অন্ধ

ইকবাল খন্দকার

মনসুর সাহেব গভীর মনোযোগ সহকারে ফাইল সই করছেন। রুমে এখন কাগজ-কলমের খসখস শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাত্ আবু বকরের প্রবেশ। তার স্যান্ডেলের শব্দ আধিপত্য বিস্তার করে কাগজ-কলমের শব্দের ওপর। আবু বকর এই অফিসের সবচেয়ে পুরনো পিয়ন। বিশ্বস্তও। তাই হুটহাট স্যারের রুমে ঢুকে পড়ার অধিকার কেবল তারই আছে। মনসুর সাহেব মুখ তোলেন। তাকান চশমার ওপর দিয়ে। তার চোখে এই প্রশ্ন—আমি তোমাকে বলিনি বিশ মিনিট নিরিবিলি কাজ করতে চাই? না ডাকলে আসবে না? তবু কেন এসেছো?

মনসুর সাহেবের চোখের প্রশ্নের জবাব আবু বকর দেয় মুখে—স্যার, একটা লোক আসছে। আমি তাকে বলছি স্যার আপনি বিজি। কিছুক্ষণ বসতে হবে। সে বলল তার নাকি খুব শরীর খারাপ। বসে থাকতে কষ্ট হইতেছে। একটা অসুস্থ মানুষকে বসায়া রাখছি, এইটা শুনলে আপনি পরে আবার রাগ করতে পারেন, এই জন্য স্যার চলেই আসলাম। আর স্যার, লোকটার কথা শুনে যা বুঝলাম, আপনি তাকে চিনেন। আপনার এলাকার বা আশপাশের। এই জন্য বিষয়টাকে আরো বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। এখন স্যার আপনি যা বলবেন, তা-ই করবো।

—তোমার বেশি কথা বলার রোগটা আর সারল না। গম্ভীর মুখ কিছুটা সহজ করে বলেন মনসুর সাহেব।

—সরি স্যার। কিন্তু স্যার, বিষয়টা বিস্তারিত না বললেও তো চলত না।

—চলত। লোকটাকে দেখে কি বোঝা যায়নি সে অন্ধ?

—গেছে স্যার।

—তাহলে প্রথমে ‘অন্ধ’ বলে ফেললে প্রবলেম কী ছিল? বাড়ি আমার এলাকায় না কোন এলাকায়, শরীর খারাপ না ভালো, এতকিছু বলার কোনো মানে হয়?

—সরি স্যার।

—কথায় কথায় সরি না বলে কী বলি, কেন বলি, একটু বোঝার চেষ্টা করো। তাহলে দেখবে কথা বেশি বলার রোগটা আর থাকবে না। যাও, পাঠিয়ে দাও।

 মুখে ‘আসসালামু আলাইকুম স্যার’ আর মনে মনে ‘অতদিনে যেই রোগ সারে নাই, সেই রোগ জীবনেও সারবো না’ বলতে বলতে স্যারের রুম ছাড়ে আবু বকর। মনসুর সাহেব হাতের ফাইলটার কাজ শেষ করার জন্য দ্রুত কলম চালান। কাজ শেষে ফাইলও বন্ধ হয় হাবিবুল্লাহরও আগমন ঘটে। আবু বকর তাকে হাত ধরে নিয়ে এসেছে। হাবিবুল্লাহ সালাম দেয়। মনসুর সাহেব সালামের জবাব দিয়ে জানতে চান সে এখন কেমন আছে, শরীর খারাপ হলো কীভাবে। আর আঙুলের ইশারায় আবু বকরকে বলে তাকে সোফায় বসিয়ে দিতে।

হাবিবুল্লাহ বসে। আবু বকরের হাত থেকে নিজের সাদা ছড়িটা ফেরত নেয়। জানায় সে ভালো আছে। মনসুর সাহেব শরীর খারাপের বিষয়টা আবার উল্লেখ করেন। আশ্বাস দেন, বেশি খারাপ লাগলে অফিসে প্রাথমিক চিকিত্সার ব্যবস্থা আছে। হাবিবুল্লাহ বলে—এহন আর খারাপ লাগতাছে না। যখন আইসা বসলাম, তখন খুব মাথা ঘুরতেছিল। মনে হইতেছিল বমি হইবো। এইরকম আমার প্রায়ই হয়। বাসে উঠলেই হয়। আমার বউ-মাইয়াও বাসে উঠলে গড়গড়ায়া বমি করে। কী যে একটা মসিবত!

