সকল শ্রেণির বন একীভূত করলে বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ দাঁড়ায় ২.৬ মিলিয়ন হেক্টর, যা দেশের মোট বনভূমির ১৭.৪ ভাগ। দেশের মোট প্রবৃদ্ধির বন সেক্টরের অবদান শতকরা ৩ ভাগের কাছাকাছি। বন থেকে আহরিত বনজ দ্রব্য ব্যাতিরেকেও বন নির্মল বায়ু, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, কার্বন আধার, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসহ নানাবিধ সেবা দিয়ে থাকে, যা প্রবৃদ্ধি হিসাবকালীন গণ্য হয় না। বাংলাদেশের বৃহত্ জনগোষ্ঠীর বৃহদাংশ বিশেষ করে বনপ্রধান অঞ্চলে জীবিকা ও কর্মসংস্থানের জন্য বনের ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব রোধে বনের অবদান সর্বজন স্বীকৃত। এ পরিপ্রেক্ষিতে বনের আচ্ছাদন বৃদ্ধিকল্পে বনায়ন কার্যক্রম বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ অর্জনে বনের প্রয়োজনীয়তা সকল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে প্রযোজ্য। বন পুনঃনবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রতিবেশগত সকল সেবার পাশাপাশি বন স্থানীয় অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর আয় বর্ধনে সহায়ক। দারিদ্র্য বিমোচনে বনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রত্যক্ষ আর্থিক সহায়তা প্রদান অত্যন্ত বিরল। বন মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত।
বনের ধরন ও বিন্যাস :২.৬ মিলিয়ন বনভূমির ১.৬ মিলিয়ন বনবিভাগ নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি বনাঞ্চল। পার্বত্য অঞ্চলে বিস্তৃত ০.৭৩ মিলিয়ন হেক্টর অ-শ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল বর্তমানে পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীন। যদিও সরকার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বৃক্ষ-আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ ৬.৭%। বাংলাদেশে মাথাপিছু বনভূমির পরিমাণ ০.০১০ হেক্টরের নিম্নে, যার বিশ্ব গড় হলো ০.৬০ হেক্টর। মোট ৬৪ জেলার মধ্যে ১২ জেলায় মোট বনভূমির ৯০ ভাগ বিস্তৃত। ৩২ জেলায় কোনো সরকারি বনভূমি নেই। মোট বনের ৮৪ ভাগ প্রাকৃতিক বনের শ্রেণিভুক্ত এবং বাকি ১৬ ভাগ বনায়ন দ্বারা সৃষ্ট। পুরনো তথ্যমতে সারাদেশে বিক্ষিপ্ত গ্রামীণ বনের মোট এলাকার পরিমাণ ০.২৭ মিলিয়ন হেক্টর। বন-সম্পদ চাহিদার মোট ৭০ ভাগ টিম্বার ৯০ ভাগ জ্বালানি ও বাঁশ গ্রামীণ বন মিটিয়ে থাকে। বাংলাদেশের মোট ৫০% যেকোনো ধরনের বন দিয়ে আচ্ছাদিত। এমনকি মোট কৃষিভূমির ৩০ ভাগেও বনের আচ্ছাদন রয়েছে।
বাংলাদেশের পাহাড়ি বন বৃহত্তর চট্টগ্রাম, সিলেট ও পার্বত্য অঞ্চলে বিস্তৃত। এর পরিমাণ ০.৬৭ মি. হেক্টর। এককালের জীববৈচিত্র্য-সমৃদ্ধ পাহাড়ি প্রাকৃতিক বন আজ নিঃশেষিত প্রায়। অপরিকল্পিত বৃক্ষ সম্পদ আহরণ ও ভূমি দখলের ফলে বনের পরিমাণ সংকুচিত হচ্ছে। প্রকল্প ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে বিশাল এলাকায় বনায়ন হয়েছে। সামাজিক বনায়নের গ্রহণযোগ্যতার পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়ি বনেও সামাজিক বনায়ন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। দেশের কেন্দ্রীয় ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সমতল ভূমির বন বিস্তৃত। শালপ্রধান এই বনের পরিমাণ ০.১২ মি. হেক্টর। এই এলাকায় শিল্পায়ন ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। বনভূমি দখলের প্রবণতা বেড়েছে এই এলাকায়। দেশের প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনের পরিমাণ ০.৬০ মি. হেক্টর। