ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ ও আন্দোলন ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। গতকাল শুক্রবার উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, কর্ণাটকসহ বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। উত্তর প্রদেশে বিক্ষোভে সহিংসতায় ছয় জন নিহত হয়েছে। দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জল কামান ব্যবহার করেছে এবং লাঠিচার্জ করেছে। গতকালও ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের সময় বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। আটক হয়েছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জিও। আইনটি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও। খবর:এনডিটিভি ও আনন্দবাজার পত্রিকার।
গতকাল উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ চলাকালে সহিংসতায় ছয় জন নিহত হয়েছে। রাজ্য পুলিশ এই সংখ্যা নিশ্চিত করেছে। তবে পুলিশের ডিজি ওপি সিং দাবি করেছেন, বিক্ষোভ সমাবেশে তারা একটি গুলিও ছোড়েনি। গুলি বিক্ষোভকারীদের দিক থেকে হতে পারে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী বিজনরে দুই বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এছাড়া সমভাল, ফিরোজাবাদ, মিরাট এবং কানপুরে একজন করে নিহত হয়েছেন।
এনডিটিভির খবরে বলা হয়, জুমার নামাজের পর ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে উত্তর প্রদেশের ১৩ জেলায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ। বিক্ষোভকারীদের দিক থেকে পুলিশের ওপর পাথর নিক্ষেপ করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। গত বৃহস্পতিবার লখনৌতে বিক্ষোভকালে এক জন নিহত হন।
গতকাল সন্ধ্যায় পুরোনো দিল্লিতে বিক্ষোভকারীরা যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করেন। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জল কামান ব্যবহার ও লাঠিচার্জ করে বেশ কিছু বিক্ষোভকারীকে আটক করে। গতকাল দিল্লির জামে মসজিদে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে বড়ো বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন ভিম আর্মির প্রধান চন্দ্রশেখর আজাদ। একই সঙ্গে যন্তর-মন্তর ময়দান অভিমুখে বিক্ষোভ সমাবেশ যাত্রার ঘোষণা দেন। এরপর সন্ধ্যায় শত শত বিক্ষোভকারী নিষেধাজ্ঞা ভেঙে রাজধানীর রাস্তায় নেমে আসেন। পুলিশ ইন্ডিয়া গেটের কাছে তাদের আটকে দিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে একটি গাড়িতে আগুন দেন বিক্ষোভকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ জল কামান ব্যবহার এবং লাঠিচার্জ করে। যদিও পুলিশ বলছে তারা লাঠিচার্জ করেনি এবং কাঁদানে গ্যাসও নিক্ষেপ করেনি। বিক্ষোভকারী ও পুলিশের সহিংসতায় কমপক্ষে ১১ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। তাদের এলএনজেপি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর আটক করা হয়েছে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জিকে। গতকাল ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ দেখানোর অভিযোগে কংগ্রেস নেত্রী শর্মিষ্ঠাসহ দিল্লি মহিলা কংগ্রেসের ৫০ জন কর্মীকে আটক করা হয়। বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করার দাবি জানান মহিলা কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ। ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল আটকে দেয় পুলিশ। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কংগ্রেস কর্মীদের আটক করে পুলিশ। পরে তাদের দিল্লির মন্দির মার্গ থানায় তাদের নিয়ে যাওয়া হয়।
অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়নে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। গতকাল টেলিভিশনে প্রচারিত এক বার্তায় সোনিয়া বলেন, বিজেপি সরকার ভিন্নমত দমনে নির্মম বল প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। গণতন্ত্রে এটা গ্রহণযোগ্য নয়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে নিপীড়নের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া অমুসলিম অর্থাত্ হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি ও খ্রিষ্টানদের নাগরিকত্ব নিশ্চিতে সম্প্রতি আইন সংশোধন করেছে ভারত। এই আইন প্রত্যাহারের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজ্যে ১০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন রাজ্য ও শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বেশ কিছু জেলায়।