এ এক অনিন্দ্য সুন্দর দৃষ্টান্ত!

নুহিয়াতুল ইসলাম লাবিব

 

১৯৭১ সাল, ৩০ লক্ষ শহীদ। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সবুজ, স্নিগ্ধ এই ভূ-স্বর্গের গল্প করতে গেলে এই দুটি তথ্য আপনার ঝুলিতে রাখতেই হবে। তা না হলে গল্পটা ঠিক জমবে না। বাঙালি বীরের জাতি। আর আমাদের এই বীরত্বের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালে। এত এত দামি সব অস্ত্র থাকার পরও পাকহানাদার বাহিনীকে কী নাকানি-চুবানিটাই না খেতে হয়েছিল বাঙালির হাতে। বুকে সাহস, আর দেশের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে তা কখনোই সম্ভব হতো না। মায়ের পা ছুঁয়ে অনেকেই সেসময় শেষবারের মতো ঘর থেকে বেরিয়েছিল। দেশের জন্য দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া কিশোরও হয়ে উঠেছিল খ্যাপাটে যোদ্ধা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এমন অনেক গল্প শুনেছি। টগবগ করা রক্ত নিয়ে অনেকেই বলেছি, ইশ! একাত্তরে যদি আমরা থাকতাম।

৭১-এর মতো সেরকম কিছু তরুণরা এখনও আছে। দেশ এখন স্বাধীন। কিন্তু কাঁধে দায়িত্বটা অনেক। কিভাবে সবুজ এই দেশটাকে আরো সুন্দর করা যায়। যে মাটির জন্য এত রক্ত ঝরলো সেই মাটিকে কিভাবে আরো ভালোবাসা যায়, সেই ভালোবাসা থেকেই এবার বিজয় দিবসে বিডি ক্লিনের সদস্যরা এক অনিন্দ্য সুন্দর উদ্যোগ নেয়। যা অবাক করেছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে। 

শুরুটা ১০ নভেম্বর থেকে।  একদল তরুণ, যারা দেশকে ভীষণভাবে ভালোবাসে যুগান্তকারী এক পদক্ষেপ নিয়ে বসে। ছোট্ট সুন্দর এই বাংলাদেশকে আরো সুন্দর করার প্রয়াসে  প্লাস্টিকের বোতল কুড়ানো শুরু করলো। লক্ষ্য ৩০ লক্ষ  প্লাস্টিক সংগ্রহ করা। কাজ চলে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কখনো রাস্তা, কখনো বা জলাশয়, কখনো কখনো কাঁদামাটিতে প্রায় ডুবন্ত, আবার কখনো ড্রেন থেকে পরিত্যক্ত বোতল সংগ্রহ করেছে বিডি ক্লিনের এই সদস্যরা। মূল উদ্দেশ্য একটাই—যে দেশের মাটিতে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত মিশ্রিত, সেই মাটিকে যে করেই হোক পরিচ্ছন্ন রাখা!

বাংলাদেশ তথা বিশ্বের সকল দেশের নাগরিকদের মধ্যে প্লাস্টিক ব্যবহারের পর যত্রতত্র ফেলে দেওয়ার এক ধরনের প্রবণতা আছে। তাই ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সকল নাগরিককে সচেতন করতেই বিডি ক্লিনের সদস্যদের এমন প্রদর্শনীর আয়োজন। তাছাড়া আমরা সবাই কমবেশি ভাবি যে, আমি একটি প্লাস্টিকের বোতল ছুঁড়ে ফেললে পরিবেশের কী আর এমন ক্ষতি হবে? এমন ভাবনা থেকে প্রত্যেকেই যদি একটি করে বোতল ফেলি তাহলে কী পরিমাণ প্লাস্টিক বোতল মাটি বা জলাশয়ে জমে পরিবেশের ক্ষতি করবে তা একবার ভাবুন। শুধু বাংলাদেশের কথাই ধরুন, একদিনে ১৮ কোটি প্লাস্টিকের বোতল! আর সংখ্যাটা যদি একের বেশি হয়, তবে? তাই প্লাস্টিকের বোতলগুলো যত্রতত্র ছুঁড়ে না ফেলে বিভিন্ন উপায়ে পূনরায় ব্যবহারে উত্সাহিত করতেই এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। যে সকল কোম্পানি প্লাস্টিক বোতলজাত পানীয় ও খাদ্য উত্পাদন করে তা বাজারজাত করে যাচ্ছে তাদের সেই খালি প্লাস্টিকের বোতলগুলো সংগ্রহ করে তার সঠিক বিহীত করতে পদক্ষেপ গ্রহণে উপলব্ধি জাগ্রত করতেও এই উদ্যোগের সৃষ্টি।

প্লাস্টিকের বহু সুবিধা থাকলেও সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো—এটি বায়োডিগ্রেডেবল নয়, অর্থাত্ প্রকৃতিতে মিশে যায় না। পৃথিবীতে প্রথম তৈরি প্লাস্টিকটিও আজ অবধি ধ্বংস হয়নি।  ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সমীক্ষা অনুযায়ী, এ ভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সালে সমুদ্রে মাছের থেকে প্লাস্টিক বেশি হবে। আর এই বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিকের বিষময় ফল আমাদেরই পেতে হবে।

প্লাস্টিক হলো বেশকিছু যৌগের পলিমার রূপ। এই যৌগগুলো মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া তৈরি করে। প্লাস্টিকের বোতল বা ডায়াপারে বহুল ব্যবহূত বিসফেনল ‘এ’ থ্যালেট প্রজননতন্ত্রের ক্ষতি করে। এছাড়াও এর রাসায়নিকগুলো দেহের হরমোনের কাজে ব্যাঘাত ঘটায় ।

বাংলাদেশে এর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী ঢাকাবাসী। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা গেছে, প্রতিদিন কেবল ঢাকা শহরে উত্পাদিত প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টন বর্জ্যের মধ্যে ৩০ শতাংশ অপচনশীল। বোঝাই যাচ্ছে এজন্য চরম মূল্য দিতে হতে পারে এক সময়। তাই দেশের মানুষকে ভালো থাকার জন্য ভালো রাখতে হবে মাটি-জল-জঙ্গলকে। আর এই  চেষ্টা করাটাও সত্যিকারের দেশপ্রেম।