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে এই বন অবস্থিত। বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য-সমৃদ্ধ এই বন। এই বনে রয়েছে বিপদাপন্ন বাঘ। প্রতিবেশ সেবায় এই বনের অবদান এখনো অবধি অনন্য। জনগোষ্ঠৗর একটি অংশ জীবন-জীবিকার জন্য এই বনের ওপর নির্ভরশীল। ষাট দশকের মাঝামাঝি থেকে এদেশে গড়ে উঠেছে বিশাল মানবসৃষ্ট উপকূলীয় বন। ঝড়-ঝঞ্ঝা-জলোচ্ছ্বাসে মানুষের জানমাল রক্ষায় এ সৃষ্ট বনের অবদান অপিরিসীম। সম্পদ সৃষ্টির পাশাপাশি এ বনের জীববৈচিত্র্য আজ সমৃদ্ধ। বনায়নের মাধ্যমে সমুদ্র থেকে জেগে ওঠা ভূমি আজ দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশের পাহাড়ি এলাকা, সমতল ভূমি ও উপকূলীয় অঞ্চলে ইতোমধ্যেই ব্যাপক বনায়ন সম্পন্ন হয়েছে। বিভিন্ন কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরো অধিক এলাকায় বনায়নের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সরকারি বন ব্যতিরেকে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে রাস্তা, বাঁধ ও রেললাইনের ধারেও বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য :বন সংকুচিত হওয়ার কারণে বন্যপ্রাণী তার আবাসস্থল হারাচ্ছে। কোনো বন্যপ্রাণী এককভাবে বাঁচতে পারে না। তার জন্য একটি অনুকূল এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ প্রয়োজন। যে প্রতিবেশে তার বিচরণ সেখানকার প্রতিটি উপাদানের জন্য সুস্থ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ প্রয়োজন। বন্যপ্রাণী তার আহার, আশ্রয়, নিরাপত্তা ও চলাচলের জন্য বনভূমি ব্যবহার করে। বন্যপ্রাণী চলাচলের জন্য এক বন থেকে অন্য বনে যেতে সংযোগপথ ব্যবহার করে থাকে। এই পথ যদি বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহূত হয়, তবে বন্যপ্রাণীর চলাচল বিঘ্নিত হবে। বন্যপ্রাণী একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আবদ্ধ হয়ে পড়বে, যা বন্যপ্রাণীর সুস্থ থাকা এবং বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ। বন ধীরে ধীরে সংকুচিত হওয়ার কারণে উদ্ভিদ ও প্রাণীর এলাকা সীমিত হয়ে যাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য ক্রমশ বিনষ্ট হচ্ছে। এতে করে জীবনচক্র ও খাদ্যচক্রে একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বনে উদ্ভিদ ও বৃক্ষের আধিক্য না থাকায় বন্যপ্রাণীর খাদ্য সংগ্রহে বিস্তৃত এলাকায় বিচরণ করতে হয়। অনেক বন্যপ্রাণী রয়েছে যারা শুধুমাত্র বৃক্ষেই জীবন যাপন করে। এই সমস্ত প্রাণী মাটির স্পর্শে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। উঁচু বৃক্ষের অভাবে এদের বিচরণ সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও প্রতিবেশগত সংবেদনশীল এলাকা রয়েছে, বিশেষ করে উপকূল অঞ্চলে যেখানে বিশ্বে বিরল এমন প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আবাস। দেশের সীমিত কয়েকটি এলাকায় এদের বিচরণ। নানাবিধ কারণে এই এলাকাগুলো সংকটাপূর্ণ। প্রতিবেশগত সংবেদনশীল এই এলাকাগুলোর যথাযথ জরিপ থাকা প্রয়োজন এবং এই এলাকাগুলো চিহ্নিত করে এগুলোর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচারের সংবাদ মাঝে মধ্যেই শোনা যায়। বন্যপ্রাণী পাচারের সংখ্যা—রুট, ও প্রজাতি বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে এটি পুরোপুরি বন্ধকল্পে উদ্যোগ নিতে হবে। এ বিষয়ে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। বন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রণয়ন করা যেতে পারে এবত্ তা সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমান সংকটাপন্ন অবস্থা বিবেচনা করে প্রতিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকাকে দ্রুত বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংস্থার উদ্যোগে ২০১৫ সালে ৭টি প্রাণী-গ্রুপের প্রায় ১৬০০ প্রজাতির একটি তালিকা প্রণয়ন করা হয়। এতে দেখা যায় প্রায় ৩১টি প্রজাতি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং আরো ২৬৮ প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার হুমকির মুখে রয়েছে। গবেষণার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। ইতোমধ্যে সরকারি পর্যায়ে নানাবিধ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সকল মহলের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা থাকা প্রয়োজন।
