ডা. শায়লা শান্তা
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে নৈতিকতার চরম অধঃপতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সর্বস্তরে যেন একটি অসহিষ্ণু, যান্ত্রিক মনোভাব। পারসপরিক শ্রদ্ধা, সম্মান, ক্ষমা, ভালোবাসা ইত্যাদি মানবিক গুণাবলি যেন লোপ পেতে বসেছে। আমরা এখন আর কোনো কিছু যেন বিবেক দিয়ে চিন্তা করি না। জীবনের ছক কষি লাভ-ক্ষতির বিচারে। অনেকে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্য প্রযুক্তির বিকাশকে দায়ী করেন। কিন্তু প্রযুক্তি কি একমাত্র কারণ?
একটি শিশুর জন্মের পর তার প্রথম শিক্ষা শুরু হয় পরিবারে। তাকে কথা বলতে শেখানো, ছোটো ছোটো কাজগুলো বুঝতে বা করতে সাহায্য করা, এতে তো প্রযুক্তির কোনো হাত নেই। শিশুটি যখন একটু বড়ো হয়, তখন তার ভেতর কতটা নৈতিক মূল্যবোধ কাজ করে তা কি ভেবে দেখছি কখনো! সঠিক পথে নাকি বিকৃত পথে তার মানসিক বিকাশ ঘটছে, পরিবারেরই উচিত সেদিকে লক্ষ্য রাখা। আমরা আমাদের সন্তানদের কতটুকু সময় দিচ্ছি, সেটাও ভেবে দেখতে হবে।
নৈতিক অধঃপতন সমাজের সর্বস্তরে বিদ্যমান। বিবেকবান হওয়ার জন্য সবাইকে তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। মানুষকে ভেতর থেকে অনুভব করতে হবে যে সে মানুষ, শ্রেষ্ঠ কাজগুলো করাই তার দায়িত্ব, পশুর মতো কাজ নয়। আজকাল শিক্ষিত সমাজের মাঝেও অসহিষ্ণু মনোভাব দেখা যায়। শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিত্সক অনেকেই আজ আর হূদয় থেকে কিচ্ছু চিন্তা করেন না। একে অন্যের ভুল-ত্রুটি ধরতে, ছিদ্রান্বেষণ করতে থাকেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ অবশ্যই করতে হবে, সেটা যুগে যুগে মানুষ তার অধিকার আদায়ের জন্য করে এসেছে, কিন্তু সামান্য কারণে অসহিষ্ণু মনোভাব আর কাদা ছোড়াছুড়ি ভালো লক্ষণ হতে পারে না। তবে অনেক নিভৃতচারী সাদা মনের মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেদের স্বার্থের চাইতে বৃহত্তর স্বার্থ বড়ো করে দেখেন।
এই যে অবক্ষয়ের চর্চা শুরু হয়েছে সেটা প্রতিরোধ করতে হবে। আমাদের অনুভব করতে হবে আমাদের সন্তানদের আমরা কী শিক্ষা দিচ্ছি, আর তাদের জন্য কী পৃথিবী রেখে যাচ্ছি। মানুষ অমর নয়, সৃষ্টির নিয়ম অনুযায়ী তাকে একসময় চলে যেতে হয়, কিন্তু সে চায় তার সন্তান বা বংশের মাধ্যমে যেন তার অস্তিত্ব থেকে যায়। সেই অস্তিত্বই যদি অন্ধকারে প্রবেশ করে তাহলে আর মানুষ হয়ে জন্মাবার সার্থকতা কোথায়! আমার মনে হয় আমরা যদি সর্বস্তরে নৈতিকতা চর্চা করি অথবা নিজের বিবেক দিয়ে একটু ভেবে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেই, তাহলে হয়তো বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। এজন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র্র সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। একহাতে তালি কখনো বাজে না, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উন্নত জাতি গঠন অবশ্যই সম্ভব। আমাদের গৌরবের এই স্বাধীনতা কেন আমরা নিজেদের কারণে ম্লান করে দিচ্ছি, এই ব্যাপারটা সর্বস্তরের মানুষকে বিবেক দিয়ে অনুভব করতে হবে। ভৌগোলিক সীমারেখায় হয়তো আমাদের দেশটি ছোটো, কিন্তু উন্নত মন-মানসিকতায় আমাদের বড়ো হতে বাধা কোথায়! আমাদের ভেতরকার আলোটিকে বের করে আনতে হবে।
সৌদি আরব