মনসুর সাহেব জানতে চান কী খাবে। চা-বিস্কুট আনাবেন কি না। হাবিবুল্লাহ আমতা আমতা করে। মুখ ঘোরায় ডান থেকে বামে। মনসুর সাহেব বুঝতে পারেন সে কিছু খায়নি। তাই রুম থেকে বের হয়ে যেতে থাকা আবু বকরকে ডেকে বলেন খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য। আবু বকর জানতে চায় খাবার এখানে নিয়ে আসবে নাকি হাবিবুল্লাহ যাবে খাবারের কাছে। মানে ক্যান্টিনে। মনসুর সাহেব জবাব দেওয়ার আগেই হাবিবুল্লাহ বলে ওঠে—আনতে হইবো না। আমিই যামু। তয় একটু কথা বইলা নেই। আপনে যান।

শেষের বাক্যটায় মনক্ষুণ্ন হয় আবু বকর। কিন্তু স্যারের সামনে প্রকাশ করার দুঃসাহস নেই তার। তাই সে কী তরকারি আনবে, সঙ্গে সবজি আনবে কি না—এসব জিজ্ঞেস না করেই বের হয়ে যায় রুম থেকে। হাবিবুল্লাহ মুখ ঘোরায় মনসুর সাহেবের দিকে। বলে—আমার লাইগা আপনে কত কী করতাছেন। আমি আপনের কাজের ‘ডিস্টাব’ করি, আপনের লোকজনের কাজের ‘ডিস্টাব’ করি। তবু আপনে বিরক্ত হন না। রাগ করেন না। এইটার ফল আল্লায় আপনেরে দুই হাত ভইরা দিবো।

মনসুর সাহেব চেয়ার ছেড়ে ওঠেন। তারপর প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে গুটিগুটি পায়ে চলে যান হাবিবুল্লাহর সামনে। বলেন—আল্লাহর কাছ থেকে খুব বড় ফল পাবো বা মানুষ আমার কাজের খুব প্রশংসা করবে, এই আশায় কখনোই আমি কাউকে সাহায্য-সহযোগিতা করি না। ভবিষ্যতেও করবো না। আমি মনে করি, আল্লাহ আমাকে মানুষের জন্য কিছু করার সামর্থ্য দিয়েছেন, অতএব করতে হবে। যদি না করি, পরকালে আল্লাহ আমাকে ছাড়বেন না। তবে তোমার জন্য বিশেষ কিছু করার সামর্থ্য বোধহয় আল্লাহ আমাকে দেবেন না।

—এইটা আপনে কী বলতেছেন? আল্লায় আপনেরে সামর্থ্য না দিলে আর কারে দিবো? দেশের কোনো মানুষ বাদ আছে, যার কাছে হাত পাতি নাই? আপনে ছাড়া কেউ ফিরা তাকাইছে আমার দিকে? আবেগে হাবিবুল্লাহর গলা চড়ে যায়।

—তুমি হয়তো আমার কথা বুঝতে পারোনি।

—স্যার, আমি কিচ্ছু বুঝতে চাই না। আমার চক্ষু দুইটা ভালো কইরা দেন। আমি দুনিয়া দেখতে চাই। আমি আপনেরে দেখতে চাই স্যার।

হাবিবুল্লাহর চড়া গলা এবার বুজে আসে কান্নায়। আর এ কান্না ছুঁয়ে যায় মনসুর সাহেবকেও। তিনি হাবিবুল্লাহর পাশে বসে তার হাত ধরেন। সস্নেহে বলেন—তুমি তো জানো, আমি দেশের বড় বড় চক্ষুবিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছি তোমার চোখের ব্যাপারে। তারা কী বলেছে, সেটাও তুমি জানো। সবার এককথা। ওই আট-দশ জনের মধ্যে একজনও যদি বলত অপারেশন করালে তোমার চোখ ভালো হবে, আমি তা-ই করতাম। দেশে না হলে বিদেশে নিয়ে যেতাম। টাকা-পয়সা তো এখানে কোনো ব্যাপার না।

হাবিবুল্লাহর মুখ করুণ হতে থাকে। মনসুর সাহেব বাম হাত দিয়ে তার পিঠে চাপড় মেরে বলেন— এখনই এত ভেঙে পড়লে তো চলবে না। ডাক্তার যা বলেছে, হতাশাজনক। রিপোর্টে যা এসেছে, তাও হতাশাজনক। আর এই হতাশাটা আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তোমার ক্ষেত্রে তো না। তোমাকে শক্ত থাকতে হবে। যদি শক্ত থাকতে পারো, তাহলে একটা আশার খবর শোনাতে পারি। আশা কতটা পূরণ হবে বা কবে পূরণ হবে, সঠিক বলতে পারবো না। তবে খবরটা শুনতে তো সমস্যা নেই। আছে?

—স্যার, একটু আগেই তো আপনে বললেন আমার লাইগা বিশেষ কিছু করার সামর্থ্য নাকি আল্লায় আপনেরে দিবো না। এরপরে আর আশা করার মতো কিছু থাকে? তাইলে আর ওইসব খবর-খোবর শুইনা কী হইবো?

—কিচ্ছু না হোক। তবু শোনো। এতদূর থেকে এখানে আসতে পেরেছো, কী বলি শুনতে পারবে না? তুমি না এলে অবশ্য আমিই তোমার কাছে যেতাম। ডাক্তার সুবল সেন কী বলেছিল মনে আছে? বলেছিল, দশবার অপারেশন করলেও এই চোখ ভালো হবে না।

—স্যার, মনে আছে সবই। কুফা কথা মানুষ জীবনেও ভোলে না।

—কুফা কথা? সুবল সেনের সব কথাই কুফা ছিল? কেউ মরণোত্তর চক্ষু দান করলে সেই চোখ লাগিয়ে তোমার চোখের আলো ফিরিয়ে আনা যেতে পারে, তার এই কথাটাও কি কুফা?

হাবিবুল্লাহর মুখের অন্ধকার এবার কেটে যেতে শুরু করে। কারণ, সে বুঝতে পেরেছে মনসুর সাহেব কী বলতে চাচ্ছেন, কী বলতে যাচ্ছেন। কিন্তু তার বোঝা যদি নির্ভুল না হয়? সে যা আশা করছে, যে আশাপূরণের খুশিতে তার মুখের অন্ধকার কাটছে—ঘটনা যদি তেমন না হয়ে বিপরীত বা অন্য কোনোরকম হয়? হাবিবুল্লাহ তাই অপেক্ষায় থাকে মনসুর সাহেব কখন স্পষ্ট করে কিছু বলবেন। কখন উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি সুখবরটা দেবেন আর সে লাফিয়ে উঠবে খুশিতে।

হাবিবুল্লাহ ঘাড় বাঁকা করে বসে থাকে। আর মনসুর সাহেব প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকেন তার মুখের দিকে। কিন্তু যখন তিনি বুঝতে পারেন সে আনমনা হয়ে পড়েছে, তখন নিজের প্রশ্নের জবাব নিজেই দেন—ডাক্তার সুবল সেনের ওই কথাটা ‘কুফা’ ছিল না। যদি কুফা হতো, তাহলে খালেক সাহেবের সন্ধান আমরা পেতাম না। তুমি জানো, একজন মরণোত্তর চক্ষুদানকারীকে খুঁজে পাওয়া কত ভাগ্যের ব্যাপার? কয়জন অন্ধ এমন ভাগ্য নিয়ে জন্মায়?

হাবিবুল্লাহ দুরুদুরু বুকে খালেক সাহেবের পরিচয় জানতে চায়। মনসুর সাহেব জানান, এই লোক তার অন্ধকার জীবনের জন্য আশীর্বাদ। খোদা তায়ালার পাঠানো ফেরেশতাতুল্য। কারণ, তিনি মরণোত্তর চক্ষুদানের ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণাও দিয়েছেন, চোখ জোড়া তিনি অন্য কাউকে না, হাবিবুল্লাকেই দেবেন। আর ঘোষণাটা মুখে মুখে দেননি। কাগজে লিখে দিয়েছেন। তার পরিবার-পরিজনের উপস্থিতিতে, মনসুর সাহেবের উপস্থিতিতে। সুতরাং খালেক সাহেবের জীবনাবসান মানেই হাবিবুল্লাহর নতুন জীবনের সূচনা। প্রাণভরে পৃথিবীর আলো দেখার শুরু।

আনন্দ আর আবেগ—কোনোটাই সামলাতে পারে না হাবিবুল্লাহ। সে ভুলে যায় মনসুর সাহেবের সঙ্গে তার আকাশ-পাতাল ব্যবধানের কথা। তাই পরম বন্ধুর মতো আচমকা জড়িয়ে ধরে তাকে। আর কাঁদতে থাকে হাউমাউ করে। তার ঘামে ভেজা ময়লা জামার ঘষায় ময়লা হয়ে যেতে থাকে মনসুর সাহেবের সাদা ধবধবে শার্ট। তবু তিনি তাকে সরান না। কান্না থামাতেও বলেন না। যার জীবন কষ্টের কান্নায় ভরা, সে আজ একটু সুখের কান্না কাঁদছে, কাঁদুক না। এমন কান্নার উপলক্ষ কি জীবনে বারবার আসে?

কান্নার তীব্রতা কমে এলে হাবিবুল্লাহ মনসুর সাহেবকে ছেড়ে দেয়। আর নাক-মুখ মোছে পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে্। মনসুর সাহেব ফিরে যান নিজের চেয়ারে্। বেল বাজিয়ে আবু বকরকে ডাকেন। আবু বকর রুমে ঢুকেই জানায় গেস্টদের জন্য নির্ধারিত ডাইনিংরুমে হাবিবুল্লাহর খাবার দেওয়া হয়েছে। অতএব সে চাইলে এখনই খেয়ে নিতে পারে। হাবিবুল্লাহর পেট জ্বলে যাচ্ছে ক্ষুধায়। তবু তার খেতে যেতে ইচ্ছে হয় না। ইচ্ছে হয় মনসুর সাহেবের সঙ্গে আলাপ দীর্ঘায়িত করতে। সবিস্তারের জানতে খালেক সাহেব সম্পর্কে।

মনসুর সাহেব অনেকটা জোর করেই খেতে পাঠান হাবিবুল্লাকে। তারপর আবার খুলে বসেন ফাইল। হাবিবুল্লাহ খেয়ে ফিরতে ফিরতে যে কয়টা সই করা যায়। সে আসার পর আজ আর তিনি কাজ করবেন না। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলবেন, চা খাবেন, খাওয়াবেন। তারপর তাকে নিয়ে চলে যাবেন খালেক সাহেবের বাসায়। ভদ্রলোক এবং তার পরিবারের সঙ্গে হাবিবুল্লাহকে পরিচয় দিয়ে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চান। নিঃশ্বাসটা ফেলে বুক হালকা করতে চাচ্ছেন তিনি গত দুই দিন ধরেই।

