শীতেও কামড়াচ্ছে এডিস মশা। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাড়তে থাকা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ডিসেম্বরে এসেও শেষ হয়নি। এখনো প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে নতুন ডেঙ্গু রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীসহ সারাদেশে ১৯ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আগে জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল। ঐ সময় ঘন বৃষ্টিপাতের কারণে এডিস মশার বিস্তার হতো। এখন সারা বছরই হচ্ছে। এখনই মশা নিধনের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম না নিলে শীতের পর ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।
বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, এডিস মশা নিধনের কার্যক্রম এখন থেকেই শুরু করতে হবে। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে মশা নিধনের কার্যক্রম শুরু না করলে আগামী বছর ব্যাপক হারে ডেঙ্গু রোগী দেখা দেবে। তাই সময় থাকতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে তিনি জানান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, এ বছর সারা দেশেই ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। এখন ডেঙ্গুতে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিধন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
এ বছর ডেঙ্গুর জীবাণু বাহক এডিস মশার বিস্তার ঘটেছে দেশের প্রায় সব এলাকায়। এ কারণে এখন থেকে ডেঙ্গু সারা বছরই কমবেশি থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আগে এডিস মশার বিচরণ শহর এলাকাতেই বেশি ছিল। এখন গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ায় আরো সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে বিপদ এড়াতে দেশ জুড়ে সারা বছর মশক নিধন কার্যক্রম চালানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা।
ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা নিধনের ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে একটি কমিটি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম। গতকাল রবিবার সচিবালয়ে মশা ও ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের বিস্তার রোধে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা বিষয়ক বৈঠকে এ কথা জানান মন্ত্রী। এ বছর ডেঙ্গুর ব্যাপকতার বিষয়টি ভাবনায় নিয়ে আগামী বছর যাতে এর প্রভাব না থাকে, সেজন্য কীভাবে কাজ করা হবে সেটাই মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ‘সভায় ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট করার জন্য একটি কমিটি করতে যাচ্ছি। সেই লক্ষ্যে আমাদের স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে (নগর উন্নয়ন) আহ্বায়ক করে এর সঙ্গে ঢাকা সিটি করপোরেশন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি করা হবে। মন্ত্রী আরো বলেন, ‘এ কমিটি একটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম কীভাবে উন্নত করা যায়, কী করে সারা বাংলাদেশে মশক নিধন বা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ থেকে রক্ষা করা যায়, এজন্য একটি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরামর্শ দেবে। কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে একটি প্রতিবেদন দেবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার হিসাবে, বছরের শুরু থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ২০৯ জন। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) ডেঙ্গু সন্দেহে ২৬৬ জনের মৃত্যুর তথ্য এসেছে। এরই মধ্যে আইইডিসিআর ২২৩ জনের মৃত্যু পর্যালোচনা করে ১৪১ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০০ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি ছিল। এ সময় ১৫ হাজার ১২৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হন, মারা যান ২৩৩ জন। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কমে আসে। সে সময় মোট আক্রান্ত হন ৬ হাজার ৬৫৬ জন; মারা যান ৯ জন। ২০১৫ সাল থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আবার বাড়তে থাকে। ২০১৫ থেকে ২০১৮—এই চার বছরে ২২ হাজার ১৩৯ জন আক্রান্তের পাশাপাশি ৫৪ জনের মৃত্যু হয়। ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ৫০ হাজার ১৪৮ জনের ডেঙ্গুর চিকিত্সা নেওয়ার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে সরকারের খাতায়। আর ২০১৯ সালে এর দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. শরীফ আহমেদ বলেন, পুরান ঢাকায় কিছু মানুষ খাবার পানি সংগ্রহ করে জমা রাখার কারণে সেখানে কিছু লার্ভা জমে। এছাড়া নির্মাণাধীন ভবনের মধ্যেও এডিসের লার্ভা রয়েছে। আমরা এসব জায়গা থেকে লার্ভা দূরীকরণে কাজ করছি। এছাড়া এটাও ভাবা হচ্ছে কীভাবে খাবার পানির মধ্য থেকে এই লার্ভা দূর করা যায়। তবে এখন এডিসের লার্ভার চেয়ে কিউলেক্স মশার উপদ্রব বাড়ছে। আমরা সেটি গুরুত্বসহকারে নিচ্ছি। আমরা সার্ভে করে মশার লার্ভার জায়গাগুলো নির্ধারণ করে কাজ করছি। আমাদের পর্যাপ্ত মশার কীটনাশক রয়েছে।
উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, প্রত্যেক ওয়ার্ডে আমরা কিউলেক্স মশার লার্ভা যেখানে জন্মে এমন জায়গা সার্ভে করে শনাক্তের মাধ্যমে অতিরিক্ত লোক দিয়ে স্প্রে করার ব্যবস্থা করেছি। এছাড়া আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে এখন যারা ডেঙ্গু আক্রান্ত, তাদের বসবাসের এলাকা শনাক্ত করে সেসব এলাকায়ও এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করতে স্প্রে করব। আমাদের পর্যাপ্ত কীটনাশক রয়েছে মশা নিধনের। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি।