সোমেশ্বরীতে পাথর-কয়লার সন্ধানে শত মানুষ

শ্যামলেন্দু পাল, নেত্রকোনা প্রতিনিধি

নেত্রকোনার পাহাড়ি উপজেলা দুর্গাপুরে বহু দরিদ্র লোকের এখন প্রধান আয়ের উত্স হচ্ছে সোমেশ্বরী নদীর বুক থেকে কয়লা আর পাথর সংগ্রহ। প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার নারী-পুরুষ আর কিশোর-কিশোরী এই কয়লা আর পাথর সংগ্রহে এখন ব্যস্ত। এই কাজে তাদের আয় অনেক। যে কোনো বড়ো চাকরিজীবীর চেয়েও বেশি বলে জানা গেছে। কারো কারো আয় দৈনিক হাজার টাকার ওপর। সরকারকে কোনো কর দিতে হয় না তাদের। প্রায় সারা বছর চলে এই কাজ।

জানা গেছে, দুর্গাপুরের পার্শ্ববর্তী ভারতের মেঘালয় রাজ্য। সেখানে রয়েছে বিশাল কয়লা খনি। পাহাড়ি নদী সোমেশ্বরীর স্রোতের সঙ্গে গুঁড়া কয়লা ভেসে আসে। শত শত মানুষ পানিতে জাল দিয়ে বা কাপড় দিয়ে এই কয়লা  ছেঁকে  তোলে অথবা মাটি আর পানি ছেঁকে কয়লা বের করে। পরে পানিতে তা পরিষ্কার করে নেয়। ভরা বর্ষায় এভাবে কয়লা আসার পরিমাণ বাড়ে আবার শীতে কমে যায়। দুর্গাপুরের বিজয়পুর থেকে কুমুদগঞ্জ পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার নদী পথে চলে কয়লা বা পাথর আহরণ। কয়লার মতো নুড়ি পাথরও এভাবে আহরণ করা হচ্ছে। এই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শত শত পুরুষ-মহিলা-কিশোর পানিতে নেমে কয়লা আর পাথর সংগ্রহ করছে।

কয়লা সংগ্রহকারী জরিনা বেগম জানান, তার বাড়ি বিজয়পুরে। তিনি প্রতিদিন তার পরিবার-পরিজন নিয়ে পাঁচ থেকে ছয় মন কয়লা সংগ্রহ করে থাকেন। প্রতি মন কয়লা মহাজনের কাছে ১৮০ টাকায় বিক্রি করেন। এতে তার আয় হয় ১ হাজার টাকা। প্রতিদিনই তিনি এভাবে কম-বেশি আয় করে থাকেন। একই রকম কথা বলেন শাহেদ আলী। তিনি সংগ্রহ করেন পাথর। তিনি নৌকা দিয়ে আরো কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে পাথর সংগ্রহ করে থাকেন। এক টিন পাথর বিক্রি করেন ২৫ টাকায়। ১৫ থেকে ২০ টিন পর্যন্ত তিনি পাথর সংগ্রহ করে বিক্রি করে থাকেন। তবে মহাজনরা এর চেয়ে বেশি দামে ঠিকাদারদের কাছে পাথর বিক্রি করেন। তারা প্রতি টিন বিক্রি করেন ৭০ থেকে ৮০ টাকা।

দুর্গাপুরের স্থানীয় এবং প্রবীণ ব্যক্তি মোহন মিয়া জানান, তার বাড়ির পাশ দিয়েই বহমান সোমেশ্বরী নদী। প্রতিদিন সকাল থেকেই শুরু হয় কয়লা আর পাথর সংগ্রহ। এই কাজে পুরুষের চেয়ে মহিলারা বেশি পারঙ্গম। তারাই বেশি কাজ করে। তবে কয়লার চেয়ে নদী থেকে পাথর তুলে নেওয়াতে পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। সরকার এদিকে নজর দিলে ভালো হয়। অবশ্য হতদরিদ্র লোকজন যারা কাজ পায় না তারাই এই কাজ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। সরকারের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদী তাদের বাঁচিয়ে রাখছে। 

নেত্রকোনার পরিবেশবাদী অধ্যাপক কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, সোমেশ্বরী নদী থেকে যারা নুড়ি পাথর সংগ্রহ করে তারা হতদরিদ্র লোকজন। যত্সামান্য পাথর সংগ্রহ করে, তাতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ পাহাড়ি নদী হওয়াতে বালি এসে তা মুহূর্তেই ভরাট হয়ে যায়।

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম সোমেশ্বরী নদী থেকে কয়লা ও নুড়ি পাথর সংগ্রহের বিষয়ে বলেন, এই নদীতে বিরাট ধরনের পাথর উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। কারণ এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করার মতো পাথর  নেই। এখানে একেবারে ক্ষুদ্র নুড়ি পাথর আছে। আর এ কারণে নুড়ি পাথর উত্তোলনের জন্য কোনো ইজারা দেওয়া হয় না। জেলা প্রশাসন থেকে বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়। সেই ইজারা দেওয়া মহালের বালির মধ্য থেকে কিছু লোক বর্ষাকালে আর শুষ্ক মৌসুমে নুড়ি পাথর সংগ্রহ করে থাকতে পারে। এটা ইজারাদারের বিষয়। আর ভারতীয় অংশ থেকে সোমেশ্বরী নদী দিয়ে কয়লা আসে। জাল দিয়ে ছেঁকে ছেঁকে এই কয়লা এলাকার দরিদ্র লোকজন সংগ্রহ করে বাজারের চায়ের দোকানে বিক্রয় করে থাকে বলে শুনেছি। সোমেশ্বরী নদীতে বড়ো আকারের কোনো পাথর  নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।