গতিশীলতা এসেছে বাগদি সম্প্রদায়ের

আসিফ হাসান রাজু

সরকারি হিসাব অনুযায়ী এদেশে মোট ৪৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এ সংখ্যা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। দেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে বাগদি সম্প্রদায় উল্লেখযোগ্য। দেশের বিভিন্ন জেলায় বাগদি সম্প্রদায়ের বসবাস। বাগদি সম্প্রদায়ের ওপর করা এক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রায় দুই লাক্ষ বাগদি সম্প্রদায় রয়েছে। পূর্বে এরা মসত্যজীবী ছিল বলে অনেক গবেষণা থেকে জানা যায়। ফলে এদের মাছুয়া নামেও ডাকা হতো বলে জানা যায়। তবে সাম্প্রতিক রাজশাহী নৃবিজ্ঞান বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাগদি সম্প্রদায় তাদের আদি পেশা থেকে সরে এসেছে এবং তারা বর্তমান সময়ে ভিন্ন ভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। আর পেশা পরিবর্তনের ফলে তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক দিকে এসেছে নানা পরিবর্তন। কেননা, মানুষের পেশাগত কাঠামোর পরিবর্তন হলো শ্রেণিগত অবস্থানের পরিবর্তন, যা ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হাটখোলায় বসবাসরত বাগদি সম্প্রদায়ের ওপর পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে। তাদের গতিশীলতার পেছনের মূল কারণ হিসেবে গবেষণাটিতে দেখানো হয়েছে আদি পেশার পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ততা ও গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর। বর্তমান সময়ে তারা মাছ ধরার পাশাপাশি কচ্ছপ শিকার করা, ঝিনুক কুড়ানো, খড়ি ফাড়া, ভ্যান-রিকশা চালানো, সেলুনের কাজ, দিনমজুরি, ছাদ পেটানো, আটো রিকশাচালক, হোটেলে কাজ, ছোটো পরিসরে ব্যবসা প্রভৃতি কাজ করেন। এর মাধ্যমে তাদের মধ্যে যেমন পরিবর্তন এসেছে চিন্তাধারায়, তেমনি গুরুত্ব বেড়েছে নারী-পুরুষ উভয়ের। এ সমাজে শুধু পুরুষরাই অর্থনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং নারীরাও বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ফলে গবেষণায় উঠে এসেছে এখন পারিবারিক কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। গবেষণাটি পরিচালনার ক্ষেত্রে বাগদি সম্প্রদায়ের পেশা পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছিল। তাদের পেশা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কারণ সম্পর্কে জানা গিয়েছে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে। তাদের দেওয়া তথ্যানুসারে পেশা পরিবর্তনের পেছনে পূর্বের ন্যায় খালে-বিলে পানি না থাকা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বহুমুখী পেশায় কাজের সুযোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি, কাজ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য হ্রাস, তাছাড়া আগের তুলনায় বন-জঙ্গল কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণ উঠে এসেছে। পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে তাদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। পূর্বে অনেক সময় না খেয়ে দিন পার করলেও এখন তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা হয়, পাশাপাশি নারীরা পুরুষের ন্যায় বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, ফলে তাদের মাঝে সঞ্চয়ের ধারণা এসেছে। পুরুষের তুলনায় নারীরাও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে বলেও উঠে এসেছে গবেষণাটিতে। তবে তাদের দাবি তারা এখনো অনেক ধরনের বৈষ্যমের শিকার। সরকারি সুযোগ-সুবিধা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সম-অধিকার ইত্যাদি ব্যাপারে এখনো মূলধারার জনগোষ্ঠীর ন্যায় সুযোগ তারা পাচ্ছে না।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়