শফিকুল ইসলাম খোকন
‘কোদালে মেঘের মউজ উঠেছে গগনের নীল গাঙে, হাবুডুবু খায় তারা-বুদবুদ, জোছনা সোনায় রাঙে! তৃতীয়া চাঁদের সাম্পানে চড়ি চলিছে আকাশ প্রিয়া, আকাশ-দরিয়া উতলা হল গো পুতলায় বুকে নিয়া।’—কবি কাজী নজরুল ইসলামের সিন্ধু হিন্দোল কাব্যগ্রন্থে চাঁদনী রাতের কবিতায় জোছনা উত্সবের কেমন যেন মিল রয়েছে।
কবির কবিতায় যেন মউজ উঠেছে ত্রিমোহনার রূপালি জলরাশির পাড়ে। বিস্তীর্ণ সৈকতে হৈমন্তী পূর্ণিমা এভাবেই ধরা দিয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের চোখে। শরত্ আর হেমন্ত সমন্বয় বাংলার পথে-প্রান্তরে মেলে মিলনমেলা। আর হেমন্তে এসে শুরু হয় জোছনা উত্সবের মিলন। চাঁদনী রাতে জোছনা উত্সবে না এলে সেটি উপলব্ধি করা যাবে না। তাইতো চাঁদনী রাতে ছুটাছুটিতে যারা মুগ্ধ হন তাদের জন্যই এ জোছনা উত্সব। বরগুনায় দেশের সর্ববৃহত্ জোছনা উত্সব হয়ে গেল ১২ ডিসেম্বর। এর আগে পূর্ব নির্ধারিত দিন ১৩ নভেম্বর থাকলেও ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে তা স্থগিত করে ১২ ডিসেম্বর নির্ধারণ করে বরগুনা জেলা প্রশাসন। পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় বরগুনার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যকে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে এ উত্সবে যোগ করা হয় নানা আয়োজন। এ উত্সবকে ঘিরে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করে বরগুনা জেলা প্রশাসন।
এ বছরও বরগুনার পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদী যেখানে সাগরে মিশেছে, সেখানেই নবগঠিত তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের স্নিগ্ধ বেলাভূমি ‘শুভ সন্ধ্যার’ বিস্তীর্ণ বালুচরে পঞ্চমবারের মতো জোছনা উত্সব অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়া বরগুনা জেলা থেকে নৌপথে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অভয়ারণ্যের দূরত্ব মাত্র ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে রয়েছে নয়নাভিরাম স্নিগ্ধ বনভূমি আশার চর, লালদিয়ার চর, হরিণঘাটার বন, বলেশ্বর নদের বিহঙ্গ দ্বীপ, টেংড়াগিরির বনভূমি এবং শুভ সন্ধ্যার বিচ পয়েন্টসহ অনেক আকর্ষণীয় বন-বনানী ও নদ-নদীর মোহনা। এসব বনাঞ্চলে রয়েছে হরিণ, বানর, শূকরসহ শতেক প্রজাতির প্রাণী বৈচিত্র্য। দেখা যাবে সূর্যাস্ত, পাখির কলরব, আরো কত কী!
জোছনা উত্সবে যত আয়োজন
দীর্ঘ ঝাউবন, তিন তিনটি নদীর বিশাল মোহনা। নদ-নদী আর বন-বনানীর এক অপরূপ সমাহার, শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত! সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এক বিশাল ঝাউবন। দক্ষিণের খোলা বাতাস ঝাউবন স্পর্শ করে যাচ্ছে পরম আবেশে। খোলা বাতাসের ছোঁয়ায় উড়ন্ত চুলের মতো দুলছে ঝাউগাছগুলোর ডালপালা। জন্ম থেকেই সমুদ্রের খোলা বাতাস গায়ে মেখে ঝাউগাছগুলো এখন অনেক বড় হয়ে উঠেছে। সমুদ্রের আঁছড়ে পড়া ঢেউ আর ঝাউগাছের মাঝখানে শূন্য বালুরাশি। দৃষ্টিনন্দন এক সমুদ্র সৈকত! সমুদ্রের ঢেউ, বালুময় দীর্ঘ সৈকত আর ঝাউবনের সবুজ সমীরণের এ দৃশ্যটি প্রকৃতি প্রেমের একটি উদাহরণ। এই প্রেমময় দৃশ্যপটের নাম শুভ সন্ধ্যা। দক্ষিণে তাকালে অথৈ সাগরের ঢেউ আর ঢেউয়ের সঙ্গে দোল খেলা মাছ ধরার ট্রলার ব্যতীত আর কিছুই দেখা যাবে না। প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের পানে তাকিয়ে জোছনা উত্সব অনুষ্ঠিত হয়। হেমন্তের শিশিরে খালি পায়ে হাঁটার স্মৃতি অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন! আর তাই তো এই আয়োজন।
ত্রিমোহনার রূপালি জলরাশির সৈকতে বসে হৈমন্তী পূর্ণিমা দেখে আপনি শিহরিত হবেন। জোছনা পাগল হাজারও মানুষের সঙ্গে গান, কবিতা, পুঁথি, পুতুল নাচ, জাদু প্রদর্শনী, যাত্রাপালা, হয়লা গান, নৃত্য ও ফানুস ওড়ানো হয় উত্সবে। উত্সবস্থলে মোতায়েন করা হয় র্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড, রোভার স্কাউট, বিএনসিসিসহ আনসার ও গ্রাম পুলিশ।
১২ ডিসেম্তর সকাল থেকেই স্থানীয় মানুষের উত্সবস্থলে আগমন শুরু হলেও বিকেল ৩টায় সমুদ্রে দীপাবলি ভাসিয়ে এবং জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী, বরগুনা জেলা প্রশাসক মো.মোস্তাইন বিল্লাহ প্রমুখ।
জোছনা উত্সবের উদ্যোক্তা সোহেল হাফিজ বলেন, ‘শহুরে সভ্যতায় আমরা পেয়েছি অনেক। সেইসঙ্গে হারানোর তালিকাও কম নয়। নাগরিক ব্যস্ততায় আমরা হারিয়েছি শ্রাবণের জলে অঙ্গ ভেজানোর সুযোগ। হারিয়েছি শরতের শিশিরে খালি পায়ে হাঁটার সময়। সেসব হারানো সময়, সুযোগ আর স্মৃতির কথা ভেবেই বরগুনায় শুভসূচনা হয়েছে জোছনা উত্সবের।’
বরগুনা জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘জোছনা উত্সব একটি ব্যতিক্রমী উত্সব। এ উত্সবকে ঘিরে আমাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। বুলবুলের কারণে আমাদের পূর্ব নির্ধারিত তারিখে উত্সব হয়নি, পুনরায় ১২ ডিসেম্বর উত্সবের আয়োজন করা হয়েছে। পঞ্চমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো জোছনা উত্সব। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে প্রতিবছরই হবে জোছনা উত্সব।’