আটকে পড়ার গল্প

 

/ আরাফাত শাহীন

 

মানুষ আটকে পড়ে ঘরের ভেতর, আর আমি আটকা পড়ে বসে আছি ঘরের বাইরে। বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা!

সকালবেলা প্রাকৃতিক কার্য সমাধা করতে ছোটঘরে গিয়েছিলাম। রুমে আস্ত একজন রুমমেট রেখে ওখানে কেউ চাবি নিয়ে যায় না। আমিও চাবি না নিয়েই গিয়েছিলাম। বেশ আয়েশের সঙ্গে কর্মসম্পাদন করে রুমের সামনে এসে যখন দাঁড়ালাম, তখন তো মাথায় ঠাডা পড়ার মতো অবস্থা। রুমে তালা সাটানো। এখন ঢুকব কীভাবে! আমার তো মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। অন্য সময় হলে এতটা ব্যস্ত হতাম না কিছুতেই। কিছুক্ষণ পরেই একটা বিয়ের দাওয়াত খেতে যেতে হবে। রুমমেট যদি চাবি নিয়ে কোথাও চলে যায় তাহলে তো সমস্ত পরিকল্পনা মাঠে মারা যাবে।

এই ব্যাচেলর জীবনে সচরাচর বিয়ের দাওয়াত আসে না; কালেভদ্রে যা আসে তাকে শেয়ালের মুরগি ধরার মতো করে ধরে নিয়ে হয়। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ফোন দিয়ে খোঁজ নিতে হবে। আমার এই সিদ্ধান্ত ধোপে টিকল না এক মুহূর্তও। কারণ ওখানে তো আমি মোবাইল নিয়েও যাইনি! আহা কী বিপদেই না পড়া গেল!

কয়েকজনের রুমের কাছে গিয়ে শুধালাম, ‘ইমরানের মোবাইলে একটা কল দেওয়া যাবে?’

তারা আমার মুখের দিকে এমনভাবে তাকালো, যেন আমি লেজওয়ালা কোনো আজব প্রাণী। পাশের রুমের শরীফের কাছে গিয়ে যখন বললাম, ‘ইমরানের নাম্বারে একটা কল দাও তো!’

সে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘নাম্বার দিন কল দিয়ে দিচ্ছি।’

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। মোবাইল ঘরে। নম্বর তো আমার মুখস্থও নেই। মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় হলো। এদিকে বিয়ের সময়েরও খুব বেশি দেরি নেই। দাওয়াতটা কি শেষপর্যন্ত হাত ফসকে বেরিয়েই যাবে!

এতক্ষণ কেউ বুঝতে পারেনি আমি কেন এত উতলা হয়ে উঠেছি। আমার লম্ফঝম্প দেখে ঠিক সোজাসুজি রুমের হামিদ এসে বলল, ‘ঘটনা কী ভাই, গোপাল ভাড়ের মতো এমন লাফাচ্ছেন কেন?’

প্রশ্ন শুনে আমার রাগ হলো বেজায়। কিন্তু এখানে রাগ দেখিয়ে লাভ নেই। গলা বেশ চড়া ছিল আগে থেকেই। সেভাবেই বললাম, ‘ইমরান তালা লাগিয়ে চাবি নিয়ে চলে গেছে। এখন রুমে ঢুকব কীভাবে?’

‘আপনার রুমে না ঢুকলে ক্ষতির কী আছে। আমার রুমে এসে বসেন। দরকার হলে ঘুমিয়ে থাকেন। এভাবে চেঁচামেচির কী আছে?’

ইমরানের ওপর যে রাগ ছিল সেটা হামিদের ওপর ঝেড়ে দিতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু চেপে গেলাম। ধরা গলায় বললাম, ‘দেখো ভাই, একটু পর আমাকে একটা বিয়ের দাওয়াতে যেতে হবে। রুমে না ঢুকতে পারলে যাব কীভাবে?’

আমাদের চিত্কার-চেঁচামেচি শুনে সদ্য ঘুম থেকে জেগে ওঠা জাহিদ ভাই চোখ ডলতে ডলতে এসে বললেন, ‘এত চেঁচামেচি কিসের? মাছের হাট বসেছে নাকি?’

‘না ভাই, হাট বসেনি ঠিকই তবে গেদু ভাই একটা বিপদে পড়েছেন।’ হামিদ জবাব দিল।

‘কী বিপদ? আমার কাছে একবার বলে দ্যাখ শুধু; এখনই সমাধান করে দিচ্ছি।’ লুঙ্গির গিঁট শক্ত করে বাঁধতে বাঁধতে হুংকার ছেড়ে বললেন জাহিদ ভাই।

আমি মিনমিনে গলায় বললাম, ‘ইমরান রুমে তালা দিয়ে চাবি নিয়ে কোথায় চলে গেছে। এখন একটা বিয়ের দাওয়াতে যেতে হবে। রুমে ঢোকার উপায় নেই।’

জাহিদ ভাই আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলেন বেশ কায়দা করে। আমার পরনে তখন একটা অধিক মাত্রায় পুরনো লুঙ্গি এবং চাপ সহ্য করতে না পেরে ছিঁড়ে যাওয়া স্যান্ডু গেঞ্জি। ভাই বললেন, ‘পরনে যা আছে সেটা একেবারে খারাপ নয়। বিয়েবাড়ি যাবার উত্তম পোশাকই বটে। এটা পরেই চলে যা। তোরও একটা হিল্লে হয়ে যেতে পারে।’

ভাই বিকট শব্দে নতুন গজিয়ে ওঠা ভুঁড়ি দুলিয়ে হাসতে লাগলেন। তার দেখাদেখি ছোট বিচ্ছুগুলোও হো-হো করে উঠল।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়