কার কেমন শপথ বাক্য

/ শফিক হাসান

 

ছাত্রাবস্থায় অবধারিতভাবে শিক্ষার্থীদের শপথবাক্য পাঠ করতে হতো। ‘আমি শপথ করছি যে’ দিয়ে শুরু হয়ে নানামুখী শপথ! প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যেত স্কুলমাঠে। ছাত্রজীবন পেরিয়ে চাকরিতে ঢোকার আগে কোনো কোনো পেশাজীবীকেও অনুরূপ শপথবাক্য পাঠ করানো হয়। শপথ মানা হবে কি হবে না, সেটা পরের ব্যাপার! কিন্তু (যথার্থ) শপথের বাইরেও রয়েছে বিপুল জনগোষ্ঠী। তাদেরও যদি শপথ বাক্যের আওতায় আনা যায়, কী বলবেন তারা?

 

সরকারি দল

আমরা শপথ করছি যে, কারণে-অকারণে বিরোধী দলকে উত্ত্যক্ত করব না। যেসব অভিযোগ তুলে তারা বিধ্বংসী সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকব। তাদের কোনোভাবে আত্মঘাতী কাজের দিকে ঠেলে দেব না। বিরোধী দলকে অযথা দোষারোপ না করে নিজেদের দোষত্রুটি খুঁজে বের করতে সচেষ্ট হবো। নির্বাচনকালে দেওয়া ইশতেহার যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করব। অমুক দল পালন করবে বলেছে কিন্তু করেনি, তাহলে আমরা কেন করব—এ ধরনের মনগড়া যুক্তি দেখাব না। জনগণের বিপক্ষে, দেশের স্বার্থপরিপন্থী কোনো কাজ করব না। মাস শেষে ঠিকমতো টেলিফোন বিল, গ্যাস বিল, বিদ্যুত্ বিল, পত্রিকা হকারের বিলসহ সব রকম পাওনা পরিশোধ করতে বাধ্য থাকব।

 

বিরোধী দল

আমরা শপথ করছি যে, তুচ্ছ কোনো ছুতানাতায় সরকারবিরোধী অবস্থান নেব না। যদি সংসদ বর্জন করিও, নির্লজ্জের মতো বেতন-ভাতা গ্রহণ করব না। যে কাজের জন্য আমরা বেতন-ভাতা নিই, সেই কাজই যদি না করি তাহলে কেন ফাও টাকা নেব? দেশটাকে নিশ্চয়ই মগের মুল্লুক বানাতে চাই না! সরকারি দলকে শত্রু, প্রতিপক্ষ না ভেবে সহযোগী ভাবব। সরকারের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করার পাশাপাশি তাদের অযৌক্তিক কাজ তথা জনস্বার্থ পরিপন্থী কাজে বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়াব। বিশেষ কারো কথায়, আবেগ দিয়ে পরিচালিত না হয়ে বিবেক দিয়ে পরিচালিত হওয়ার চেষ্টা করব। বিদেশিদের কখনোই প্রভু ভাবব না, মানব না; তাদের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ জানাব না। ভুলে যাব না সবার উপরে দেশ!

 

সংসদ সদস্য

আমি শপথ করছি যে, এলাকার মানুষ যে সংসদ সদস্যের প্রতিপক্ষ নয়, তা প্রমাণ করতে ভূমিকা রাখব। সাধারণ মানুষজনই আমাদের ভোট দিয়ে মহান জাতীয় সংসদে পাঠিয়েছেন। ঘাট পার হলে মাঝিকে শালা ভাবার মতো অবিবেচকের কাজ অন্তত করতে পারি না। আমরাই আইন বানাই, দেশ কীভাবে চলবে না চলবে, সেটার দিকনির্দেশনা দিই। উল্টো আমরাই যদি বেঠিক কাজ করি, তা অবশ্যই গর্হিত অপরাধ। প্রতি সপ্তাহে না পারি, প্রতি মাসে অন্তত একবার, একদিনের জন্য হলেও এলাকায় যাব। সাধারণ মানুষের চাওয়া, অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শুনব এবং সে অনুযায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থা করব। বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মীদের পেছনে আমার লালিত ক্যাডারদের লেলিয়ে দেব না। বরং তাদেরও মুক্ত করে দিয়ে বলব, এমপির চামচামি করা কোনো সম্মানজনক কাজ নয়। তোমরা ভালো চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য খুঁজে নাও। বাবা-মাসহ সাধারণ মানুষের যাতনার কারণ হয়ো না।

