রিয়াদ খন্দকার ও দীপককুমার কর
প্রবাদ আছে, ‘বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম।’ চলনবিল, যার নাম শুনলেই একসময় ভয়ে গা শিউরে উঠত। থই থই জলে উথালপাথাল ঢেউয়ের মাঝে বাতাসের প্রবল গর্জনে ঘুম ভাঙত উত্তর জনপদের বিল পাড়ের বাসিন্দাদের। কিন্তু এখন আর চলনের সেই প্রভাব-প্রতিপত্তি নেই। কারণ প্রতি বছর লাখ লাখ ঘনমিটার পলি পড়ে চলনে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও নানা প্রতিকূল পরিবেশের কারণে পানিশূন্য হয়ে হ্রাস পাচ্ছে এর আয়তন। বিলের বুক ভেদ করে রেললাইন ও মহাসড়ক নির্মাণ করাসহ অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, কালভার্ট, স্লুইসগেট, ক্রসবাঁধ ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে অস্তিত্ব হারাচ্ছে চলনবিল। সম্প্রতি চলনবিল দেখতে গেলে এমন করুণ চিত্রই চোখে পড়ে।
‘চলন্ত বিল’ থেকে ‘চলনবিল’ নামের উত্পত্তি। মত্স্য, শস্য ও প্রাকৃতিক রত্নভান্ডার হিসেবে খ্যাত, হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর, অপরূপ প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিত সুবিশাল জলাশয় চলনবিল। এর ভেতরে ছিল ৪ হাজার ৭৮৬ হেক্টর আয়তনবিশিষ্ট ছোটো-বড়ো ৩২টি নদী এবং ৩৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ২২টি খাল। নদীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— বড়াল, গুড়, গোহালা, করতোয়া, ভদ্রাবতী, বিলসূর্য, কুমারডাঙ্গা, ইছামতি, গুমানী, আত্রাই, নন্দকুজা, বেসানী, গাড়াদহ, কাকন-কানেশ্বরী, সরস্বতী, মুক্তাহার, ঝবঝবিয়া, নাগর, বানগঙ্গা, ভাদাই, গদাই, মুক্তাহার, শালিকা, কাটাগাঙ, তুলসী, চেচুয়া, খুবজিপুর, বারণী, ফুলজোড়, শুঁটকিদহ, গাইনগড়, রূপনাই নদী। এ নদীগুলোই ছিল চলনবিলের হূত্স্পন্দনের মতো। এসব নদীর ছিল আরো অনেক শাখা-প্রশাখা। এ বিলের ৮টি উপজেলায় রয়েছে ১ হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের মোট ৯৩টি বিল। ফসলি জমির পরিমাণ ১ লাখ ৬৬ হাজার ৫৩৫ হেক্টর (১৯৯০ সালের জরিপ মতে)। বিলগুলো হচ্ছে—সিংড়ায় পাঁচটি, গুরুদাসপুরে তিনটি, চাটমোহরে ২০টি, ভাঙ্গুরায় ১৮টি, ফরিদপুরে দুইটি, শাহজাদপুরে আটটি, উল্লাপাড়ায় ২০টি, রায়গঞ্জে ১৭টি। চলনবিলে রয়েছে ২২টি খাল। খালগুলো হলো—নিমাইচড়া খাল, নিমাইচড়া-বেসানীর খাল, দোবিলা খাল, গাড়াবাড়ি-ছারুখালি খাল, গোহালার খাল, কিশোরখালি খাল, বেহুলারখাড়ি, বাকাইখাড়ি, জানিগাছার জোলা, পানাউল্লার খাল, নেয়ামত খাল, নবীরহাজির জোলা, হক সাহেবের খাল, উলিপুর খাল, কুমারভাঙ্গা খাল, গাড়াবাড়ি খাল, জানিগাছার জোলা, কিনু সরকারের ধর ও সাত্তার সাহেবের খাল, কাটাবাড়ী খাল। খালগুলো ১২ থেকে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ।
সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর ও নওগাঁ জেলার ১০টি উপজেলা নিয়ে চলনবিলের বর্তমান অবস্থান। উপজেলাসমূহ যথাক্রমে—সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুরা, ফরিদপুর, নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়া, বড়াইগ্রাম ও নওগাঁ জেলার আত্রাই। গ্রামের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার, লোকসংখ্যা ৪৮ লাখের বেশি।
‘ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া’ ও ‘চলনবিলের ইতিকথা’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়—অতীতে পদ্মা তীরবর্তী লালপুর থানা ব্যতীত তদানীন্তন নাটোর মহকুমার সমগ্র অংশ চলনবিলময় ছিল। তখন বগুড়ার শেরপুর, নন্দীগ্রাম, পাবনার বেড়া, শাহজাদপুর (অংশ বিশেষ) ও নওগাঁর রাণীনগরসহ উল্লিখিত জেলাসমূহের মোট ১৪টি থানা বা উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী আরো ২০টি উপজেলায় চলনবিলের প্রভাব ছিল। ১৯০৯ সালে পাবলিক ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের জরিপ মতে প্রাচীন চলনবিলের আয়তন ছিল ১ হাজার ৮৫ বর্গকিলোমিটার । খরা মৌসুমে শুকিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৩৬৮ কিলোমিটারে। ১৯৪০ সালে পূর্ববঙ্গ রেলওয়ে প্রচার বিভাগের তথ্যমতে, তখন এর আয়তন ছিল ৪৪১ বর্গমাইল (৭০৫ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটার)। ১৯১৪ সালে চলনবিলের মধ্য দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ হতে পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করা হয়। তখন থেকেই বিলের অপেক্ষাকৃত উঁচু উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে ভাটা পড়ে। এরপর থেকেই চলনবিলের আয়তন সংকীর্ণ হতে শুরু করে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এরপর ২০০৩ সালে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে নাটোরের বনপাড়া পর্যন্ত মহাসড়ক নির্মাণ করার পর পানির প্রবাহে আরো বেশি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে অধিক পরিমাণ পলি জমে দ্রুত ভরাট হচ্ছে বিলের গভীরতা। জরিপে দেখা গেছে—বিলে পানি সরবরাহকারী নদী দ্বারা বছরে প্রায় ছয় দশমিক তিন মিলিয়ন ঘনফুট পলি জমা হয়। আর ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট পলি বিভিন্ন নদী ও ক্যানেল দিয়ে বের হয়ে যায়। অর্থাত্ বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট পলি জমা হয় এই বিলে। এই পলি যদি ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সমভাবে বিছিয়ে দেওয়া হয় তাহলে প্রতি বছর এর উচ্চতা প্রায় ১ দশমিক ২৭ সেন্টিমিটার করে বৃদ্ধি পায়। ১৯৮৭ সালের জরিপে দেখা যায়—শুষ্ক মৌসুমে শুধু কিছু পুকুর আর ক্যানল ছাড়া বাকি অংশ প্রায় পুরোটাই শুকিয়ে যায়। চলনবিলের ভৌগোলিক অবস্থান ক্রমশ সংকুচিত হয়ে এখন ২৪ : ২৩ ডিগ্রি থেকে ২৪ : ৩৫ ডিগ্রি উত্তর এবং ৮৯ : ০৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
n লেখকদ্বয় :সাংবাদিক