অসহায়কে সহায়তা করার মহত্ গুণ নিয়ে জন্মানো মানুষ মনসুর সাহেব। তার কানে কারো বিপদের খবর এসেছে আর তিনি তাকে বিপদ থেকে উদ্ধারের সর্বাত্মক চেষ্টা করেননি, এমন নজির নেই। আবার প্রতিটি চেষ্টাই সফল। হাবিবুল্লাহর বিপদের কথা মনসুর সাহেব প্রথম শোনেন জামিলের মুখ থেকে। জামিল তার খালাত ভাই। গ্রামে থাকে। কলেজে যাতায়াত করে হাবিবুল্লাহদের বাড়ির পাশ দিয়ে। ডায়াবেটিসে অন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষটির বৃদ্ধ বাবা-মা আর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপনের করুণ কাহিনি শুনে সেদিন চোখ ভিজে গিয়েছিল মনসুর সাহেবের। সেদিনই গ্রামে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি।

বিপদগ্রস্তদের জন্য করা অতীতের সব চেষ্টা সফল হলেও হাবিবুল্লাহর বিষয়ে হতাশ ছিলেন মনসুর সাহেব। কিন্তু খালেক সাহেবের খোঁজ পেতেই শিশুতোষ আনন্দ পেয়ে বসে থাকে। আর এই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটান হাবিবুল্লাহকে অফিসে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে। অথচ বিপদাক্রান্ত কাউকে এর আগে তিনি অফিসে আনেননি, আসতে দেননি। লোক মারফত টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন, লোক মারফতই খোঁজ-খবর নিয়েছেন। আর সময় বের করতে পারলে এক নজর দেখে এসেছেন স্বচক্ষে।

হাবিবুল্লাহর প্রতি মনসুর সাহেবের বাড়তি দরদটা ভালো লাগেনি আবু বকরের। তাই পুরো সময় মুখে অমাবস্যা লাগিয়ে রেখেছিল সে। শেষে যখন দেখল হাবিবুল্লাহকে তিনি নিজের গাড়িতে তুলে পাশের সিটে বসিয়েছেন, তখন তো তার চুল টানি চুল ছিঁড়ি অবস্থা। কেন? এত উদারগিরি কেন দেখাতে হবে? বস হিসেবে নিজের একটা ওজন থাকবে না? ফকির-ফাকরারা দান-খয়রাত পেতে পারে, তার মনিবের পাশে বসার অধিকার তো পেতে পারে না! এ কেমন মনিবের অধীনে চাকরি করছে সে?

মনসুর সাহেব যখন হাবিবুল্লাহকে নিয়ে খালেক সাহেবের বাসায় পৌঁছান, তখন সন্ধ্যা। তিনি তাকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আবার বেরিয়ে পড়েন। তবে এবার বের হন একা। হাসপাতালের উদ্দেশে। কারণ, একজনের আকস্মিক ফোনে তিনি জানতে পারেন তার এক আত্মীয় অসুস্থ। বের হওয়ার আগে মনসুর সাহেব হাবিবুল্লাহকে বলেন—খালেক সাহেবের বাসায়ই আরো আধঘণ্টা অবস্থান করতে। এর মধ্যে তিনি লোক পাঠাবেন। সেই লোক তাকে দিয়ে আসবে সে যেখানে যেতে চায়।

মনসুর সাহেবের লোক আসতে আসতে রাত আটটা বেজে যায়। ততক্ষণ আর কেউ সময় না দিলেও রিয়াদ সময় দেয় হাবিবুল্লাহকে। রিয়াদ খালেক সাহেবের নাতি। কলেজ পড়ুয়া। ভীষণ আড্ডাবাজ। হাবিবুল্লাহর সঙ্গে ঘণ্টাখানেক আড্ডা দেওয়ার পর সে তাকে নিয়ে বের হয়ে যায় ঘর থেকে। উদ্দেশ্য— চা খাওয়া। বাড়ির ভেতর থেকে চা আসছিল না তো! কেন আসবে? হাবিবুল্লাহকে বিদায় হতে না দেখে সবাই যেখানে বিরক্ত, সেখানে আবার চা! পারলে ঠেলে বের করে দেয় ঘর থেকে। নিতান্তই মনসুর সাহেবের লোক বলে...

চা খেতে খেতে হাবিবুল্লাহর সঙ্গে আরেক দফা আড্ডা দেয় রিয়াদ। এবারের আড্ডায় উঠে আসে খালেক সাহেবের দুর্বিষহ জীবনের কথা। ছেলে, ছেলের বউ, মেয়ে আর নাতি-নাতনিদের কাছে তিনি কতটা অবহেলার পাত্র, কতভাবে তারা তার মৃত্যু কামনা করে—রিয়াদ বলে। বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে সে। এরপর খেদ ঝরে তার কণ্ঠ থেকে—এইটা কোনো জীবন? এমন অপমানের জীবন নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে? ছি! আমি বুঝি না আল্লাহ আমার দাদাকে কেন তুলে নেয় না। কেন এমন শাস্তি দিচ্ছে আমার দাদাকে।

হাবিবুল্লাহর মোবাইল বেজে ওঠে। সে রিসিভ করে কানে চেপে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে তার শিশু মেয়ের কণ্ঠস্বর। পরম আদর আর ভালোবাসার ‘বাবা’ উচ্চারণ। সে এই উচ্চারণের জবাব দিয়েই শুরু করে কৈফিয়ত দেওয়া—খুব খুশির একটা খবর পাইয়াও আমি তোমারে ফোন কইরা জানাইতে পারি নাই মা। আমার মোবাইলে টেহা আছিল না। তুমি কিন্তু গোস্বা কইরো না মা। আর গোস্বা করলেও খবরটা শোনার পর গোস্বা-মোস্বা পানি হইয়া যাইবো গা।

হাবিবুল্লাহ এবার গদগদ কণ্ঠে মেয়েকে বলে খুশির খবরটা। মেয়ে ‘মরণোত্তর চক্ষুদান’ কী জিনিস বোঝে না বলে সে সময় নিয়ে বোঝায়। এবার মেয়ে ফেটে পড়ে উল্লাসে। তবে মোবাইলের স্বল্প ব্যালেন্সের কারণে এই উল্লাস দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বাবা-মেয়ের কথার সংযোগ। রিয়াদ হাবিবুল্লাহকে জিজ্ঞেস করে তার ফোন দিয়ে বাকি আলাপ সারবে কি না। হাবিবুল্লাহ বলে—থাক। লাগবো না। এখন আপনের লগেই কথা কই।

হাবিবুল্লাহ এবার তার মেয়ের একটা অপূর্ণ ইচ্ছের কথা বলে। মেয়েটার নাকি খুব ইচ্ছে ছিল শাড়ি পরবে। পরে বাবাকে দেখাবে। হাবিবুল্লাহ লাল টুকটুকে একটা শাড়ি কিনেও দিয়েছিল তাকে। কিন্তু মেয়ের ইচ্ছে পূরণ হয়নি। কারণ, শাড়ি পরার উপলক্ষ আসার আগেই অন্ধ হয়ে গেছে তার বাবা। এরপর তাকে কত অনুরোধ করা হয়েছে শাড়িটা পরার জন্য, শোনেনি। অঝোরে কেঁদেছে আর  বলেছে, জীবনেও সে শাড়ি পরবে না। বাবাকে যদি দেখাতে না পারে, তাহলে কেন পরবে? কার জন্য পরবে?

 

এক বছর পর।

শাড়ি পরিহিত মেয়েকে নিয়ে রিয়াদকে দেখতে এসেছে হাবিবুল্লাহ। রিয়াদ এখন কারাবন্দি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ—সে অসুস্থ দাদার মুখের অক্সিজেন-মাস্ক সরিয়ে নিয়ে তাকে হত্যা করেছে।