নীতিমালায় মোট ঋণের ৫ শতাংশ সবুজ ঋণের কথা বলা হয়েছে
g রেজাউল হক কৌশিক
গ্রিন ব্যাংকিং বা সবুজ অর্থায়নের বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে সচেতন করতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সচেতনতামূলক কাজ শেষ হয়েছে। ব্যাংকগুলো এখন তা বাস্তবায়ন করছে। তবে এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর পরিকল্পনা অনেক বড়ো হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ব্যাংকিং বিষয়ে ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ঐ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যাংকগুলো মোট ২ লাখ ৩৭ হাজার ৪৬৭ টাকা বিতরণ করেছে। এর মধ্যে গ্রিন ব্যাংকিং খাতে বিতরণ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের মাত্র দশমিক ৯৬ শতাংশ। অথচ ব্যাংকের নীতিমালায় এ খাতে মোট বিতরণ হওয়া ঋণের ৫ শতাংশ বিতরণ করার কথা।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা হলেও সবুজ খাতে বিতরণ হয়েছে মাত্র ২৩ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এ সময়ে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করলেও সবুজ খাতে মাত্র ৯৯৭ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। আর বিদেশি এবং রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত উন্নয়ন ব্যাংকগুলোও এ খাতে অনেক কম ঋণ বিতরণ করেছে। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণ বিতরণ ৪ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা হলেও সবুজ খাতে বিতরণ হয়েছে মাত্র ১০৯ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সবুজ অর্থায়নের জন্য শতাধিক পণ্যের তালিকা থাকলেও এখন পর্যন্ত ছয়-সাতটি পণ্যে ঋণ যাচ্ছে। কৃষিঋণ বিতরণে যেমন বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে সবুজ অর্থায়নে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এখনো তেমন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ব্যাংকগুলোকে এ ঋণ দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে উত্সাহিত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানা গেছে, গ্রিন ব্যাংকিংয়ের আওতায় তিন ধরনের অর্থায়ন করা হয়। যা হলো—গ্রিন ফাইন্যান্স, ক্লাইমেট রিস্ক ফান্ড এবং মার্কেটিং অ্যান্ড ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ফর গ্রিন ব্যাংকিং। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর বিতরণ হওয়া ঋণের একটি অংশ গ্রিন ব্যাংকিংয়ের জন্য বরাদ্দ রাখতে হয়।
গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রমের মধ্যে কাগজের ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যে পুরোপুরি অনলাইন কার্যক্রম শুরু, নিজস্ব শাখায় সোলার প্যানেল প্ল্যান্ট, পরিবেশবান্ধব খাতে বিনিয়োগ ও ভবিষ্যত্ বিনিয়োগ পরিকল্পনায় পরিবেশকে অগ্রাধিকার, পরিবেশ ঝুঁকির রেটিং খাত দেখে বিনিয়োগ, মোবাইল ও এসএমএস ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোর ১০ হাজার ৩৭৯টি শাখার মধ্যে অনলাইন সেবার আওতায় ৯ হাজার ২৯৭টি শাখা এসেছে। সে হিসাবে মোট শাখার ৮৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ গ্রাহকদের অনলাইন সেবা দিচ্ছে। একসময় অনলাইন সেবায় সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো পিছিয়ে থাকলেও এখন ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ শাখা অনলাইনের আওতায় এসেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৩ হাজার ৭৬৬টি শাখার মধ্যে ৩ হাজার ৬৯৩টি শাখায় অনলাইন সেবা রয়েছে। আর বিশেষায়িত উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ১ হাজার ৪২০টি শাখার মধ্যে ৪১৩টি শাখা অনলাইন সেবা দিচ্ছে। আর বেসরকারি খাতের ৫ হাজার ১২৯টি শাখার মধ্যে দুটি বাদে সবগুলো শাখায় অনলাইন সেবা রয়েছে। বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মোট ৬৪টি শাখাতেই অনলাইন সেবা রয়েছে। জানা গেছে, গ্রিন ব্যাংকিংয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্যাংকগুলো এটিএম বুথের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা গ্রাহক সেবা প্রদান করে আসছে। বর্তমানে সোলার এনার্জির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর ৫৭৮টি শাখা পরিচালিত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিউনিটি ব্যাংক লিমিটেড এবং লঙ্কান এলাএন্স ফিন্যান্স লিমিটেড বাদে দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রিন ব্যাংকিং পলিসি ও অফিস গাইড রয়েছে। পরিবেশবান্ধব তথা গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রম বাস্তবায়নে বেশির ভাগ ব্যাংকের আগের চেয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রিন ব্যাংকিংয়ে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তারা বলছেন, গ্রিন অর্থনীতিতে দেশের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, গ্রিন ব্যাংকিংয়ে ব্যাংকের পরিচালক, ব্যবস্থাপনা সব পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকের মধ্যে সচেতনতা গড়ে উঠছে না, খাতভিত্তিক জরুরি অর্থায়ন নীতি ও প্রক্রিয়া হাতে নেওয়া হয়নি, শিল্পকারখানা ক্যাটাগরি অনুযায়ী সঠিক স্থানে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।