পাহাড়ের মাটি ও কৃষিজমির টপ সয়েল দিয়ে হচ্ছে ইট!

ভাটায় পুড়ছে গাছ

দিদারুল আলম, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় অর্ধশতাধিক ইটভাটায় অবাধে পোড়ানো হচ্ছে পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলের গাছ। এসব ইটভাটা গড়ে উঠেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও লোকালয়ের অনতিদূরে। এমনকি পাহাড়ি জমি ও কৃষি জমির ওপরও গড়ে উঠেছে কয়েকটি। এতে উপজেলায় কমে যাচ্ছে কৃষিজমি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনাঞ্চল ও চাষাবাদ। ইটভাটার প্রভাবে পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যও চরম হুমকির মুখে পড়েছে। নির্বিচারে পাহাড়ি এলাকার গাছ নিধনের ফলে বন্যপ্রাণীরা বনাঞ্চল ছেড়ে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় কৃষক ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।

এসব ভাটার অধিকাংশ অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা। ভাটার কালো ধোঁয়ায় স্থানীয় রসুলাবাদ সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা, জাফর আহমদ চৌধুরী কলেজ, রসুলাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর সাতকানিয়া আলী আহমদ প্রাণহরি উচ্চ বিদ্যালয়, ওবাইদিয়া মাদ্রাসা, ছদাহা কে কে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইটভাটা নির্মাণের জন্য ভূমি ব্যবহার ও ইটভাটা নির্মাণ স্থানের দিকনির্দেশনামূলক সরকারি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। আইন অনুযায়ী ইটভাটা নির্মাণের জন্য কেবল অকৃষি জমি ব্যবহার করা যাবে। কয়লা মজুত করা না হলে লাইসেন্স নবায়নে সরকারি বিধিনিষেধ রয়েছে। ইটভাটা নির্মাণের অনেক শর্ত থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না। পরিবেশবান্ধব চিমনি স্থাপন করা ইটভাটা নির্মাণের পূর্ব শর্ত।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া উপজেলাধীন মৌলভীর দোকান হতে শিশুতল পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত রয়েছে ৩৫টি ইটভাটা। গত কয়েক বছরে এসব ইটভাটায় মাটি সরবরাহ করার কারণে এলাকার বহু কৃষিজমি এখন গর্তে পরিণত হয়েছে। অপরদিকে, সাতকানিয়া-বাঁশখালী সীমান্তের এওচিয়া ইউনিয়নের চুড়ামণি, চনখলা ও ছদাহা এলাকায় গড়ে উঠা ১৭টি ইটভাটার চারদিকে রয়েছে সবুজ পাহাড়। আর এসব পাহাড়ে রয়েছে সরকারি-বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা গাছের বাগান। অন্যদিকে, ইটভাটাগুলো স্থাপন করা হয়েছে অসংখ্য পাহাড় ও টিলা কেটে। এসব ভাটার মধ্যে এমনো রয়েছে যা নিষিদ্ধ ড্রাম চিমনি প্রযুক্তির। ভাটার চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ার প্রভাবে বনাঞ্চলের গাছগুলোও মরণাপন্ন।

সাতকানিয়া উপজেলার কেওচিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনির আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, ইটভাটার জন্য মাটি কাটতে কাটতে কেরাণীহাটের উত্তর-পশ্চিম পার্শ্বে বিশাল এলাকায় গভীর গর্তে পরিণত হয়েছে। ইটভাটার স্তূপকৃত মাটির কারণে বর্ষার সময়ে পানি জমে দীর্ঘদিন আটকে আছে। এতে অনেকে পানিবন্দি জীবনযাপন করেছেন। কেরাণীহাট এলাকার ইটভাটার কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের অনেক মূল্যবান গাছ মরে গেছে। তাছাড়া ইটভাটায় মাটি নিয়ে যাওয়ার কারণে মহাসড়কে যেসমস্ত মাটি পড়ে যায় তার ওপর বৃষ্টি হলে রাস্তা হয় পিচ্ছিল। যার ফলে বিগত দিনে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটেছে। তিনি সাতকানিয়ার সমস্ত ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাক বলে জানান।

উপজেলাধীন আলহাজ জাফর আহমদ চৌধুরী কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র মিজবাহ উদ্দিন ও ছদাহা কে কে উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র খোরশেদ আলম বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের পাশেই রয়েছে ইটভাটা। সকালের রোদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইটভাটার ধোঁয়ার বিকট গন্ধে ক্লাস করতে খুব কষ্ট হয়।

সাতকানিয়া ব্রিকফিল্ড সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিনের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা পাহাড় কাটে তাদের সঙ্গে আমাদের সমিতির সম্পর্ক নেই। এ ব্যাপারে চেয়ারম্যান মানিক জানে বলে মুঠোফোন কেটে দেন।

সাতকানিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সক মোহাম্মদ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ইটভাটার কালো ধোঁয়ার কারণে শিশুসহ সাধারণ মানুষের মুখে-চোখে প্রদাহ ও শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা হয়। চট্টগ্রাম মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মুখলেছুর রহমান ফরহাদী বলেন, সাতকানিয়ার যত্রতত্র ইটভাটার কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক হারুন অর রশিদ পাঠানের কাছে সাতকানিয়া উপজেলার ইটভাটাগুলোর পরিবেশের ছাড়পত্র আছে কি না জানতে চাইলে তিনি এ ব্যাপারে তাদের ডিডি স্যারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মো. ফেরদৌস আনোয়ার মুঠোফোনে বলেন, তথ্য অধিকার আইনে ফরম পূরণ করে পাঠালে সাতকানিয়ার ইটভাটার তথ্য জানাব।

সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় জানান, তার জানা মতে উপজেলায় ৫৩টি ইটভাটা রয়েছে। এসকল ইটভাটায় যে হারে জমির টপসয়েল ব্যবহার করছে তার ক্ষতি বলে বর্ণনা করা যাবে না। এ ব্যাপারে এলাকার সকল স্তরের জনগণকে বেশি করে সচেতন হতে হবে।

এ ব্যাপারে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবারক হোসেন ইত্তেফাককে জানান, অবৈধভাবে পাহাড় ও মাটি কাটার ব্যাপারে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। শিগিগরই পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে এলাকায় অভিযান চালাব।