বাণিজ্যযুদ্ধ প্রশমিত হলেও বাগ্যুদ্ধ কমছে না!

তৌহিদ আজিজ 

 

চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ বর্তমানে একটা মসৃণ পথে থাকলেও দুই দেশের মধ্যে বাগ্যুদ্ধ থামছে না। এ যাত্রায় চীন অনেকটা রাখঢাক না রেখেই যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছে, তারা চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক ফোনালাপে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

জিনপিং বলেন, বর্তমানে হংকং, জিনজিয়াং, তাইওয়ান এবং তিব্বতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে নেতিবাচক কথা বলছে, সে ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, বর্তমানে দুই দেশের মাঝে বাণিজ্যযুদ্ধ অনেকটা প্রশমিত হয়েছে। কিন্তু চমত্কার এ সম্পর্কের মাঝে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বিষয়গুলো। আমরা মনে করি, যুক্তরাষ্ট্র যদি এ বিষয়গুলো নিয়ে দায়িত্বশীল আচরণের প্রমাণ দেয় তাহলে এ সম্পর্ক নতুন এক উচ্চতায় যেতে বাধ্য। অন্যথায় এ বিষয়গুলো তাদের উভয়েরই সামনের পথচলায় আরো বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ১৮ মাসব্যাপী দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের পর গত সপ্তাহে এ বিষয়ের কিছুটা সুরাহা হয়। আলোচনার প্রথম পর্বে তারা একটা সমঝোতায় উপনীত হয়, যাকে ‘ফেজ ওয়ান’ চুক্তি বলে অভিহিত করা হয়। চুক্তিতে একমত হওয়ার এক সপ্তাহ পর বৃহত্ ঐ দেশ দুটির প্রধানদের মধ্যে এই আলোচনা হয়। চুক্তি অনুযায়ী চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষি যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি বাড়াবে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্য প্রবেশের ওপর থেকে শুল্ক বাধা দূর করা হবে। সে মোতাবেক চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫ হাজার কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানিতে সম্মত হয়েছে। বিনিময়ে চীনের ১৬ হাজার কোটি ডলারের পণ্যে মার্কিন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কথাও বলা হয়। এছাড়া বর্তমানে যে শুল্ক কার্যকর রয়েছে তা কমিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা হয়। উভয়পক্ষ এ বিষয়ে সম্মত হলেও যদিও এখনো এ ব্যাপারে চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। তবে এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যে অচলাবস্থা ছিল তা অনেকাংশে দূর হয়েছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা দু্ই দেশের মধ্যে চলমান সম্পর্ককে আরো উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই। আর সে চেষ্টা আমাদের সামনেও অব্যাহত থাকবে। কিন্তু যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ঢুকে পড়ছে তা সত্যিকার অর্থেই একটা উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, এর ফলে চীনের জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যকার আস্থার পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। এ কারণে তিনি এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বেরিয়ে আসার আহবান জানান।’ ঐ ফোনালাপের পর ট্রাম্পও এক টুইটে বলেন, তার সঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্টের খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। এ আলোচনায় হংকং ইস্যু থেকে শুরু করে উত্তর কোরিয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বাণিজ্যচুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে আমরা আরো কাঙ্ক্ষিত ধাপে অগ্রসর হতে পারব। ট্রাম্প বলেন, আরো ভালো দিক হচ্ছে এই যে চীন এরই মধ্যে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিপুল অঙ্কের কৃষিপণ্য আমাদের কাছ থেকে কেনা শুরু করেছে। যদিও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক চুক্তির চূড়ান্ত স্বাক্ষর এখন পর্যন্ত হয়নি। তবে সে বিষয়টির জন্যই আমরা অপেক্ষায় আছি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আলোচনায় চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিষয়টি উঠে আসলেও সার্বিক বিবেচনায় এর একটা সুদূরপ্রসারী ফল রয়েছে। কেননা এর মাধ্যমে চীনও তাদের পুরনো ক্ষতটা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। ফলে দুই দেশই বিশেষ করে বেইজিং অনেকটা খোলামেলাভাবে তার উদ্বেগের বিষয়গুলো পরিষ্কার করতে পেরেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে তার সরাসরি কোনো উত্তর দেয়নি। তবে যে কোনো সমস্যার সমাধানই আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত। সেদিক থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভূমিকাটি প্রশংসার দাবিদার। কেননা তিনি নিজে থেকেই এই আলোচনার কথা বলেছেন। আরেকটি বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন নিজ ‘ঘর’ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসনের প্রস্তাব পাশ হয়ে গেছে। যদিও তা চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে হলে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট হয়ে আসতে হবে। তবে সে ধরনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ। কারণ সিনেটের বেশির ভাগ আসনই রিপাবলিকানদের দখলে। কাজেই তাকে ফেলে দেওয়া অতটা সহজ হবে না। কিন্তু তার পরও এটা ট্রাম্পের জন্য একটা বড় ধরনের ধাক্কা। আর এ কারণেই হয়তো তিনি বহির্বিশ্বে পুরোনো শত্রুতাকে নতুন বাড়াতে চাইছেন না।