মো. রাশেদ আহমদ
বর্তমান একবিংশ যুগ বাণিজ্যের যুগ। বাণিজ্যই হচ্ছে—একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। আবার, এই বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটকে কেন্দ্র করে। আজ বিশ্বে বড়ো বড়ো শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ তাদের বাণিজ্য প্রভাব বিস্তার করছে কোনো না কোনো অর্থনৈতিক জোটের ওপর নির্ভর করে। সেই জায়গায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে অর্থাত্ আজ পর্যন্ত খুব বেশি বড়ো কোনো অর্থনৈতিক আঞ্চলিক জোটের সঙ্গে গাঢ় সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। এর পিছনে মাত্রাতিরিক্ত ভারত-চীন বাণিজ্য সম্পর্কে অনেকটাই দায়ী করা হয়। যার কারণে অনেক সময় বাংলাদেশকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা যাক, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক জোট Association of South-East Asian Nations (ASEAN)| যার গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে—অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন, পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বর্তমান আসিয়ান ভিশন ২০২০ অর্জনের লক্ষ্যমাত্রাই অর্থনৈতিক কমিউনিটি গড়ে তোলা। এর মাধ্যমে সদস্যভুক্ত ১১টি দেশগুলোর মাঝে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীল এবং উচ্চ প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্পন্ন অঞ্চল গঠন করা হবে, যেখানে পণ্যের সেবা নিশ্চিতকরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দারিদ্র্য দূর করা ও মুক্ত বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন উন্মুক্ত থাকবে।
অপরদিকে,The Asia Pacific Economic Co-operation (APEC) আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালে, যার বর্তমান সদস্য সংখ্যা ২১টি। এ্যাপেক সদস্যভুক্ত দেশগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে—পারস্পরিক বাণিজ্যিক সুবিধা দিয়ে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য এলাকা গড়ে তোলা। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার বসবাস এ অঞ্চলটি বিশ্ব বাণিজ্যের ৪৭ শতাংশ সম্পন্ন হয় এবং এ অঞ্চল মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ৫.২ ট্রিলিয়ন ডলারের অধিক। বিশ্বে মোট উত্পাদিত পণ্যের ৫৫ শতাংশ এখানে উত্পাদিত এ্যাপেক অঞ্চলটিতে যা বিশ্ব অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শক্তিশালী দেশের সঙ্গে অর্থনীতি সম্পর্ক জোরালো ও বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট গঠনের ক্ষেত্রে অনেকটা উদাসীন ছিল। যদিও পরবর্তী ১৯৮৫ সালে অর্থনৈতিক ও পারস্পরিক সামাজিক উন্নয়নকে সামনে রেখে (SAARC) এবং ১৯৯৭ সালে (BIMSTEC) গঠন করা হয়। যা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—বর্তমান কতটা কার্যকর এই আঞ্চলিক জোটগুলো!
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মাঝে আজ নৈরাজ্য, আন্তঃকলহ, দ্বন্দ্ব, বিবাদ, জঙ্গিবাদ, চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যার উত্কৃষ্ট উদাহরণ দুই পারমাণবিক শক্তিশালী দেশ ভারত-পাকিস্তানের কাশ্মীর ইস্যু। এ দুই দেশের বিবাদের কারণে সার্ক আজ প্রায় অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে। এর কারণে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে—এ সংস্থার অন্তর্ভুক্ত বাকি দেশগুলোকে। বর্তমান দুই শক্তিশালী দেশের দ্বন্দ্ব্ব মিটিয়ে সার্কে কার্যকর করা অনেকটাই অসম্ভব। সেটা অদূর ভবিষ্যতে সময় বলে দিবে কতটা কার্যকর হবে এই সংস্থাটি। তবে বাংলাদেশ আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট গঠনের কথা ঠান্ডা মাথায় গভীরভাবে ভাবতে হবে। কারণ অর্থনৈতিক জোট ছাড়া বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব বাণিজ্যে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা ব্যাপক কঠিন। এছাড়াও শুল্ক মুক্ত বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও বর্তমান মহাগুরুত্বপূর্ণ রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানসহ ভূ-রাজনীতিতেও ব্যাপক অবদান রাখত আঞ্চলিক জোট। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ, ২০৩০ সালে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশে অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট হতে পারে বড়ো হাতিয়ার।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া