ত্রিদিব দস্তিদারের কাব্যদর্শন এবং শেষ কবিতা

প্রণব মজুমদার

আমরা কবি ত্রিদিব দস্তিদারকে ভুলে গেছি! নিভৃতে কাঁদে তার হূদয়ঘনিষ্ঠ মননশীল শব্দাবলি! স্মরণসভা নেই! দেশের সাহিত্য সাময়িকীর পৃষ্ঠাগুলোতে নিশ্চুপ তার গৃহপালিত পদ্যেরা! যে সবাইকে ভালো বাসতে বাসতে ফতুর করে জীবন দিয়ে গেল। তার জন্য প্রেম কোথায়? অজাতশত্রু প্রেম ও দ্রোহের সেই কবিকে আমরা মনে রাখিনি

আমরা কবি ত্রিদিব দস্তিদারকে ভুলে গেছি! নিভৃতে কাঁদে তার হূদয়ঘনিষ্ঠ মননশীল শব্দাবলি! স্মরণসভা নেই! দেশের সাহিত্য সাময়িকীর পৃষ্ঠাগুলোতে নিশ্চুপ তার গৃহপালিত পদ্যেরা! যে সবাইকে ভালো বাসতে বাসতে ফতুর করে জীবন দিয়ে গেল। তার জন্য প্রেম কোথায়? অজাতশত্রু প্রেম ও দ্রোহের সেই কবিকে আমরা মনে রাখিনি!

মননশীল লেখকের অধিকাংশের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় তার সৃজনীকর্মে। সত্যি একজন ভালো মানুষের সন্ধান পেয়েছিলাম তিরিশ বছর আগে।

১৯৮৮ সালের ডিসেম্বর মাস। মহানগরীর বাংলা মোটরে অবস্থিত বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের নিচতলায় আমরা বিজয় দিবস উপলক্ষে সূর্যমুখী সংগঠনের উদ্যেগে কবিতা পাঠের আয়োজন করেছি! আমাদের বার্ষিক বিজয় উদ্যাপনের দিনে কবিতা পাঠের সেই আয়োজনে সপ্রতিভ ব্যক্তিটি দাঁড়িয়ে গেলেন মাইক্রোফোনের সামনে! সাদাকালো গোছানো শ্মশ্রুমণ্ডিত এক যুবক! হাতে হাতবালা ও বড়ো ডায়ালের ঘড়ি, কানে দুল! চুল বেনীবদ্ধ! মালা গলায়! রংচটা জিনসের সঙ্গে হলুদ গেঞ্জি পরা এবং তার ওপর প্রান্তে কালো চশমা ঝোলানো। বিজয়ের আনন্দে উজ্জীবিত কবি! দরাজ কণ্ঠে ও সাবলীল ভঙ্গিতে পাঠ করে চলেন নিজের কাব্যসম্ভার!

‘বাটখারা পড়ে গেলে চ্যাপ্টা হয়

ওজন কমে না...’

কবিতাটি আরো কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে একাধিকবার কবিকণ্ঠে শুনেছি। তার প্রিয় কবিতায় গভীর জীবনদর্শন তা সকলকেই ভাবায়! জীবন সংসারের কী অপূর্ব উক্তি—মানুষ পড়ে গেলে হাতল খোঁজে, মানুষ বাড়ে না, মানুষ পড়ে গেলে স্বপ্ন খোঁজে, ভ্রান্তি কমে না! আহা! বস্তুজগত্ এবং মানব জীবনের সফল মিশ্রণে চেতনাবোধের অনুভূতি তার বেশ প্রখর। যেন যুগ-উত্তীর্ণ কালের দর্শন!

শুধু কবিতা দিয়ে যার সঙ্গে ভাব আমার, সেটা বজায় ছিল দীর্ঘ সময়। চট্টগ্রামের পটিয়া থানার ধলঘাট গ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও তার মধ্যে বিন্দুমাত্র অহমিকাবোধ দেখিনি। কবিতাই ছিল তার একমাত্র আরাধনা। সবাইকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল কবি ত্রিদিব দস্তিদারের। দুই বাংলার এমন কবি ও সাহিত্যিক কমই আছেন—যারা এ কবিকে না চিনতেন। কাব্য ও সাহিত্যের আড্ডায় তিনি ছিলেন দুর্নিবার বক্তা এবং মনোগ্রাহী শ্রোতা। পশ্চিম বাংলার প্রখ্যাত কবি ও কথাশিল্পী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও অন্যান্য সাহিত্যিকসহ কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী, ফজলে লোহানী, ফজল শাহাবুদ্দীন, বেলাল চৌধুরী, শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, গাজী শাহাবুদ্দীন আহমদ, সুশান্ত মজুমদার, মনু ইসলাম থেকে নবীন লেখক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে তার হূদয়জাত সম্পর্ক ছিল। তাঁকে দেখতাম, সেগুন বাগিচা, মতিঝিল-দিলকুশার ব্যাংক-বীমা দফতরে, পত্রিকা অফিসে, শাহবাগের বিভিন্ন এলাকায়। সবার সঙ্গেই কথা বিনিময়। কোনোদিন তাকে আলাপচারিতায় বিবর্ণ হতে দেখিনি! প্রাণোচ্ছল এবং সাবলীল তিনি। দেখা হলেই মহানগরীর ফুটপাতে বসে চা-আড্ডা। বিল তিনিই দিতেন বেশির ভাগ সময়। বলতাম, আপনার কবিতা শোনান। শোনাতেন সহাস্যে এবং আগ্রহাতিশয্য নিয়ে! নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় টিএসসি ও শাহবাগে প্রায়ই দেখা হতো। টিএসসির সড়কদ্বীপে ভারত থেকে আগত গণসংগীত শিল্পী অজিত পাণ্ডের গণসংগীত ও কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে আমার ‘তাক রাইফেল তাক’ ছড়াটি শুনে অজিত পাণ্ডের মতো তিনিও বেশ প্রশংসা করেছিলেন সেদিন।

১৯৯৬ সালের প্রারম্ভিক মাসের মধ্যভাগ। ১ নম্বর রামকৃষ্ণ মিশন রোডে অবস্থিত দৈনিক ইত্তেফাকের নিউজ সেকশন। বাংলা ভাষা নিয়ে কথা হচ্ছিল সেদিনের শীতের বিকেলে। বক্তা ইত্তেফাকের শিফট ইনচার্জ সৈয়দ এহিয়া বখ্ত। শ্রোতা হিসেবে ডেস্কের সামনে বসা কবি ত্রিদিব দস্তিদারও। ত্রিদিবদা বললেন, বখ্ত ভাই (প্রয়াত) কী বলে শুনুন! নমস্য প্রবীণ সাংবাদিক সুন্দরতম সুপুরুষ সৈয়দ বখ্ত। পুনরায় বললেন, বাংলা ভাষা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষা হিসেবে একদিন চিহ্নিত হবে। এ কথা শুনে কবি হাসলেন। কবিকে সব সময় হাসিমুখে কথা বলতে দেখেছি। 

জীবনের শেষ সময় প্রাণখুলে বন্ধুদের সঙ্গে হেসেছেন সমুদ্রে বেড়াতে গিয়ে। মৃত্যুর সপ্তাহখানেক আগে ২০০৪ সালের ১৬ নভেম্বর বন্ধু কবি তুষার দাশ, সিদ্ধার্থ হক ও ব্রাত্য রাইসুকে নিয়ে কক্সবাজার সমুদ্রস্নানে গিয়েছিলেন। বাড়ির কাছেই এ সমুদ্র! অথচ সেটাই প্রথম ও শেষ যাত্রা। কবি তুষারকে স্নানশেষে বলেছিলেন, ‘জীবনের সব পাপ ধুয়ে নিলাম।’ ঢাকায় ফিরেই ২২ নভেম্বর লিখেন ৩টি কবিতা। কবিতাগুলোতে কবির হতাশা ও বিরহ প্রবলভাবেই এসেছে। বেশ মননশীল! কবিতা তিনটি পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরছি—

 

নিঃসঙ্গতার গুণন

 

একা থাকতে থাকতে

এক-এর অঙ্কে আছি

এক-অকে এক

আর কোন গুণন সংখ্যাই

এখন বাড়ে না

বাড়ে শুধু নিঃসঙ্গতার গুণন

একাই নিজের পৃথিবীকে ভাবি

এক ঈশ্বর

একটাই কবিতার লাইন

‘নিঃসঙ্গতার গুণনে আমি’

এবং জীবন

 

 

নতুন নাম্বারে তুমি

 

আমাকে ভুলতে না পারার

কিছুই দেখি না স্মৃতিতে

কিছুই দিইনি স্মৃতিতে

তবু স্মৃতির জাল ছেঁড়া নিয়ে

হয়ে যাই ইঁদুরের ডামি।

আমিতো প্রেমিক নই

   প্রেমিকের ডামি

   আমাকে সামনে রেখে

   তোমার কথাই

   ভাবছেন অন্তর্যামী।

সেলফোন নাম্বার বদল হলে

তোমাকে চিনতে পারি না

হারিয়ে ফেলি পুরানো তুমি

দেখি নতুন নাম্বারে কান পেতে

   তোমার রুমি

বন্ধুত্ব জাগিয়ে রাখা

শুধুই কি আমার কাজ

এক পক্ষের খোঁজ-খবর

এও কি কপালের তাজ?

 সমুদ্রের ডি-হাইড্রেশন

 

ভাটা সমুদ্রের ডি-হাইড্রেশন

সমুদ্র মানুষকে টানে ডি-হাইড্রেশনে

তবে ফিরিয়ে দেয় তার আকার ও পরিমাপ

আমরা চারবন্ধু তুষার, সিদ্ধার্থ, রাইসু

আর আমি

জলের সান্নিধ্যে আছি বেশ কিছু দিন

গলাধিকরণেও নোনা ঢেউ

হয়ে ওঠে আজ স্কটল্যান্ডীয় সোনালি শিশির

সৈকতের বালিয়াড়ি উষ্ণতায়

ফিরে পাই যেন পরস্পরের কাব্য ভাবনার ঋণ

বাংলা কবিতার ডি-হাইড্রেশন

 

এ যদি হয় আমাদের বাংলা কবিতার ধারা-বর্ণনার কক্সবাজার

তবে বড়ো অহংকারী মনে হয় এসব উপাদান

উপাদান আশ্রয়ী উপকরণ খোঁজার পালা

হাফপ্যান্ট পরে কবিতার জোয়ারের দিকে ছুটে যাওয়া

শব্দ ও ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করা, সাঁতার কাটা

সমুদ্র-গর্জনে ভয় পেয়ে কূলে ওঠার চেষ্টা করা

তবে আমাদের প্রবীণ সাহিত্য-সাঁতারুরা

নিজেকে সমুদ্র-রচনার পারদর্শী ভাবতে ভাবতে

কবে যে কূলে উঠে গিয়েছিলো ওরা আমরা ভাবিনি

 

তাই শিল্পের ডি-হাইড্রেশন

আর সমুদ্রের ডি-হাইড্রেশন আজ

আমাদের সৈকতের ক’টা দিনে আজ এক হয়ে গেলো।

 

মাত্র ৫২ বছর বয়সে ২০০৪ সালের ২৫ নভেম্বর প্রতিভাবান সৃজনশীল মুক্তিযোদ্ধা কবির জীবন থেকে বিদায়, সে তো মেনে নেয়ার মতো নয়! মাত্র ৬টি কাব্যগ্রন্থ কবি ত্রিদিব দস্তিদারের। ৩১ ডিসেম্বর তার ৬৭তম জন্মবার্ষিকী। আগামী প্রজন্মের কাছে একত্রে ত্রিদিব দস্তিদারের কাব্যসমগ্র তুলে দেওয়ার দায়িত্ব তো আমাদেরই। তার কবিতাসমগ্র প্রকাশে সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কি এগিয়ে আসতে পারে না?

 

ছবি পরিচিতি

১. চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীসহ শিল্পী, সাংবাদিক ও অভিনেতার মাঝে কবি ত্রিদিব দস্তিদার

২. বাঁ থেকে কথাশিল্পী সুশান্ত মজুমদার, কবি ত্রিদিব দস্তিদার, কবি শামসুর রাহমান, মিসেস কাইয়ুম চৌধুরী ও বীথি শাহাবুদ্দিন

৩. নিজের হাতে কবির লেখা কবিতা

৪. শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর স্কেচে কবি ত্রিদিব দস্তিদার

৫. বাঁ থেকে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবি ত্রিদিব দস্তিদার, শিশুসাসিত্যিক অমরেন্দ্র চক্রবর্তী ও কবি বেলাল চৌধুরী