ইত্তেফাক ডেস্ক
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা ‘শত শত শিশুর জন্ম দিয়ে ফেলে রেখে গেছে’। সদস্যদের যৌন নির্যাতন ও অন্যান্য অপকর্মের কথা জাতিসংঘ স্বীকার করে নিলেও সংকটের বিস্তার যে আরো গভীরে, নতুন এক গবেষণায় তা উঠে এসেছে।
দুই বিশেষজ্ঞের করা নতুন এ গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০৪ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত হাইতিতে থাকা শান্তিরক্ষীদের হাতে ‘এমনকি ১১ বছর বয়সি মেয়েরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, গর্ভবতী হয়েছে’। এদের মধ্যে অনেক নারীকে ‘একাই সন্তানকে বড়ো করার মতো ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।’ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এক একাডেমিক ওয়েবসাইটে মঙ্গলবার এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। শান্তিরক্ষীদের ঘাঁটির কাছাকাছি এলাকায় থাকা হাইতির ২৫০০ নাগরিকের সাক্ষাত্কারের ওপর ভিত্তি করে হওয়া এক গবেষণায় দেশটিতে দায়িত্ব পালন করা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের কিছু সামরিক-বেসামরিক সদস্যের অপকর্মের চিত্র উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
হাইতিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন ফরাসি ভাষায় সংক্ষিপ্ত আকারে ‘মিনুস্তা’ নামে পরিচিত। ‘ফেলে যাওয়া সন্তানরা’ সেখানে এখন ‘ছোটো মিনুস্তা’ নামে পরিচিত, গবেষণায় বলা হয়েছে। ‘আপনার হাতে কিছু পয়সা দিয়ে তারা আপনার শরীরে বাচ্চা দিয়ে গেল,’ হাইতির এক নাগরিক গবেষকদের এমনটাই বলেছেন। হাইতির পাশাপাশি মোজাম্বিক, বসনিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ও সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে থাকা শান্তিরক্ষীদের যৌন নির্যাতনের যেসব অভিযোগ উঠে এসেছে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক সাবিনা লি ও অন্টারিওর কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সায়েন্টিস্ট সুসান বার্টেলসের এ গবেষণাটি তার মধ্যে সাম্প্রতিকতম।
গবেষকদের সাক্ষাত্কার দেওয়া ২৬৫ জন জানিয়েছেন, ১৩টি দেশের সামরিক-বেসামরিক সদস্যরা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে কাজ করতে হাইতিতে এলেও যেসব দেশের নাগরিক হাইতির প্রাপ্তবয়স্ক-অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীদের গর্ভবতী করেছে তাদের বেশির ভাগই উরুগুয়ে ও ব্রাজিলের। সাক্ষাত্কারে কিছু নারী তাদের ওপর জাতিসংঘ কর্মীদের যৌন নির্যাতনের কথা জানালেও অনেকেই সামান্য অর্থ কিংবা খাবারের বিনিময়ে শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। নারীদের সঙ্গে ‘সম্মতিসূচক সম্পর্কে’ জড়ানো শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা হাইতি ছাড়ার পরই ঐ নারী ও তাদের আত্মীয়রা সেসব সম্পর্কের কথা খুলে বলছে।
‘আমি তার (শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্য) সঙ্গে কথা বলতে শুরু করি। সে আমাকে জানায়, সে আমাকে ভালোবাসে। এরপর আমি তার সঙ্গে মেলামেশা শুরু করি,’ কয়েক বছর আগে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে কর্মরত এক সদস্যের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর স্মৃতি হাতড়ে গবেষকদের জানান হাইতির এক নারী। ‘তিন মাস পর আমি গর্ভবতী হয়ে পড়ি। সেপ্টেম্বরে তাকে তার দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়,’ বলেন তিনি। ফি দিতে না পারায় দরিদ্র এ নারী এখন তার সন্তানকে স্কুলেই পাঠাতে পারছেন না। গবেষকদলের অন্যতম সদস্য লি বলছেন, শান্তিরক্ষী মিশনের সদস্য রাষ্ট্রগুলোরই এখন এই মা ও তার সন্তানদের দায়িত্ব নেওয়া উচিত। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক বলেন, ‘এটা জাতিসংঘের সমস্যা নয়। এটি ব্রাজিলের সেনাবাহিনী কিংবা উরুগুয়ে সেনাবাহিনীর সমস্যা। জাতিসংঘও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কোনো উপায় বের করতে পারেনি।’