অঞ্চলভেদে দারাজ, ডাঁড়াশ, ধারাজ প্রভৃতি নামে বাংলাদেশের এক অতিপরিচিত বিষহীন সাপ। হলুদ বাদামি বা হালকা বাদামি কিংবা জলপাই বাদামি বর্ণের সাপটি প্রায় তিন মিটার বা তার থেকেও বেশি লম্বা হতে পারে। সাধারণত এ সাপকে মানুষের আবাসস্থলের আশপাশে, চাষের জমি, বন-জঙ্গল বা ছোটো ঝোপঝাড়ে দেখতে পাওয়া যায়। দিবাচর এ সাপটি খুবই দ্রুতগতিতে চলাফেরা করতে পারে এবং গাছে বেয়ে উঠতে বা সাঁতার কাটতেও পারদর্শী। এর ব্যবহার খুবই আক্রমণাত্মক ও মারমুখি ধরনের। ধরা পড়ার পর কিছুটা মারমুখি দেখালেও পরে খুব সহজেই নেতিয়ে যায়। ব্যাঙ, ইঁদুর, ছুঁচো, পাখি, বাদুড়, গিরগিটি ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারণ করে এবং শিকার ধরামাত্রই গিলতে শুরু করে। কেবল এ সাপই যুদ্ধ-নাচ দেখায়। প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি পুরুষ সাপের মধ্যে এ লড়াইয়ে এরা পরস্পর দেহের অর্ধেক রশির মতো পেঁচিয়ে মাটির সমান্তরালে অথবা কিছুটা ওপরে থাকে। দাঁড়াশের এই ব্যবহারে মানুষ একে ভয়ংকর ও বিষাক্ত বলে মনে করে। এ প্রজাতির সাপ দেশের সব এলাকায় রয়েছে। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষে দাঁড়াশ সাপকে বাংলাদেশের আবাসিক সাপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
দাঁড়াশ সাপ সম্পর্কে আমাদের দেশে একটি কুসংস্কার আছে যে, এর লেজে এক প্রকার কাঁটা রয়েছে, যাতে বিষ থাকে। মুখের পরিবর্তে লেজ দিয়ে আঘাত করলে ঐ আঘাতের স্থানটি ধীরে ধীরে পচে যায়। আসলে তা ঠিক নয়। মূলত দাঁড়াশ নির্বিষ সাপ। লেজ তো দূর স্থান, এর বিষদাঁতই নেই। আবার অনেকেই গোখরা সাপ ভেবে ভুল করে। অনেকেই ভাবে, দাঁড়াশ সাপ মানেই বিষাক্ত এবং তাকে মারা উচিত। এ সাপ যেমন নির্বিষ তেমন একেবারে নিরীহ প্রজাতির। নানান কুসংস্কার ও ভুল ধারণার কারণেই এ প্রজাতির সাপগুলোকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। বন্যপ্রাণী গবেষক ড. কামরুল হাসানের মতে, এই সাপ হাত দিয়ে ধরলেও বেশি নড়াচড়া করে বা রেগে ওঠে না। তবে কোনো কারণে এই সাপ রেগে গিয়ে কাউকে যদি কামড়ও দেয় তাতেও কিছুই হবে না। সাপ মানেই কি বিষাক্ত? সাপ মানেই কি ভয়ঙ্কর, ভয়াল? না। সাপ সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলি ভেঙে বেরিয়ে আসুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দাঁড়াশ সাপ প্রায় তিন একর ফসলি জমির ইঁদুর নিধন করতে সক্ষম। তাই আমরা কীটনাশক ও বিষ প্রয়োগ থেকে সরে এসে যদি পরিবেশবান্ধব এ সাপ সংরক্ষণ করি, তাহলে আমাদের কৃষি ও কৃষক অনেক উপকৃত হবে।
এছাড়া এদের চামড়ার যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। কোরিয়ান ও চীনারা দাঁড়াশ সাপের মাংস খেতে পছন্দ করে। ইঁদুরের কবল থেকে এদেশকে মুক্ত করতে দাঁড়াশ সাপ উত্পাদন, সংরক্ষণ ও প্রকৃতি থেকে সাপের বংশ বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে এবং আমাদের দেশের সকল মানুষকে দাঁড়াশ সাপসহ সকল সাপ সম্পর্কে ঠিক ধারণা দিতে হবে। মূলত সাপ সম্পর্কে সচেতনতাই পারে এই উপকারী সরীসৃপ প্রাণীটিকে বাঁচাতে।