 

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শব্দটার সঙ্গে গম, ত্রাণসামগ্রী-জাতীয় শব্দ এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে যে মাথা ঠান্ডা করে ভাবলে লজ্জা পেতে হয়। বিশেষ করে গম শব্দটা তো ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। অনেকেই বলে, ‘ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান? তার মানে গম চোর, টিন চোর!’ এ লজ্জাজনক অবস্থা থেকে পরিত্রাণের পথ খোঁজা জরুরি। আমি শপথ করছি যে, সেই শপথটাই করব—যে শপথ পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব। এলাকাবাসীর জন্য কাজ করতে গিয়ে কে আমাকে ভোট দেয়নি কিন্তু নির্বাচনের আগে চা-বিস্কুট ঠিকই খেয়েছে, এখন তাদের সুবিধাবঞ্চিত রেখে সাইজ করব—এ রকম ছোটলোকি চিন্তাভাবনা পরিহার করব। ইউনিয়নের সর্বস্তরে জনগণকে প্রয়োজন অনুযায়ী চারিত্রিক সার্টিফিকেট দেব, সেই সঙ্গে নিজের চরিত্রটাকেও ক্লিয়ার অ্যান্ড ক্লিন রাখব।

 

ছাত্র

আমি শপথ করছি যে, সংস্কৃত ভাষায় যে একটা কঠিন বাক্য আছে, যেটা বাংলা বলে প্রায়ই ভ্রম হয়, সেই বাক্যটা যথাযথভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করব। ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ—এ বাক্যের নির্যাস মাথায় নিয়ে অগ্রসর হবো। প্রতিটি ছাত্রের উচিত কাজকর্মে, চলনে-বলনে তার ছাত্র পরিচয়টাকে প্রতিষ্ঠা করা। অথচ আমরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, দেখে কেউ কিছু বুঝতেই পারে না—শপিংমল থেকে এলাম নাকি বন্ধুর বাসায় বেড়াতে যাচ্ছি। কারণ একটাই, ছাত্রসুলভ আচরণ ও পরিচ্ছদের অভাব। বই-খাতা-কলম বহনে আমাদের বিস্তর আপত্তি। কেন এমনটা হবে? একজন ছাত্রের প্রথম পরিচয়, সঙ্গে সব সময়ই বই-খাতা-কলম থাকবে। নইলে তার ছাত্র পরিচয় কীসে? সুতরাং অকারণে আধুনিক সাজার চেষ্টা আর করব না। প্রেম করব ঠিকই, কিন্তু প্রেমকে কখনোই পড়াশোনার ওপরে স্থান দেব না। উল্টাপাল্টা রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কোনো ফায়দা লোটার চেষ্টা করব না।

 

প্রেমিক

আমি শপথ করছি যে, আমি প্রেমিক—এ পরিচয় মাথার ওপর তুলে রাখব। প্রেমের নামে কোনো নষ্টামি, ভন্ডামি করব না। একসঙ্গে একাধিক প্রেম করে নিজেকে চৌকস প্রেমিক ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করব না। আমি তো জানিই, একসঙ্গে একাধিক প্রেম নৈতিকতা পরিপন্থী। তাহলে কেন নিজেকে নীতিহীন মানুষ হিসেবে প্রমাণ করব? সবচেয়ে বড় কথা, সংখ্যা বেশি হলে সেটাকে কখনোই প্রেম হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে না, সেটা অবশ্যই ভ্রষ্ট আচরণ। এসব তো করবে ভ্রষ্ট মানুষ। অন্যদিকে প্রেমিক মানে পবিত্রতম মানুষ। সুতরাং আমি নিজেকে বড়ো একটা আসন থেকে পূতিগন্ধময় স্থানে নিক্ষেপ করব কেন! মানুষ হিসেবে আমার উচিত আরো উচ্চাসনে নিজেকে আসীন করা। সেটাই আমি করব (অবশ্য প্রেম হওয়ার পর)!

 

প্রেমিকা

ডিজিটাল প্রজন্ম বলে একটা কথা আছে। সেটা বর্তমান সময়ে প্রেমপিয়াসী তরুণ-তরুণীদের কাণ্ডকারখানা থেকে চাউর হয়েছে। প্রেমের মতো পবিত্র অনুভূতির কী অপব্যবহার! আজকাল নাকি মিসডকলেও প্রেম হয়ে যায়। ফেসবুক মেসেঞ্জারেও। তাজ্জব ব্যাপার না! ভাগ্য ভালো, এ যুগে লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ, চণ্ডিদাস-রজকিনী জন্মান নাই। তাহলে তারা লজ্জা পেতেন। অভিশাপও কি দিতেন না? সবদিক চিন্তাভাবনা করে আমি শপথ করছি যে, একসঙ্গে একাধিক ছেলের নাকে দড়ি বেঁধে ঘোরাব না। নিজের রসনাকে সংযত রাখব। ফেসবুকে চ্যাট-ফ্যাট, মোবাইল প্রেমের মতো বায়বীয় জিনিস থেকে আশপাশের সবাইকে রক্ষা করার চেষ্টা করব। প্রেম করব একজনের সঙ্গে কিন্তু বিয়ের জন্য ঠিক করে রাখব আরেকজন—এমন সুবিধাবাদী মানসিকতা অবশ্যই পরিত্যাগ করব। অন্যরা জানুক বা না জানুক, আমি জানি, মানুষের মন ভাঙার চেয়ে বড় পাপ আর নেই।

 

বউ

আমি শপথ করছি যে, নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সুচারুরূপে পালনের চেষ্টা করব। যেকোনো পরিবারে বউ অন্যতম স্তম্ভ। বউ তার যথার্থ দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হলে স্তম্ভটা নড়ে যায়। স্তম্ভ নড়ে যাওয়া মানে ঘরের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যাওয়া, ভাঙন ধরা। কিন্তু পরিবারের সুখ-শান্তি বহাল রাখতে ঘরের অবস্থা কিছুতেই নড়বড়ে হতে দেওয়া যায় না। পরিবারের প্রতিটি জিনিসই বউয়ের নখদর্পণে থাকা লাগে। নুন থেকে চুন, ঘরের চালে কোন কোম্পানির টিন লাগানো হয়েছে, তা জানা থেকে শুরু করে পুরোনো বাতিল কাপড়ের বর্তমান বসত কোথায় তাও জানতে হয়। সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে—কথাটা কেউ এমনি এমনি বলে যায়নি—বিলক্ষণ মানি। শুধু বরকে নিয়েই ব্যস্ত থাকব না, শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ, আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখব। ঘরে আগুন জ্বালাব না, সেই আগুন জ্বলবে হেঁশেলে—সকাল-সন্ধ্যায়!

 

শাশুড়ি

সাপে-নেউলে সম্পর্ক বলে একটা বাগধারা আছে। এ বাগধারা পারস্পরিক শত্রুতা বোঝাতে সব সময় নেতিবাচক অর্থে ব্যবহূত হয়। বাংলাদেশের বউ-শাশুড়ির সম্পর্কও অনেকটা তা-ই। দুই-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে কোনো শাশুড়িই বউকে মেয়ের আসনে বসাতে পারেন না, মেয়েসুলভ স্নেহ করতে পারেন না। কেন, ফাটলটা কোথায়? এর পেছনে কাজ করছে অর্থনৈতিক, পারিবারিক এবং নিজের অজান্তেই বয়ে বেড়ানো অহমিকার চোটপাট। যা বংশ পরম্পরায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমি শপথ করছি যে, আমি শুধু শাশুড়িই হবো না, মাও হবো। পুত্রবধূর মা। সে তার মাকে ফেলে আমার সংসারে এসেছে। আমার সংসারের উন্নতিকল্পেই কাজ করছে। সুতরাং আমার মোটেও উচিত হবে না, তাকে মায়ের অভাব অনুভব করতে দেওয়া। বলাবাহুল্য, শাশুড়িরা বউদের যে ধরনের যন্ত্রণা দেন, তা আমি মোটেও দেব না। কোনো মা কি পারে, সন্তানকে কষ্ট দিতে!

 

জ্যোতিষী

অন্যের ভাগ্য ঠিকই গুণে দিই কিন্তু নিজের ভাগ্যের খবর নেই। নিজের ভাগ্যই যদি নিজে না জানি, না বলতে পারি তাহলে কীভাবে আমি অন্যের ভাগ্য নিয়ে কথা বলব? তাদের ভাগ্য ভালো বলে খুশি করে দেওয়া, খারাপ বলে বেজার করে দেওয়া কি কোনো বিবেকবান মানুষের লক্ষণ? সবচেয়ে বড় সত্য কথা হলো, মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই গড়েই নেয়। যেমনটি নিয়েছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। জ্যোতিষী তার হাতে ভাগ্যরেখা খুঁজে না পাওয়ায় তলোয়ার দিয়ে নিজের হাতে রেখা এঁকে বলেছিলেন, আমিই আমার ভাগ্যনিয়ন্তা। আসলে প্রতিটি মানুষেই তা-ই। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। সুতরাং আমি শপথ করছি যে, ময়না, টিয়া পাখি বা মূল্যবান রত্নপাথর ব্যবহারে ভাগ্য বদলানোর লোভ দেখিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করব না। কোনো কাগজে কারো ভাগ্য লেখা থাকতে পারে না, এবং কোনো পাথর পারে না কারো দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যে পরিণত করতে। যদি পারত, তাহলে আমাকে জ্যোতিষীগিরি করে খেতে হতো না!

 

ঘটক পশু ভাই

বিয়ে অবশ্যই পবিত্র একটা বন্ধন। এই পবিত্র বন্ধন নিয়ে অনেকেই ব্যবসা করে, আমিও করি। কিন্তু ব্যবসাটা যদি সত্যিকারের হয়, তাহলে ঠিক আছে, কিন্তু যদি আমার মতো টাল্টিবাল্টি কিসিমের হয়! তখন তো মনে হয় ঠিক হওয়ার কথা না। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন, খোঁড়া ছেলেকে কমলপদ্ম উপাধি দেওয়ার কাজটা একমাত্র আমরাই পারি। শূন্যকে পূর্ণ, অসুন্দরকে সুন্দর ‘বানানোর’ কারিশমা আমাদের চেয়ে আর ভালো কারোই জানা নেই। আমি শপথ করছি যে ঘটকালি করব, তা অবশ্যই সততার সঙ্গে। দুইটি পরিবারের আজীবনের সম্পর্কে বিষকাঁটা ঢুকিয়ে দেব না। আমার সামান্য কিছু টাকা রোজগারের জন্য মানুষের সঙ্গে প্রতারণার আশ্রয় নেব না। সবচেয়ে বড় যে কথা, আমারও তো ছেলেমেয়ে আছে, আত্মীয়স্বজন আছে; আমি কি চাই তারা ভুল জায়গায় সম্পর্কে জড়াক, যেটা তারা আগে থেকে দেখেনি, শোনেনি!

 

ঠাট্টা সম্পাদক

আমি শপথ করছি যে, পাঠক ও প্রদায়কদের সঙ্গে সব রকম ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। কদুর তেল দিই বা না দিই সব সময় আমার মাথা থাকবে ঠান্ডা। পাঠককে ‘লেখা পাঠান, ছাপা হবে’—আশ্বাস দিয়ে ঘুম নষ্ট করব না। তাদের সময় এবং টাকার শ্রাদ্ধ করা থেকে বিরত থাকব। প্রদায়কদের কারণে অকারণে ধমক মারব না। ‘ওই মিয়া, কী লিখেছেন এটা তো কিছুই হয়নি’জাতীয় হুমকি দেব না। আমি জানি, সবাই সাধ্যমতো ভালো লেখাটাই দেওয়ার চেষ্টা করে। এবার সে যদি ব্যর্থ হয় তার মেধার দোষ, সে সম্পূর্ণ নির্দোষ! সুতরাং একজনের অপরাধে আরেকজনের ওপর চড়াও হবো না! প্রদায়কদের লেখা দীর্ঘদিন ফাইল, ফোল্ডারবন্দী করে রাখার অপচেষ্টা করব না। মাঝেমধ্যে তাদের অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়ে চা-পানি খাওয়াব। পাঠক-লেখকদের ছবি ছাপিয়ে দিয়ে তাদের সামাজিক স্ট্যাটাস বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখব!