। বরিশালে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে রাজাকারের তালিকায় প্রতীকী অগ্নিসংযোগ করা হয়। বরগুনার পাথরঘাটায় প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছেন সাধারণ মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।
গত রবিবার প্রকাশিত প্রথম ধাপে ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের ঐ তালিকায় অনেক ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়েছে বলে দাবি করছেন তাদের স্বজন ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। এনিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তারা বলছেন, সরকারের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতা বিরোধীরাই এই বিতর্কিত কাজের সঙ্গে জড়িত। অবিলম্বে তালিকা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম বাদ দিয়ে প্রকৃত রাজাকারদের তালিকাভুক্ত করার দাবি তাদের।
আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে :চিফ প্রসিকিউটর
রাজাকারের তালিকায় নাম থাকা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে যারা রাজাকার-আলবদরের তালিকায় যুক্ত করেছে, সেটা খুঁজে বের করে আইনগত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। গতকাল রাজধানীতে ট্রাইব্যুনালের নিজ চেম্বারে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় একটি লিস্ট বের করল রাজাকারের, সেই তালিকায় দেখা যাচ্ছে আমার সঙ্গী চার-পাঁচ জন। যাদের পরিবারের সদস্য মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছিলেন। আমাদের রাজাকারের তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। এটা বুঝে পেলাম না কোথা থেকে তারা এ শক্তিটা পেলেন। এটা মনে হয় যে মুক্তিযুদ্ধ সংস্থায় যুদ্ধাপরাধীর পক্ষের শক্তি বা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তির অবস্থান কিছুটা রয়ে গেছে এবং সেখান থেকে এ জিনিসগুলো হচ্ছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে।’ এ সময় প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, সুলতান মাহমুদ সীমন, রেজিয়া সুলতানা চমন উপস্থিত ছিলেন।
বরিশাল অফিস জানায়, মুক্তিযোদ্ধা তপন কুমার চক্রবর্তী, তার মা ঊষা রানী চক্রবর্তীসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের নাম রাজাকারের তালিকা থেকে বাতিলের দাবিতে জেলা সদরে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। সকালে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ফকিরবাড়ি রোডের জেলা কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন জেলা বাসদের সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী। এ সময় লিখিত বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, বরিশালে গণমানুষের অধিকার নিয়ে লড়াই করায় তার পিতা ও ঠাকুরমার নাম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে রাজাকারের তালিকায় এসেছে। তিনি হীন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বরিশালসহ সারাদেশের জনগণকে যুক্ত করে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াইয়ের ঘোষণা দেন। পাশাপাশি আইনগতভাবেও বিষয়টি মোকাবিলা করা হবে বলে জানান।
সংবাদ সম্মেলন শেষে নগরীর সদর রোড এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও প্রকাশিত তালিকায় অগ্নিসংযোগ কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় ভুল তালিকা প্রণয়নে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানানো হয়। বিক্ষোভ সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘শেষ বয়সে এসে একজন মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবার হিসেবে আমার ও প্রয়াত শহিদজায়া মায়ের নাম রাজাকারের তালিকায় দেখতে হবে তা কোনো দিন ভাবিনি। এই তালিকার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানিত করা হয়েছে। তাই অবিলম্বে এই তালিকা সংশোধনসহ প্রণয়নকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’
পাথরঘাটা (বরগুনা) সংবাদদাতা জানান, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত মজিবুল হকের নাম রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রতিবাদে সকালে উপজেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রতিবাদ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে উপজেলা আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। এ সময় বক্তব্যে প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, মজিবুল হক স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন দক্ষিণাঞ্চলে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহচর। অথচ তার নাম এসেছে রাজাকারের তালিকায়। শুধু তিনি নন, তালিকায় খলিলুর রহমান মানিক, আমজাদ হোসেনসহ আরো চার জন মুক্তিযোদ্ধার নাম এসেছে। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের দাবি, অনতিবিলম্বে মজিবুল হকসহ অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নাম প্রত্যাহার করে প্রকৃত রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করা হোক।
এদিকে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মজিবুল হকের সহধর্মিণী নূর জাহান বেগম ও ছেলে শাহিন মিয়া এ ঘটনায় অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পাঠানো হয়েছে। ঐ স্মারকলিপিতে ছেলে শাহীন তার বাবার নাম প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।