বন-ব্যবস্থাপনায় জনগণের অংশগ্রহণের সূচনা :বিশ্বব্যাপী বন-ব্যবস্থাপনায় দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন এসেছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, টেকসই বন-ব্যবস্থাপনা, প্রকৃতিভ্রমণ, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ইত্যাদির গুরুত্ব বেড়েছে অনেকখানি। বাংলাদেশেও বন-ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তন প্রতিফলিত হয় ১৯৯৪ সালের বন-নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে। ১৯৯৪ সালের বন-নীতি শুধুমাত্র কাঠ উত্পাদন ও রাজস্ব আদায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্ব দেয়। এই বন-নীতিতে সামাজিক বনায়ন ও বন-ব্যবস্থাপনায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। বন-ব্যবস্থাপনায় জনগণের অংশগ্রহণ বন সংরক্ষণে সহায়ক ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হয়। বন-নীতিতে সামাজিক বনায়নকে অধিক মাত্রায় সম্প্রসারণের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। বন-ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বন-নির্ভর জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সামাজিক বনায়নে অংশীজনের যথাযথ অংশ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এতে বনায়নের ব্যাপারে জনগণের উত্সাহ বৃদ্ধি পায়। পূর্বে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বন-ব্যবস্থাপনার বিষয় অবহেলিত ছিল। পূর্বে কিছু শঙ্কা থাকলেও পরবর্তীকালে সামাজিক বনায়নে অংশগ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। প্রথাগত বন সংরক্ষণ পদ্ধতি বন সংরক্ষণে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে যথেষ্ট ছিল না। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দেশে বৃক্ষ উত্পাদন বৃদ্ধি পায়। জনগোষ্ঠীর মাঝে সঠিক সময়ে আহরিত বৃক্ষের বিক্রয়লব্ধ অর্থ সুষ্ঠুভাবে বণ্টনের কারণে জনগণের মাঝে আস্তা বৃদ্ধি পায়। জনগণ সামাজিক বনায়নে অংশগ্রহণের জন্য অধিক মাত্রায় উত্সাহ বোধ করে। অংশীজনের মধ্যে লভ্যাংশ বিতরণের ফলে গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থ-সমাজিক উন্নয়নে সামাজিক বনায়ন প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে সহায়ক হয়।
সামাজিক বনায়ন ও সহ-ব্যবস্থাপনা :আশির দশকের শুরুতে দেশের উত্তরবঙ্গে প্রান্তিক ভূমিতে সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের সূচনা হয়। দেশের বৃক্ষের আচ্ছাদন বৃদ্ধিতে জনগণের অংশগ্রহণ ও একইসঙ্গে জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সামাজিক বন-ব্যবস্থাপনার মূলমন্ত্র। সংরক্ষিত বনবহির্ভূত এলাকায় প্রাথমিকভাবে সামাজিক বনায়নের কার্যক্রম শুরু হয়। সামাজিক বনায়নে উত্সাহ ও এর ব্যাপ্তি বৃদ্ধির ফলে এই কার্যক্রমকে আরো সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তারই ফলে ২০০০ সালে ১৯২৭ সালের বন আইন সংশোধন করে সামাজিক বনায়নকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বন আইনে নতুন ধারার সংযোজন করা হয়। এর মাধ্যমে সংরক্ষিত বনে সামাজিক বনায়নের সম্প্রসারণ বৈধতা পায়। সামাজিক বনায়নের বিষয়গুলো আরো স্পষ্ট করার লক্ষ্যে ২০০৪ সালে সামাজিক বনায়ন বিধিমালা প্রণীত হয়। এ বিধিমালার আলোকে অংশীজন নির্বাচন থেকে শুরু করে লভ্যাংশ বিতরণ সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। সামাজিক বনায়নে সমষ্টিগতভাবে অর্থলগ্নি করার সুবিধার্থে ২০১০ সালে সামাজিক বনায়ন বিধিমালায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। সমষ্টিগতভাবে নিজ অর্থলগ্নি করার ক্ষেত্রে লভ্যাংশের হার বৃদ্ধি করা হয়। সহ-ব্যবস্থাপনা বলতে বন-ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে সরকারি, বেসরকারি, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় অধিবাসীদের সমন্বিত উদ্যোগকে বোঝায়। প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ফলপ্রসূ করা ও এ ব্যাপারে তাদের উত্সাহ উদ্দীপনা বৃদ্ধি করাই হলো সহ-ব্যবস্থাপনার মূল বিষয়। এখানে সরকারিভাবে গৃহীত কর্মসূচি সুস্পষ্টভাবে সকল পক্ষকে জ্ঞাত করতে হবে। সকল সহযোগী পক্ষ বিশেষ করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এমনভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে যাতে করে তারা নিজেকে এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উপলব্ধি করে। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রয়োজনীয়তা, মানব অস্তিত্বে এর গুরুত্ব শুধুমাত্র যে তাদের জন্য নয়, ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য তা কতখানি মূল্যবান তা অনুভব করতে শেখাতে হবে। এই সম্পৃক্ততা বা সহযোগিতা অর্থবহ করতে হলে সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের জন্য কিছু আর্থিক প্রণোদনার সংস্থান করতে হবে। সহ-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সকল অংশগ্রহণকারী ও সহযোগীদের মধ্যে রক্ষিত এলাকা থেকে প্রাপ্ত সুফল বা উপকারের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। সকল পক্ষের মতামতকে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সকল পক্ষের ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিচালনা বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সকল পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হলো সহ-ব্যবস্থাপনা।
বন-ব্যবস্থাপনায় করণীয় :বনের প্রথাগত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। সকল স্তরের জন্য সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বনের ভূমি বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার রোধ করতে হবে। এতে বনগুলো বিচ্ছিন্ন হচ্ছে এবং বন তার সামগ্রিকতা হারাচ্ছে, বন্যপ্রাণীসহ বনের জীববৈচিত্র্য লোপ পাচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিবেশগত সংবেদনশীল এলাকাগুলো সংরক্ষণ করা অতীব জরুরি। দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার ও ভবিষ্যতে দখল রোধকল্পে সরকারের শক্ত অবস্থান ও নীতিমালা গ্রহণ প্রয়োজন। আর কোনোভাবে যেন বনভূমি দখলকে উত্সাহিত করা না হয়। বনভূমি জরিপ করে এর সীমানা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। জবরদখলের প্রবণতা রোধে সীমানা চিহ্নিতকরণ জরুরি। প্রয়োজনে ভূমিসংক্রান্ত বিষয়ে বনবিভাগে একটি বিশেষ সেল বা ইউনিট গঠন করে রেকর্ড-সংক্রান্ত দলিলাদি সংগ্রহ করা বাঞ্ছনীয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব রোধে বনায়নের বিকল্প নেই। ব্যাপক বনায়ন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে বনায়ন মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অংশগ্রহণমূলক বনায়ন কার্যক্রম মানুষের আস্থা অর্জন করেছে এবং জনগণ অংশগ্রহণে উত্সাহ ব্যক্ত করছে। এটি সাধারণ মানুষের আয় বর্ধনে সহায়তা করছে। সেইসঙ্গে বৃক্ষসম্পদ সৃষ্টি ও জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনগণকে সম্পৃক্ত করে বন-ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে সম্প্রসারিত করতে হবে। সহ-ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জনগণের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে। সহ-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পদনির্ভর জনগোষ্ঠী—পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে বন সংরক্ষণের সকল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবে।
কাঠ ও জ্বালানি কাঠের উত্পাদন ও চাহিদার সঠিক তথ্য নেই। এ বিষয়ে গবেষণা ও তথ্য নির্ণয়ের কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে বলা যায়, চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঠিক তথ্য ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়ক হবে। বন বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামো যুগোপযোগী করে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ করে দক্ষতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। মাঠপর্যায়ে প্রচুর জনবল ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণ করতে হবে। সমসাময়িক জ্ঞান ও প্রযুক্তি হালনাগাদ ও আধুনিক বন-ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পরিচিতির উদ্দেশ্যে সকল স্তরের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
লেখক :সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক