উত্তরের ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে ঘন কুয়াশা আর কনকনে শীতে কাঁপছে দেশের মানুষ। গত দুই দিন যাবত্ সুর্যের দেখা মিলছে না। ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেছে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল। শীতের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে কষ্ট পাচ্ছে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ঢাকায় তাপমাত্রা ১৬ থেকে ১৩ ডিগ্রিতে নেমেছে, যা রাজধানীতে এ বছরের সর্বনিম্ন। মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭.৯ রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়। হাড় কাঁপানো শীতে কাঁপছে এই জেলার মানুষ। দিনে দিনে তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সেখানকার জনজীবন। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় তাপমাত্রা প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে গেছে রাজশাহী, পাবনা, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, যশোর ও চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে। সারাদেশেই তাপমাত্রা আজ আরো নামতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ আফতাব উদ্দিন বলেন, আরো দুই দিন রাতের তাপমাত্রা কমবে। এটা মৌসুমের প্রথম শৈত্যপ্রবাহ। উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তত্সংলগ্ন বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। উত্তরের শীতল হাওয়া বাড়ছে। পশ্চিমী ঝঞ্ঝা বাধা দিলেই তাপমাত্রা কিছুটা বাড়বে। কিন্তু ঠিক কতদিন ঠান্ডা থাকবে, তা পরিষ্কার করে এখনই বলতে পারছেন না আবহাওয়াবিদেরা।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ শামসুদ্দিন আহমদ বলেন, ডিসেম্বরে বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, যা নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। আবহাওয়া দপ্তর বলছে, গেল সপ্তাহ থেকেই সারা দেশে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে। সূর্যের প্রখরতাও কমছে। আভাস পাওয়া যাচ্ছিল, ঋতুচক্রের এই দেশে শীত হানা দিতে খুব বেশি দেরি নেই। তবে সেটা যে এত হুড়মুড় করে চলে আসবে, তা ভাবেনি অনেকেই। সূর্যের আলোর উত্তাপ কমে যাওয়ায় দিন ও রাতের তাপমাত্রায় পার্থক্যও কমে গেছে। আবহাওয়াবিদ রুহুল কুদ্দুস জানান, ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই তাপমাত্রা কমতে থাকবে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হতে পারে ৬-৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিস্তৃত হবে এলাকা। ঢাকার তাপমাত্রা আরো ২ থেকে ৩ ডিগ্রি কমবে। পাশাপাশি দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শীতের তীব্রতা কয়েক গুণ বাড়বে। তিনি বলেন, রাতের তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে শৈত্যপ্রবাহ ধরা হয়। শনিবারের পর থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাপমাত্রা আবার বাড়তে থাকবে। ২৭ ডিসেম্বর থেকে তাপমাত্রা আবার কমতে পারে। জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে আবার মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হতে পারে। এদিকে গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়—৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আরো ছয় জেলার তাপমাত্রা সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে এসেছে। রাজশাহীতে ৯ দশমিক ৫, পাবনার ঈশ্বরদীতে ৮ দশমিক ৮, নওগাঁর বদলগাছিতে ৯ দশমিক ৫, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৯ দশমিক ৮ এবং যশোরে ৯ দশমিক ২। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৬, সিলেটে ১৫ দশমিক ৮, রংপুরে ১১ এবং খুলনা ও বরিশালে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। রাজশাহী, পাবনা, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, যশোর ও চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং এটি আরো বিস্তার লাভ করতে পারে। আজ ঢাকায় সূর্য ডুববে সন্ধ্যা ৫টা ১৫ মিনিটে। আর সূর্য উঠবে ভোর ৬টা ৩৬ মিনিটে।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী জানান, মৌসুমের শুরুতেই রাজশাহী অঞ্চলে হাড়কাঁপানো শীত পড়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরে রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সকালে কর্মস্থলে বের হয়ে তীব্র শীতের কবলে পড়েছে রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ। তবে ভোরে ঘনকুয়াশা থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা মিলেছে রোদ। এ রোদ যেন রোদ নয়, মনে হয়েছে মিষ্টি রোদ।
পাবনা প্রতিনিধি জানান, তীব্র শীত আর উত্তরের হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পাবনার জনজীবন। স্থবিরতা দেখা দিয়েছে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্মে। ঘনকুয়াশায় ভরে থাকছে চারদিক। যানবাহনগুলোকে দুপুর পর্যন্ত হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। দুপুর বারোটার পর সামান্য সময়ের জন্য রোদ উঠলেও উত্তাপ মিলছে না। শীতের তীব্রতায় সন্ধ্যার পর জনশূন্য হয়ে পড়ছে শহর বাজার।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে শীত জেঁকে বসেছে। শৈত্যপ্রবাহ আর ঘনকুয়াশায় দুর্ভোগ বাড়ছে ছিন্নমূল অসহায় ও দরিদ্র মানুষের। বৃহস্পতিবার ১০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে এখানে ৮ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রহিদুল ইসলাম রহিদ। তবে বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা আরো কমতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। শীতের শুরুতে বিকাল থেকে ভোর পর্যন্ত শীত লাগতো। সকালেই সূর্য উঠে যাওয়ায় তাপমাত্রা বেড়ে যায়। কিন্তু গত দুদিন ধরে আবহাওয়া একেবারেই ভিন্ন মাত্রার। শৈত্যপ্রবাহ আর ঘনকুয়াশায় দুর্ভোগে পড়েছেন ছিন্নমূল শ্রমজীবী অসহায় মানুষ। বিকাল থেকেই মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইছে। রাতভর ঝরছে কুয়াশা বৃষ্টি। আর ভোর থেকে ঘনকুয়াশা বিরাজ করছে। ঘনকুয়াশায় ঢাকা পড়ে আছে রাস্তাঘাটসহ সবকিছু। হাটবাজার রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল কমেছে। কুয়াশার জন্য যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। যানবাহনগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। দুদিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। মাঘের শুরুতেই প্রান্তিক জনপদের অভাবী মানুষের কাছে শীত যেন দুর্ভোগ আর যন্ত্রণা হয়ে ফিরে এসেছে। শৈত্যপ্রবাহ ও ঘনকুয়াশার কারণে অসহায় দরিদ্র মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে।