অস্ট্রেলিয়া যখন পুড়ছে...

এম এ আলআমিন

 

কথায় বলে, রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান অবস্থা অনেকটা যেন সেরকমই। দাবানলে বনের পর বন পুড়ছে। আগুন এখন লোকালয় পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার উপক্রম। অন্তত ৬০০ স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে রাজনীতিকেরা একে অন্যের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত।

অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে বরাবরই সাধারণ বিচারবুদ্ধির একটি প্রাধান্য লক্ষ করা গেছে। তবে সাম্প্রতিক দাবানলের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুর সঙ্গে এখনো দেশটির সব রাজনীতিক একমত নন। একটু পেছনে ফেরে তাকানো যাক। ১৯৯৬ সালে এক গুলি বর্ষণে অনেক লোক মারা যাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ায় নিষিদ্ধ হয়েছিল স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। আরও পেছনের দিকে তাকাই। বেঁচে থাকার জন্য মজুরি, অবসরকালীন সঞ্চয়, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা, সংস্থানযোগ্য উচ্চশিক্ষার মতো বিষয়গুলোতে আইন প্রণয়নের কাজটি স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই করা হয়েছিল। শতাধিক বছর আগেই বিষয়গুলোতে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন। এসব বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে তাদের খুব বেশি সময় প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে এখন মতৈক্যে পৌঁছতে পারছেন না।

দাবানল অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলের একটি বড়ো অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু জলবায়ু ইস্যুতে রাজনীতিকদের মধ্যে যে মতপার্থক্য চলছে সেটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও বেশি বিপদ ডেকে আনতে পারে। তারা যে ভাষায় এখন পরস্পরকে আক্রমণ করছেন তা এককথায় কাণ্ডজ্ঞান বিবর্জিত। একে অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করাই তাদের লক্ষ্য। উপপ্রধানমন্ত্রী  মাইকেল ম্যাককরম্যাক সম্প্রতি এবিসি রেডিওকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ধারণার যারা প্রবর্তক তারা আসলে পাগল। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুটি এখন আলোচনার বিষয় নয়। দাবানলে ক্ষতির সম্মুখীন লোকজনকে সহায়তা করা এখন আশু প্রয়োজন। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। গ্রিন পার্টির এমপি অ্যাডাম ব্যান্ডট বলেন, ‘যারা বলেন জলবায়ু সঙ্কট নিয়ে আমাদের চিন্তিত হওয়ার দরকার নেই, তারাই প্রকৃত অপ্রকিতস্থ’। গ্রিন পার্টি পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে বলে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে অগ্নি নির্বাপণ, জরুরি সহায়তা পৌঁছান এবং জনগণকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার মতো কাজগুলো সরকার এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এখানে জলবায়ু পরিবর্তন বিবেচ্য বিষয় নয়।

গ্রিফিথ ল স্কুলের আইনের সহযোগী অধ্যাপক সুসান হ্যারিস রিমার বলেন, ‘আমাদের কোনো জ্বালানি নীতি নেই, নেই কোনো কার্যকর জলবায়ু নীতিও। বিষয়টি আসলেই উদ্বেগের।’ তবে অস্ট্রেলিয়াই একমাত্র দেশ নয়, যেখানে জলবায়ু নীতি নেই। যুক্তরাষ্ট্রও এখন ঐ পথে হাঁটছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সম্প্রতি  প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসার কথা জানিয়েছে। জলবায়ু ইস্যুর প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বরাবর বৈরী মনোভাব পোষণ করেছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় ভয়াবহ দাবানল সত্ত্বেও এ ব্যাপারে ওয়াশিংটন এ ব্যাপারে নিজের অবস্থান বদলায়। কেবল অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকাই নয় জলবায়ু চুক্তিতে কার্বন নির্গমন কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়া হয়েছে কানাডা বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো সেটি পূরণ করতে পারেনি।

অস্ট্রেলিয়া প্রসঙ্গে আসি। বিশাল দ্বীপ দেশটিতে পানির চেয়ে কয়লা বেশি সহজলভ্য। দাবানল এখন সিডনি থেকে পৌঁছে গেছে  ৫০০ মাইল দূরে বায়রন উপসাগর পর্যন্ত। ৮০টি জায়গায় দাবানলে এ পর্যন্ত অনেক লোকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে জন সাধারণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সরকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি বার্নাবি জয়েস বলেছেন, ‘দাবানলে গ্লেন ইন শহরের কাছে দুজনের মৃত্যুর (সরকারি হিসেবে অবশ্য মৃতের সংখ্যা ২ বলা হয়েছে) জন্য দায়ী গ্রিন পার্টি। তারা তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসতে পারত। কিন্তু  তারা তা করেনি। তার এই মন্তব্যের জবাবে গ্রিন পার্টির একজন সিনেটর বলেছেন, ‘জয়েসের কথায় মনে হচ্ছে প্রধান রাজনৈতিক দলের সদস্যরা বনে অগ্নি সংযোগকারীর চেয়ে কোনো অংশেই ভালো নয় বলে মনে হয়। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে বাদানুবাদ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সিডনি মর্নিং হেরাল্ড সংবাদপত্রে ‘অগ্নিশিখা যত ওপরে উঠছে, রাজনীতির তত অধঃপতন ঘটছে’ শিরোনামে সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে।