জমি দখল বন্ধ হইবে কীভাবে

বাংলাদেশে এখন জমি দখল একটি প্রাত্যহিক ঘটনায় পরিণত হইয়াছে। দখল হইতেছে সরকারি জমি, খাস বা ওয়াক্ফ করা জমি, ক্ষমতাহীন ব্যক্তি মানুষের জমি। সর্বগ্রাসী এই দখলদারি হইতে বাদ যাইতেছে না নদনদী, খাল-বিলও। অনেক ক্ষেত্রে কোনো একটি স্থান দখল করিয়া সেখানে ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক সংগঠনের অফিস বা কার্যালয় গড়িয়া তোলা হয়। পরবর্তীকালে সেই অফিস উঠিয়া গেলেও জমি থাকিয়া যায় ঐ প্রভাবশালীর দখলকৃত হইয়া। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতাও এই ক্ষেত্রে কাজ করে। প্রশাসনের লোক হইয়া তাহারা কী করিয়া এমন দখলদারির সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তাহা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে খতাইয়া দেখিতে হইবে। সারাদেশে এই দখল সংস্কৃতি বন্ধে সরকারের সদিচ্ছার পাশাপাশি কঠোরতার প্রয়োজন। কোথাও দলীয় পরিচয়ে, কোথাও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তার আত্মীয়স্বজন পরিচয়ে, কেউ আবার পেশিশক্তির জোরে প্রতিনিয়ত দখল করিয়া লইতেছে সরকারি খাসজমি, খাল-বিল, নদী-নালাসহ মানুষের ব্যক্তিগত ও পৈতৃক সম্পত্তি। আবার জমির সিএস ও এসএ মূল জমির মালিকানা থাকিলেও ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে আরএস নামজারি করিয়া কিংবা জাল দলিল দেখাইয়া একের পর এক জমি দখল করিয়া যাইতেছে ভূমিদস্যু চক্র। ইহা ছাড়া প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়িয়া উঠিয়াছে পেশাদার ভূমি সন্ত্রাসী চক্র। যাহারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাইয়া দখল করিয়া নেয় নিরীহদের জমি।

সারাদেশে লক্ষ লক্ষ একর সরকারি জমি দখল হইয়া আছে। এক হিসাবে রেলওয়ের প্রায় ৯ হাজার একর জমি বেদখল হইয়া আছে। বিভিন্ন সূত্র হইতে জানা যায়, ইহার মধ্যে অনেক স্থানে পাকা স্থাপনা নির্মাণও করা হইয়াছে। আবার কেহ কেহ দখলকৃত জায়গা অন্যের কাছে বিক্রয় বা অর্থের বিনিময়ে হাতবদলও করিয়াছেন। এই সকল দখলকৃত জমি উদ্ধারে সরকারি তত্পরতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নাই। সম্প্রতি ঢাকার আশপাশের নদীগুলি দখলমুক্তকরণে অভিযান চালানো হইয়াছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এই ধরনের অভিযান সারাদেশে পরিচালনা করিতে হইবে। আমরা দেখিতে পাই, একদিকে রহিয়াছে দখলদার-ক্ষমতাবান শক্তি, তাহার সহযোগী প্রশাসনিক শক্তি, অপরদিকে ক্ষমতাহীন নিরীহ মানুষ। সরকারকে এই ক্ষমতাহীনদের পক্ষে দাঁড়াইতে হইবে। যেই সকল অসত্ কর্মকর্তা-কর্মচারী এই দখলদারির সঙ্গে জড়িত তাহাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে।  

অবশ্য আমরা আশা করিতেছি, ভূমি অফিসগুলি শীঘ্রই পুরাপুরি ডিজিটালাইজ হইবে। তাহা হইলে দখলবিষয়ক সমস্যা অনেকটাই লাঘব হইবে। পাশাপাশি বিদ্যমান ভূমি ও স্থাপনা দখল পুনরুদ্ধার আইন ১৯৭০ সালে প্রণয়ন করা হইয়াছিল। ইহার অনেক ধারা বর্তমানে আর প্রয়োগযোগ্য নহে। বর্তমানে ইহা সংশোধনে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। আইনটি অতি সত্বর যুগপোযোগী করিয়া কার্যকর করিতে হইবে। আমরা আশা করি, নূতন আইনটি কার্যকর ও যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হইলে দেশে ভূমি দখলের প্রবণতা অনেকাংশেই হ্রাস পাইবে। সর্বোপরি সরকারের ঐকান্তিক চেষ্টাই পারে এই সমস্যার সমাধান করিতে।