আজহারুল হক ফরাজী
এসে গেল খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড়ো উত্সব বড়দিন। শুধু খ্রিস্টানরা নয়, গোটা বিশ্বের অন্যান্য ধর্মের মানুষও এই দিনটি পালন করে। ২৫ ডিসেম্বর কেক কাটা বা আলো দিয়ে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো প্রায় সবাই করে থাকে। বড়দিন বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে আলোর মালায় সাজানো ক্রিসমাস ট্রি। কিন্তু কেন?
অনেক অনেক বছর আগে উত্তর ইউরোপে প্রথম ক্রিসমাস ট্রি প্রথা শুরু হয়। সুখ ও সমৃদ্ধির প্রতীক মনে করা হয় এই গাছকে। উত্তর ইউরোপের মানুষ বিশ্বাস করত, বাড়িতে চিরসবুজ এই ফার গাছ লাগালে অশুভ শক্তি দূরে সরে যায়। সেখান থেকেই বড়দিনে ক্রিসমাস ট্রি সাজানোর প্রথা শুরু হয়। আর এখন তো আলোর মালার সঙ্গে খেলনা, চকলেট, ঘণ্টা সবই ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ক্রিসমাস ট্রি থেকে।
যিশু খ্রিস্টের জন্মের সঙ্গেও ক্রিসমাস ট্রি যুক্ত রয়েছে। যিশুর জন্মের পর যারা তার বাবা-মা জোসেফ ও মেরিকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, তারা নিজেদের বাড়ির এই চিরসবুজ ফার গাছ আলো দিয়ে সাজিয়ে দেন। সেই থেকে যিশুর জন্মদিনে এই গাছ আলোর মালায় সাজানোর প্রথা শুরু হয়। আরো বিশ্বাস রয়েছে যে, এই গাছ আদম ও ইভের খেলার জন্য প্রথম পোঁতা হয়েছিল। ১৬ শ শতকে আধুনিক ক্রিসমাস ট্রি প্রথম জার্মানিতে দেখা যায়। ১৮ শ শতকে প্রায় গোটা বিশ্বেই ক্রিসমাস ট্রি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এবার আসি সান্টাক্লজ প্রসঙ্গে। সান্টাক্লজ নামটি আসলে ডাচ সিন্টারক্লাস নাম থেকে এসেছে, যার সাধারণ অর্থ সেইন্ট নিকোলাস। সেইন্ট নিকোলাস ছিলেন খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর একজন বিশপ। অন্যান্য স্বভাবসুলভ অবদানের পাশাপাশি তিনি শিশুদের পরিচর্যা ও উপহার প্রদানের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।
সারা বিশ্বের অসংখ্য শিশু সান্টাক্লজের কাছে উপহার চেয়ে চিঠি লেখে। যেমন—চার বছরের ড্যাভিট লিখেছে—
‘প্রিয় সান্টাক্লজ, আমি সারা বছর একটুও দুষ্টুমি করিনি এবং লক্ষ্মী হয়ে ছিলাম। তাই এ বছর ক্রিসমাসে আমি একটি বড়ো টেডিবিয়ার চাই। ইতি ড্যাভিট।’ এসব চিঠি লেখার কারণ আর কিছুই না, সান্টাকে জানানো যে সে ভালো ছেলে বা মেয়ে এবং উপহার পাওয়ার যোগ্য। অনেক দেশেই বড়দিনকে ঘিরে উপহার আদান-প্রদানের প্রথা প্রচলিত। আর এই উপহার আদান-প্রদানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেশকিছু পৌরাণিক চরিত্র। সান্টাক্লজ এর অন্যতম এবং সবচেয়ে জনপ্রিয়। সান্টাক্লজ দেশভেদে সেইন্ট নিকোলাস, ফাদার ক্রিসমাস, ক্রিস ক্রিঙ্গল বা সাধারণভাবে সান্টা নামে পরিচিত।
সান্টাক্লজ খুবই হাসিখুশি এবং আমুদে একজন মানুষ। তিনি প্রতি বছর ক্রিসমাস ইভ বা ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বা মধ্যরাতে ভালো ছেলেমেয়েদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে তাদের জন্য উপহার রেখে আসেন। এই কাজটি করেন তিনি খুব গোপনে, যাতে তাকে কেউ দেখতে না পারে! যারা উপহার পেতে চায় তারা ঘরের ফায়ারপ্লেসের কাছে মোজা ঝুলিয়ে রাখে। কারণ সান্টাক্লজ ফায়ারপ্লেসের চিমনি দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করেন এবং মোজার ভেতর উপহার রেখে যান। সান্টাক্লজকে চেনার উপায় হলো—তার শ্বেতশুভ্র দাড়ি এবং ‘হোঃ হোঃ হোঃ’ হাসি। তার পরনে থাকে সাদা কলার ও কাফযুক্ত লাল কোট, সাদা কাফযুক্ত লাল ট্রাউজার আর কালো চামড়ার চওড়া বেল্ট ও জুতো। সান্টাক্লজ একটি কিংবদন্তি চরিত্র। তাকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা, উপকথা। এসব কিংবদন্তি অনুসারে সান্টাক্লজের বসবাস সুদূর উত্তরে চিরতুষার-আবৃত এক দেশে। এটাও ধারণা করা হয় যে, সান্টাক্লজ উত্তর মেরুতে বসবাস করেন। সান্টাক্লজের সঙ্গে তার স্ত্রী মিসেস ক্লজ, জাদুবিদ্যায় পারদর্শী এলফ এবং আট-নয়টি উড়ন্ত বলগা হরিণও বসবাস করে। বলা হয়ে থাকে, সান্টা সারাবিশ্বের শিশুদের সারা বছরের আচরণ দেখে বিশেষ তালিকা প্রস্তুত করে থাকেন।
শিশুদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়—দুষ্টু ও লক্ষ্মী। তারপর তিনি ইভ ক্রিসমাসের দিনে লক্ষ্মী শিশুদের খেলনা, চকলেট ও অন্যান্য উপহার দিয়ে যান। আর কখনো কখনো দুষ্টুদের দিয়ে যান কয়লা উপহার। তিনি এই কাজগুলো সম্পন্ন করেন এলফ আর বলগা হরিণদের সাহায্যে। সান্টাক্লজের রয়েছে খেলনা আর উপহার তৈরির কারখানা। সারা বছর এলফরা এই কারখানায় উপহার তৈরি করে। এই উপহারগুলোই সান্টা তালিকা ধরে ধরে শিশুদের দিয়ে যান। এ কাজেও তাকে সাহায্য করে এলফরা। সান্টাক্লজের উপহারে ভরা স্লেজগাড়ি টেনে নিয়ে আসে আট-নয়টি উড়ন্ত বলগা হরিণ। এই স্লেজগাড়িতে চড়েই তিনি এক রাতে সারা পৃথিবীর শিশুদের উপহার পৌঁছে দেন। কিন্তু আসলেই কি সান্টাক্লজ উপহার রেখে যান? না, বাবা-মা কিংবা বাড়ির বড়োরাই ছোটদের জন্য গোপনে একফাঁকে উপহার রেখে দেন। আর সান্টাক্লজের গল্পটি তাঁরা এ কারণেই বলেন যেন শিশুরা ভালো কাজ করতে, ভালো হয়ে চলতে উত্সাহ পায়।