মৃদুল সাহেব মহল্লায় বড় ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে মানবসেবায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। জনে জনে, কানে কানে পৌঁছে দিয়েছেন তার মহামূল্যবান বাণী, ‘যে কদিন বেঁচে থাকব, মানুষের সেবা করে যাব।’ তিনি মূলত সিজিনাল সেবা প্রদান করে থাকেন। শীতকালে শীতার্ত মানুষের সেবা। বর্ষাকালে বন্যার্তদের সেবা। এই দুই প্রকার সেবা ছাড়া বাকিটা বছর তিনি ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়ান।
‘কী করেন’ বললে তিনি ক্লাবের চেয়ারম্যান হিসাবেই নিজের পরিচয় দেন। এ ছাড়া আর বিশেষ কোনো পরিচয় তার নেই। যেকোনো চেয়ারম্যানের চেয়ে মৃদুল সাহেব নিজেকে খাটো করে দেখতে রাজি নন। শীত শুরু হতেই দলবল নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছেন টাকা সংগ্রহের কাজে। লক্কড়ঝক্কড় ট্রেনের মতো হুড়মুড় করে ছুটে আসা ফাহাদ হোসেনের পথ আটকান। ফাহাদ হোসেন শহরে মেয়ের বাড়ি বেড়াতে এসেছেন। ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে তিনি প্রতিদিন প্রাতঃভ্রমণে বের হন। শহরে এসে প্রাতঃভ্রমণ তার কাছে পর্বতারোহণের চেয়ে কষ্টকর মনে হচ্ছে। রাস্তায় পানি। প্রথমে ভেবেছিলেন কুয়াশার পানি। পানি ভেঙে তরতর করে হেঁটে যান। একটু পরেই নাকে গন্ধ আসে। বিশ্রী কটু গন্ধে দমবন্ধ হওয়ার অবস্থা। এদিক-ওদিক ময়লা আবর্জনার ভাগাড়। ভাঙ্গাচোরা ড্রেন উপচে নোংরা পানি রাস্তা ভাসিয়ে দিচ্ছে! ফাহাদ হোসেন সে পানিতে হাঁটু পর্যন্ত কাপড় ভিজিয়ে হাঁটছেন। মেজাজ খারাপ হলেও তাকে হাঁটতে হচ্ছে। একঝাঁক মানুষের বাধা পেয়ে দাঁড়িয়ে যান, ‘কী চাই?’
মৃদুল সাহেব এগিয়ে এসে বলেন, ‘আপনি তো মহল্লার লোক না। মহল্লার লোক হলে আমাকে চিনতেন।’
এমনিতেই মেজাজ খারাপ, তার ওপর দাম্ভিক টাইপের কথা শুনে আরও মেজাজ খারাপ হলো, ‘আপনাকে চিনতে হবে কেন?’
মৃদুল সাহেব মুচকি হেসে বলেন, ‘আপনার মতো মানুষের আমাকে না চিনলেও হবে। গা দিয়ে কটু গন্ধ আসতেছে। হাঁটতে গিয়ে পিশাব, পায়খানা করা লোক থেকে দূরে থাকাই ভালো। যাক, শীতার্ত মানুষের জন্য কিছু দেন? তারপর চলে যান।’
শীতার্ত অসহায় মানুষের কথা শুনে ফাহাদ হোসেনের চোখে ভাসে কিছু অসহায় মানুষের মুখচ্ছবি। ভালো কাজ, তবে মানুষগুলোকে খুব একটা ভালো মনে হয় না। পাঁচশ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দেন। টাকা নিতে নিতে মৃদুল সাহেব মৃদুস্বরে বলেন, ‘যে কদিন বেঁচে থাকি, মানুষের সেবা করে যাব।’
ফাহাদ হোসেন আবার হাঁটা শুরু করেন। হাঁটতে হাঁটতে দেখেন ফার্নিচারের দোকানে বস্তা বস্তা কী ঢোকানো হচ্ছে। ফার্নিচারের দোকানে ঢুকবে কাঠ, সাত সকালে বস্তা ঢোকার মানে কী! একজনকে প্রশ্ন করেন, ‘বস্তায় কী!’
—শীতার্ত মানুষের চাল।
—শীতার্ত মানুষের গরম কাপড় দরকার। চাল কেন?
সম্ভব হলে লোকটা মাথায় থাকা চালের বস্তা ফাহাদ হোসেনের গায়ের ওপর ছুড়ে ফেলত এমন ভাব নিয়ে লাল চোখে তাকিয়ে বলল, ‘ইডা চেয়ারম্যান সাহেবেরে জিগান।’
—শহরে চেয়ারম্যান হবে কেন! হবে কাউন্সিলর, মেয়র।
লোকটা চিত্কার করে বলল, ‘ও বরকত ভাই, সাত সকালে আস্ত পাগল আইছে। ক্লাবের চেয়ারম্যান সাহেবেরে চিনে না।’
বয়োবৃদ্ধ একজন মানুষ বরকত। ফাহাদ হোসেনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘স্যারের শরীলডা ভালো?’
—শরীর ভালো কিন্তু বুঝতে পারছি না ফার্নিচারের দোকানে চালের বস্তা ঢোকার কারণ কী!
—চেয়ারম্যান সাবের সিজনাল ব্যবসা। ঘরবাড়ি, গুদাম, দোকান সব ভইরা গেলে ফার্নিচারের দোকানে চাউল আসে। চাউল তো বাবা সেফটিক ট্যাঙ্কির মধ্যি রাখা যায় না। আপনি কী বাবা ওইখান থেইকা ডুব মাইরা আইছেন? বিশ্রী গন্ধ আইতেছে।
ফাহাদ হোসেন কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। একটু আগে একজন বলল, শীতার্ত মানুষের চাল। আরেকজন বলছে, সিজিনাল ব্যবসা। প্রশ্ন করেন, ‘কী চাউল?’
—এক নাম্বার মিনিকেট। একেবারে চকচকা।
—আজকাল সবকিছুর ভেতর বাটপারি ঢুকেছে। মেশিনে মোটা চাউলের উপরের আস্তরণ ছেটে ফেলে মিনিকেট বলে বিক্রি হচ্ছে। অথচ চালের পুষ্টির মূল উত্সই উপরের আস্তরণ। উপরের আস্তরণে কার্বোহাইড্রেড থাকে। যা মানব দেহে ক্যানসার প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।
চাল বহন করা লোকটা খেঁকিয়ে ওঠে, ‘ক্যানসার হইলে আফনে ঠেকাইতে পারবেন! কত কিছুতেই শুনি ক্যানসার হয়। এই যে বরকত মিয়া সত্তর বছর বয়স এখনো কুতকুত করে বিড়ি টানে, কই তার ক্যানসার কী পালায় রইছে? এখনো ধরে না ক্যান! এতদিনে তো ঠাইশা মাইরা ফালাইবার কথা।’
বরকত মিয়া খুক খুক করে কাশি দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান, ‘এই যে মুখখান সামলাইয়া কথা কও। এমনিতেই ব্যারামের শেষ নাই। তুমি কী চাচ্ছ আমার ক্যানসার হোক, মইরা যাই। এই ব্যাটা আমি কী তোরডা খাই?’
ঝগড়ার ভেতর ফাহাদ হোসেন ৯৯৯ কল দিয়ে ঘটনা খুলে বলেন। শেষমেশ কী হয় দেখেই যাবেন।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আগেই মৃদুল সাহেব হাজির। ফাহাদ হোসেনকে দেখেই শীতকালীন শীত দূরে ঠেলে গরম মেজাজে বলেন, ‘এখানে আপনার কী?’
—কৌতূহল।
—শহরে অনেক সিনেমা হল আছে সেখানে গিয়ে কৌতূহল মেটান। ভাগেন...
মৃদুল সাহেবের কথা শেষ না হতেই দোকানের সামনে পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ায়। লাফঝাঁপ দিয়ে কয়েকজন নেমে এসে মৃদুল সাহেবর হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেন।
একজন অফিসার বলেন, ‘দুস্থদের টাকায় কেনা চাল ফার্নিচারের দোকানে। ব্যবসা?’
মৃদুল সাহেব কাঁচুমাচু গলায় বলেন, ‘স্যার, এখানে চাউলে পালিশ করা হয়। ফার্নিচার ও চাউল পাওয়া যায়। আমার কী দোষ?’