এসপানিওলার শহরের সিনিওর সানতস ও মারিয়া

মঈনুস সুলতান

সিনিওর সানতস সুযোগ পেলে গালগল্পে মেতে উঠতে পছন্দ করেন। মানুষটি ব্যতিক্রমী রকমের বন্ধুবত্সল। পরিচতজনদের সাংসারিক প্রয়োজনে তাকে সংবেদনশীল হয়ে উঠতে দেখেছি একাধিকবার। আমার কটেজে ছোটা কাজ করতে এলেই ভারি সুন্দর করে জানতে চান, ‘এসটাস বিয়েন, নেসেসিতো আলগো, পোয়েডে আয়ুদারতে? বা সবকিছু ভালো চলছে তো

ব্যাকরোড ধরে হালকাচালে ড্রাইভ করতে করতে আমি আমেরিকার আদিবাসীদের গ্রাম সান-ইদেলফনসো পোয়েভলোর স্বায়ত্তশাসিত পরিসর অতিক্রম করে এগিয়ে যাই সামনে। আফ্রিকা ছাড়ার কাঁটায় কাঁটায় ছয় মাস পর আমার এ গাড়িটি সিয়েরা লেওন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সান্তাফে শহরে এসে পৌঁছেছে। গাড়িখানা লজজড় এবং মেজাজি, অর্থাত্ মুড খারাপ থাকলে বেগড়বাই করার খাসিলত আছে। বহু বছরের পুরনো এ বাহনটিতে এখনো লেগে আছে সিয়েরা লেওনের লালচে ধুলোবালি। এটি যে হ্রস গতিতে আগুয়ান হচ্ছে, এতেই আমি খুশিতে বাগবাগ। সামনের মরু পরিসর অতিক্রম করে দিগন্ত জুড়ে ফুটে ওঠে সাংগ্রে দে খ্রিস্ত পাহাড়ের জগদ্দল ল্যান্ডস্কেপ। আজ আমি রওয়ানা হয়েছি এসপানিওলা শহরের উদ্দেশে।

সান্তাফে থেকে সামান্য দূরে এসপানিওলা শহরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও অর্থনীতির নিরিখে এ আবাসিক এলাকাটি হিস্পানিক কৌমের গরিব-গোর্বাদের বাসস্থান হিসেবে পরিচিত। ১৫৯২ সালে এ অঞ্চল মেক্সিকো থেকে আগত স্প্যানিয়ার্ডরা দখল করে ‘নুয়েবো মেহিকো’ নাম দিয়ে আমেরিকান আদিবাসীদের হটিয়ে শহরটির গোড়াপত্তন করেছিল। তারপর মার্কিনরা নুয়েবো মেহিকো স্রেফ গায়ের জোরে করগতলগত করে নিউ মেক্সিকো নাম দিয়ে নতুন একটি রাজ্যের পত্তন করলে, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের সুবিধার জন্য স্থাপন করা হয় রেল রোড। ১৮৮০ সালে এসপানিওলা শহরটি গড়ে ওঠে রেল-বাহিত ব্যবসা-বাণিজ্যের ঠেক হিসেবে।

ড্রাইভ করতে করতে সড়কের পাশে পেল্লায় একটি ক্লিফ ফরমেশনের দিকে নজর পড়ে। পাথুরে জগদ্দলটি সরেজমিনে না দেখে আগ বাড়তে ইচ্ছা হয় না। রাজপথের পাশে নুড়িপাথর ছড়ানো জায়গা প্রচুর, তাই সাইড করে পার্ক করতে কোনো অসুবিধা হয় না। খানিক হেঁটে আমি পাথরের আচানক স্থাপত্যকলাটির তলায় এসে দাঁড়াই। মরচে পড়া বাদামি রঙের শিলা থেকে ফট ফট শব্দে উড়ে যায় মরুভূমিতে প্রবাসী হওয়া মেক্সিকোর এক ঝাঁক নীলচে-ধূসর ঘুঘু। ক্লিফ ফরমেশনটির মাঝ বরাবর কিছুটা লম্বাটে গোলাকার একটি ফোকর। আমি পাথর বেয়ে খানিক ওপরে উঠে প্রাকৃতিক এ জানালা দিয়ে ওদিকের আকাশছোঁয়া দিগন্ত নিশানা করে তাকাই। গাছপালাহীন প্রান্তরে একাধিক চার্চ-টাওয়ারের ক্রুশ চিহ্ন, কবরগাহ ও পুরোনো দিনের রেলওয়ে স্টেশন নিয়ে এসপানিওলার আউটলাইন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জায়গাটি দারুণ রকমের জনহীনতায় এমন মৌনভাব ধারণ করে আছে যে, এখানে দু দণ্ড বসে যেতে বাসনা হয়।

পাথরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসতেই করোটিতে ফিরে আসে আমার সুহূদ সানতসের প্রসঙ্গ। এ মুহূর্তে আমি সিনিওর সানতসের সন্ধানে রওয়ানা হয়েছি এসপানিওলার দিকে। পবিত্র ধর্মগ্রন্থে মানবজাতিকে যে রকম বিভক্ত করা হয়েছে কেতাবি ও অকেতাবি হিসেবে, অনেকটা সে কায়দায় নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে জন-বিভাজনের রূপটি হচ্ছে—লিগ্যাল ও ইলিগ্যাল। এ ফর্মূলা অনুযায়ী আমি এখানকার লিগ্যাল বাসিন্দা। আমার সুহূদ সানতসের প্রশাসনিক তকমা হচ্ছে ইলিগ্যাল ইমিগ্রান্ট বা অবৈধ অভিবাসী। পেশায় সিনিওর সানতস হ্যান্ডিম্যান, কারো ঘরদুয়ারে বিদ্যুত্ ও পানি সরবরাহের কলকব্জা বিকল হলে তিনি তা মেরামত করে দেন। সাইড বিজনেস হিসেবে তিনি হাউজ ক্লিনিংও করে থাকেন। তার মজুরি—বৈধভাবে যারা এ ধরনের কাজ করে তাদের চেয়ে অনেক কম। আমার কৃপণ বলে পরিচিতি আছে, তাই সান্তাফের যে কটেজে আমি বসবাস করছি—ওখানে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সিনিওর সানতসকে এত্তেলা দেই। তিনি অতি অল্প পারিশ্রমিকে আমার মুশকিল আসান করে দেন। একটি জংধরা ভ্যানগাড়িতে তার টুল-কিট নিয়ে সানতস ঘুরে বেড়ান। প্রয়োজনে রাত্রিবেলা গাড়ির পাটাতনে স্লিপিং-ব্যাগ পেতে নিদ্রা যান। তবে এসপানিওলায় বাসরত এক মেক্সিকান বৈধ অভিবাসীর পরিবারের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়েছে। উইকেন্ডে সিনিওর কাজ করেন না। তিনি এ অবসরটুকু কাটান মেক্সিকান পরিবারটির সঙ্গে।

সিনিওর সানতসের পিতা আটের দশকে মেক্সিকোর টিহুনা শহর থেকে অবৈধভাবে এসে ঢোকেন ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো শহরে। পিতার অভিবাসী হওয়ার অনেক বছর পর—কিশোর সানতস নিশিরাতের অন্ধকারে নদী সাঁতরে সীমান্ত অতিক্রম করে ঢুকে পড়েন যুক্তরাষ্ট্রের জনহীন এক মরুভূমিতে। দিন তিনেক অচেনা ডেজার্টে পায়ে হেঁটে ট্র্যাক করার পর, খাদ্য ও জলের অভাবে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন তিনি একটি কাঁটাঝোপের তলায়। একজন র্যাটেল সাপ শিকারি উদ্ধার করে তাকে নিয়ে আসে সান্তাফে শহরে। তো এ শহরেই তিনি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বাস করতে শুরু করেন। একবার সান ডিয়েগোতে গিয়ে পিতাকেও খুঁজে বের করেছিলেন। কিন্তু ততদিনে তার পিতার ভিন্ন একটি সংসার হয়েছে। দুটি শিশুসন্তান নিয়ে সত্মা পরিবার চালাতে গলদগর্ম হচ্ছেন, কারণ পিতা মারাত্মকভাবে অ্যালকোহলিক। তো বেহেড মাতাল পিতার সংসারে তার স্থান হয়নি। সানতস সান্তাফেতে ফিরে উপার্জনে মনোযোগ দেন। তার বয়স চৌত্রিশ, নিজের কোনো সংসার হয়নি। তবে মেক্সিকোতে ফেলে আসা জননী, চার ভাইবোনের একান্নবর্তী পরিবারকে তিনি ফি মাসে টাকা পাঠিয়ে জিইয়ে রেখেছেন।

সিনিওর সানতস সুযোগ পেলে গালগল্পে মেতে উঠতে পছন্দ করেন। মানুষটি ব্যতিক্রমী রকমের বন্ধুবত্সল। পরিচতজনদের সাংসারিক প্রয়োজনে তাকে সংবেদনশীল হয়ে উঠতে দেখেছি একাধিকবার। আমার কটেজে ছোটা কাজ করতে এলেই ভারি সুন্দর করে জানতে চান, ‘এসটাস বিয়েন, নেসেসিতো আলগো, পোয়েডে আয়ুদারতে? বা সবকিছু ভালো চলছে তো? কোনোকিছুর দরকার আছে কি? আমি কি কোনোভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’ আমি স্বপাকে আহার গ্রহণ করি। রান্নার উপকরণ হিসেবে আদা ও গরম মসলা কোনো দোকানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সমস্যা শুনে বিকেলবেলা সানতস এসে হাজির হন আদা ও এক প্যাকেট এলাচি নিয়ে। বিনিময়ে কোনো টাকাপয়সা নিতে চান না। তবে আমি কফি অফার করলে তিনি তা পান করতে করতে আমি যে বছর দুয়েক মেক্সিকো সিটিতে বাস করেছি, তার বিস্তারিত বয়ান শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, মেক্সিকোর ওহাকা অঞ্চলের মানুষ তিনি, শৈশবে স্বপ্ন ছিল বড়ো হয়ে সিওদাদ মেহিকো বা মেক্সিকো সিটিতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যাবেন। কিন্তু গরিবি হালতের জন্য লেখাপড়া তেমন একটা করতে পারেননি। বৈধ কাগজপত্র তার নেই, সুতরাং এ জন্মে হয়তো আর কখনো মেক্সিকো সিটিতে যাওয়া হবে না। আমি প্লেয়ারে ‘মারিয়াচি মেহিকানিসমো’ নামে পরিচিত মেক্সিকোর লোকগীতির সিডি চড়ালে মাথা দুলিয়ে তিনি সংগীত উপভোগ করতে করতে ফের দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘এসটা মুসিকা টকা মি কোরাজান, বা এ গানের ধ্বনি আমার হূদয় স্পর্শ করছে।’ এসব গান হালফিল ইউটিউবে পাওয়া যায়। কিন্তু সিনিওর সানতস ইন্টারনেটের বিষয়-আশয় তেমন একটা বুঝতে পারেন না। তো আমি কয়েকটি মেক্সিকান সংগীতের সিডি তাকে উপহার দিলে তিনি উষ্ণ হাগে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। আমি তার চোখে আর্দ্রতা দেখতে পাই।

সিনিওর সানতসের সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতার কথা ভাবতে ভাবতে ক্লিফ ফরমেশনের তলা থেকে ফিরে ফের গাড়ি স্টার্ট দেই। মিনিট দশেকের ভেতর এসে পৌঁছি এসপানিওলায় ঢোকার মুখে একটি পার্কে। ঘড়িতে বাজছে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে নয়টা। এ সময় ঠিক এই পার্কটিতে সিনিওর সানতসের দাঁড়িয়ে থাকার কথা। আমি গাড়ি থেকে নেমে তার তালাশে এদিক ওদিক তাকাই। অত্র এলাকায় একসময় বাস করত আমেরিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন গোত্র। তাদের সংস্কৃতির স্মারক হিসেবে পৌরসভা পার্কটিতে স্থাপন করা হয়েছে পাঁচটি টিপি বা একধরনের তাঁবু। টিপিগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে লে-রাইডার বলে পরিচিত সত্তর-আশি বছরের পুরোনো তিনটি ভিনটেজ মোটর কার। হিস্পানিক কৌমের যুবকদের মাঝে লো-রাইডার মোটর কারগুলোর কদরদানি প্রচুর। তরুণরা হাতে পয়সা এলেই খরিদ করে জংধরা লজজড়—বয়সের ভারে অচল ভিনটেজ লো-রাইডার কার। এসপানিওলা শহরের কিছু গ্যারেজে তৈরি হয় এসব গাড়ির খুচরা পার্টস । ছেলেরা ভিনটেজ গাড়িগুলো সারাই করে উইকেন্ডে তাতে চড়ে নাকি তাদের বান্ধবীদের সঙ্গে ডেটে যায়। এ আচরণ নিয়ে পত্রপত্রিকায় আমি ফিচার পড়েছি। বলা হয় যে— এসপানিওলা শহরটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের লো-রাইডার গাড়িগুলোর রাজধানী বিশেষ। কিন্তু এ মুহূর্তে আমি এসব গাড়ি খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণের বিশেষ আগ্রহ বোধ করি না।

মিনিট দশেক কেটে যায়। সিনিওর সানতস এসে হাজির হন না। গড়পড়তা আমেরিকানদের মতো সময়নিষ্ঠ তিনি নন। তাই অপেক্ষা করতে করতে আমি আজ তার সঙ্গে সাংগ্রে ডে খ্রিস্ত পাহাড়ের ভেতর-মহলে প্রায় লুকিয়ে রাখা গুলিবিদ্ধ যে হেলিকপ্টারটি দেখতে যাচ্ছি, তার প্রেক্ষাপট নিয়ে ভাবি। জোসেফ মরগান নামে এয়ারফোর্স থেকে অবসরপ্রাপ্ত এক শ্বেতাঙ্গ মার্কিন সান্তাফে এলাকায় ফোর্ড ট্রাইমোটর নামক অনেক বছরের পুরোনো একটি এয়ারক্রাফ্ট ওড়ান। ট্রাইমোটর প্লেনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের যশস্বী গাড়ি নির্মাতা হেনরি ফোর্ড নির্মাণ করেছিলেন ১৯২৫ সালে। এ ধরনের মোট ১৯৯টি বিমান তৈরি হয়েছিল। এগুলোর দু-চারটি নমুনা পৃথিবীর নানা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। একটি ভিনটেজ ট্রাইমোটর জোসেফ মরগান স্বয়ং পাইলট হিসেবে ফ্লাই করছেন। তার উড়োজাহাজটিকে তিনি আদর করে টিন-গুজ বা ধাতব-রাজহাঁস নামে ডাকেন। পয়সার বিনিময়ে মাত্র আট জন প্যাসেনজার নিয়ে টিন-গুজটি উড়ে যায় সাংগ্রে ডে খ্রিস্ত পাহাড়ে ওপর দিয়ে রকি মাউন্টেনের প্রান্ত অব্দি। যারা টিন গুজে উড়েছেন, তারা শিংগাল হরিণ-চরা পাহাড়ি উপত্যকা পর্যবেক্ষণের প্রশংসায় আত্মহারা হন হামেহাল।

আমি টিন-গুজের প্যাসেনজার হওয়ার জন্য মরগান সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানতে চান—আমি নিকট অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কোথাও ভ্রমণ করেছি কি না। জবাবে আমি সিয়েরা লেওনে আমার বসবাসের কথা উল্লেখ করি, মরগান ইবোলা সংক্রমণের অজুহাত দিয়ে আমাকে তার টিন-গুজে ওড়া থেকে বঞ্চিত করেন। আমি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি, সিয়েরা লেওন ছাড়ার সময় এবং যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর আমি বিশদভাবে মেডিক্যাল চেক-আপ করিয়েছি। আমার শরীরে ইবোলার বীজাণু নেই বলে ডাক্তাররা ক্লিয়ারেন্স দিয়েছেন।

আমি ইবোলা-মুক্ত বলে ডাক্তারের দেওয়া সনদের স্ক্যান করা কপি ইমেইলে অ্যাটাচ করে পাঠানোর প্রস্তাব দেই।  কিন্তু তিনি ভোলার পাত্র নন, মরগান রূঢ়ভাবে আমাকে টিন-গুজে উড়তে দিতে অসম্মতি জানান।

বিষয়টি আমাকে দারুণভাবে খাজুল করেছিল। ঝিম ধরে চুপচাপ কটেজের ব্যালকনিতে বসে ছিলাম। সিনিওর সানতস আমার কটেজের কিচেনে অভেন-স্টোভ মেরামত করছিলেন। ঘটনাটি জানতে পেরে বিচিত্র কিছু তথ্য দিয়ে তিনি আমাকে চমকে দেন! জোসেফ মরগানের কটেজে তিনি প্রায়ই নানা ধরনের ছোটা-কাজ করেন। মরগান নাকি আফগানিস্তানের পানশির থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে নির্মিত একটি গুলিবিদ্ধ অ্যাটাক হেলিকপ্টার কিনে এনেছেন। যুদ্ধে জখম হওয়া হেলিকপ্টারটি তিনি সাংগ্রে ডে খ্রিস্ত পাহাড়ে তার বাইশ একরের প্লটে সিমেন্টের প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে স্থাপন করেছেন। জায়গাটি জংলা ও রিমোট। ওই দিকে আমেরিকান আদিবাসীদের পোয়েভলো বা গ্রাম থাকার ফলে—ওসব জায়গায় নিউ মেক্সিকো পুলিশের ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ পোয়েভলোগুলো মূলত স্বায়ত্তশাসিত, ওখানে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের পুলিশের ঢুকে পড়ার আইনি অধিকার নেই। ফেডারেল সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হয়তো ওদিকে ঢুকতে পারবে, তবে তাদেরও আদিবাসীদের প্রশাসনিক অথরিটির কাছ থেকে পারমিশন নেওয়ার ঝামেলা ঘাঁটাতে হবে। হেলিকপ্টার চত্বরে মরগান খোলা আকাশের তলায় একটি পাথরের ফায়ারপ্লেস বানিয়েছেন। তা ঘিরে পূর্ণিমা রাতে বসে মুনলাইট ক্যাম্পফায়ারের মাহফিল। সিনিওর সানতসের কাজ হচ্ছে—ক্যাম্পফায়ারের পর ওখানে গিয়ে ছাই ইত্যাদি পরিষ্কার করা, এবং শুকনা কাঠের বান্ডিল পরবর্তী মজমার জন্য মজুত করে রাখা। এছাড়া ফায়ারপ্লেসের পাশে জঙ্গলে আছে ওপেন এয়ার শাওয়ার-সহ বাথরুম ইত্যাদি, সানতস এসবেরও তদারকি করে থাকেন।

হেলিকপ্টার চত্বরের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে সানতস ফিসফিসিয়ে বলেন, মুনলাইট ক্যাম্পফায়ারে জোফেস মরগান নাকি আমোদ-প্রমোদের জন্য জ্যোত্স্নারাতে জড়ো করেন কয়েকটি হিস্পানিক কন্যাকে। মেয়েগুলো মেক্সিকো থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান। হেলিকপ্টারটির দেয়ালগুলোও মরগান সাজিয়েছেন চাইল্ড পর্ণগ্রাফির রুচিবর্জিত চিত্রাদি দিয়ে। আমি তার সঙ্গী হয়ে ওখানে গিয়ে চাপলিশে হেলিকপ্টারের একটি ছবি তুলতে চাইলে সিনিওর সানতস রাজি হন। আজকে তিনি সাংগ্রে ডে খ্রিস্ত পাহাড়ে হেলিকপ্টারের গোপন আস্তানায় আমাকে নিয়ে যাবেন—এ রকমের কথা দিয়েছিলেন। টিপি ও লো-রাইডার ভিনটেজ মোটর কারে শোভিত পার্কে তার দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল! আরো মিনিট কয়েক অপেক্ষা করে অধৈর্য হয়ে আমি তাকে টেক্সট করি। জবাবে তিনি একটি অ্যাড্রেস দিয়ে আমাকে ওখানে যেতে বলেন।

এসপানিওলা শহরের প্রান্তিকে সানতসের দেওয়া ঠিকানা খুঁজে পেতে সমস্যা কিছু হয় না। কাঠের বাড়িটির সর্বত্র নিম্নবৃত্ত হিস্পানিক সংস্কৃতির ছাপ। ছাদ থেকে ঝুলছে মেক্সিকান পালা-পার্বণে ব্যবহূত নকশা করা রঙিন কাগজের ঝলমলে স্কোয়ার। দুয়ারে নক করতেই ছিমছাম গোছের ফরসামতো এক নারী দুয়ার খুলে দেন। আমি তার চোখমুখে জমে থাকা বিষাদ দেখতে পেয়ে চমকে উঠি। মনে হয়, এ নারী একটু আগে জননী মরিয়মের থানে প্রার্থনা করতে করতে অজোর হয়ে কেঁদেছেন। আমাকে কিছু বলতে হয় না। মনে হয়, মহিলা আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি ‘বিয়েনবেনিদো সিনিওর’ বলে আমাকে ওয়েলকাম করে নিজের পরিচয় দেন, তার নাম সিনিওরা মারিয়া। আমি তার বাড়িয়ে দেওয়া হাত স্পর্শ করতেই তিনি মৃদু স্বরে বলেন, ‘সানতস এসতা এসপারানডো এন এল পাটিও তারসেরো, বা সানতস তোমার জন্য ব্যাকইয়ার্ডে অপেক্ষা করছে।’ সিনিওরা মারিয়ার হাতের ইশারা অনুসরণ করে আমি চলে আসি কাঠের বাড়িটির পেছনের আঙিনায়। দেখি, সানতস দোলনার ফ্রেমের সামনে ছোট্ট একটি মেয়ের সঙ্গে স্নেহময় খেলায় মশগুল হয়ে আছেন। আমাকে দেখতে পেয়ে খেলা থামিয়ে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিয়ে তিনি আমার সঙ্গে খুব উষ্ণভাবে হাত মেলান। কথায়বার্তায় জানতে পারি, বাচ্চাটির নাম ভেরোনিকা। ডিভোর্সপ্রাপ্ত সিনিওরা মারিয়া তাকে নিয়ে একাই এ বাড়িতে থাকেন। এখানকার একটি কামরা সানতস সাবলেট নিয়ে রেখেছেন। যখন কাজের চাপ থাকে না, তখন এ বাড়িতেই তিনি বিশ্রাম করেন।

আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে হয় না। ভেরোনিকাকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে সানতস যেন মারাত্মক কোনো অপরাধ করেছেন—এ রকম কাচমাচু ভঙ্গিতে বলেন, ‘লো সিয়েনতো মুচো সিনিওর সুলতান... আই উনা প্রবলেমা... বা যারপর নাই দুঃখিত সুলতান সাহেব, একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে।’ আমি বিরক্তি চেপে মনোযোগ দিয়ে তার ব্যাখ্যা শুনি। না, হেলিকপ্টারের চত্বরে আমাকে নিয়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, তিন দিন আগে জোসেফ মরগান জংলা জায়গাটির গাছের ডালে, হেলিকপ্টারের ব্লেডে সবর্ত্র ক্যামেরা লাগিয়েছেন। তাকে জানানো হয়েছে যে, সিকিউরিটি কোম্পানির টেনিংপ্রাপ্ত একজন অ্যাজেন্ট ক্যামেরা থেকে প্রাপ্ত ভিজ্যুয়াল ডাটা বিশ্লেষণ করে সারাক্ষণ মুনলাইট ক্যাম্পফায়ারের থানটিকে নজরে রাখছেন। তিনি আমার দিকে অপরাধীর বোবা চোখে তাকিয়ে থাকলে— আমি যুগপত্ বিব্রত ও হতাশ হই। বুঝতে পারি, মরগানের মুনলাইট ক্যাম্পফায়ার নিয়ে লেখার সম্ভাবনা পকেটের ফুটো দিয়ে সড়কে গলে পড়া আধুলির মতো চিরতরে হারিয়ে গেল। সিনিওর সানতস ফের ক্ষমা চান। আমি কিছু বলি না, তবে বেজায় খিন্ন লাগে।

সিনিওরা মারিয়া ব্যাকইয়ার্ডে এসে ম্লান হেসে এবার ইংরেজিতে বলেন, ‘কামঅন অভার অ্যান্ড হ্যাভ অ্যা কাপ অব কফি। সান্তাফে থেকে ড্রাইভ করে এসেছ, এক পেয়ালা কফি খেলে তোমার ভালো লাগবে।’ আমি সিনিওর মারিয়ার পেছন পেছন তার সিটিংরুমে ঢুকতে ঢুকতে মহিলার ওয়েলকামিং আচরণ নিয়ে ভাবি। পুরোনো রংচটা সোফায় আরাম করে বসার জন্য তিনি যেভাবে আমার দিকে একটি কুশন বাড়িয়ে দেন, তাতে তাকে অনেকদিন পর দেখা হওয়া প্রিয় খালাত বোনের মতো অন্তরঙ্গ মনে হয়।

যে তথ্যের তালাশে এতটা পথ ড্রাইভ করে এসেছি, তা না পাওয়ার হতাশা ফের আমাকে আচ্ছন্ন করে। আমি ওয়াকিবহাল যে—ট্র্যাভেলে আনন্দ যেমন অঢেল, তেমনি অপ্রাপ্তিও প্রচুর। ভাবি, যা পাইনি তা নিয়ে খেদ না করে বরং এ অব্দি এসে সিনিওরা মারিয়ার সঙ্গে পরিচিত হয়ে যা পাচ্ছি, তাতে মনোযোগ দিলে আখেরে আমি হয়তো লাভবান হবো। মারিয়া তপ্ত কফির ট্রে নিয়ে কামরায় ফিরে আসেন।