বু ন ন শি ল্প

সুতা থেকে বুনন :বাংলার তাঁত

বাংলাদেশের তাঁতশিল্প আমাদের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রেখে আসছে বহু যুগ আগে থেকে। তখন নিজেদের প্রয়োজনে তাঁতের কাপড় বোনা হতো। পরবর্তীসময়ে বিনিময়প্রথার মাধ্যমে তাঁতশিল্প ক্রমশ প্রসার লাভ করতে থাকে। আমাদের তাঁতবস্ত্র উত্পাদনের বিভিন্ন ধারায় পরিবারগুলোর ভূমিকা থাকে ব্যাপক। অঞ্চলভেদে কোথাও পুরুষ বা মহিলা তাঁত বুনে থাকে। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিবারের সবাই। তাই তাঁতকে বলে পরিবারভিক্তিক উত্পাদন। ইতিহাসে ঘাঁটলে দেখা যায়, দিল্লি, সমরখন্দ, বোখরা, ইস্পাহান ও দক্ষিণ ভারত এবং পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বাংলার তাঁতশিল্পের প্রচুর ব্যবহার ছিল। জেইন, মোগল, পাঠান, আরমানিয়ানরা এই অঞ্চলের তাঁতশিল্পের সঙ্গে বিনিময়ব্যবসা করত।

যমুনার ওপারে :পরবর্তীসময়ে নিজেদের প্রয়োজনে মোটা কাপড়ের শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ও থান কাপড় বোনা শুরু হয়। যমুনার ওপারে পুরো সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জোলা অঞ্চল বলে পরিচিত ছিল। সুতা থেকে বুনন—এই প্রক্রিয়ায় যারা কাজ করত তাদের বলা হতো জোলা ও জুলিস। সিরাজগঞ্জের আদি, মিহি সুতার বুনন দেশ ও দেশের বাইরে প্রসিদ্ধ ছিল। এই সিরাজগঞ্জের চেহারা এখন বদলে গেছে। ঘরে ঘরে এখনো তাঁত থেকে তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছা।

মসলিন ও জামদানি :দক্ষিণ এশিয়াই সুতি বয়নশিল্পের আদি পীঠস্থান। গবেষকরা মনে করেন—সিন্ধু অববাহিকায় প্রথম তুলা চাষের নজির মেলে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর যেসব নিদর্শন মহেঞ্জোদারো খননকার্যের সূত্রে পাওয়া গেছে, তার মধ্যে আছে মনজিত্ থেকে আহরিত লাল রঙে রঞ্জিত বস্ত্রের অংশবিশেষ, সুতা কাটার টাকু এবং সুই, যেগুলো ইতিহাসেরই সাক্ষ্য বহন করে। ভারত থেকে এই বস্ত্রশিল্প প্রথম বিস্তার লাভ করে মেসোপটেমিয়া, পারস্য এবং মিসরে। এরপর প্রথম শতাব্দীতে আরব বণিকেরা সুতিবস্ত্র পৌঁছে দেন ইউরোপ এবং দূরপ্রাচ্যে। ভারতীয় বয়নশিল্পীদের বোনা এক জাদুকরি সৃষ্টি এই সুতি কাপড়। হাতে কাটা সুতা আর হাতে বোনা তাঁতের কাপড়ের খ্যাতি গোটা উপমহাদেশজুড়ে, তবে বাংলার সুদৃশ্য জালসম সূক্ষ্ম বুননের মসলিনের জুড়ি মেলা ভার। এই মসলিন বাতাসের মতো হালকা, ঝরনার মতো স্বচ্ছ, জলের মতো মোলায়েম বলে আখ্যায়িত। মূলত ‘মসলিন’ শব্দটির উত্পত্তি ইরাকের মসুল শহরের সুতিবস্ত্রের বাণিজ্যসূত্রেই।

প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় নথিপত্রে বারবার স্বচ্ছ মসলিনের উল্লেখ রয়েছে। আরিয়ান-এর পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথ্রিয়ান সি-তে প্রথম শতাব্দীতে প্লিনি লিখেছেন কীভাবে রোমের অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে ভারত থেকে মহামূল্যবান কাপড় অতিরিক্ত পরিমাণে আমদানির ফলে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে গাঙ্গেয় বদ্বীপের উন্নত সুতিবস্ত্রের উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে মেগাসথিনিস রাজসভায় ফুলেল মসলিনের অনবদ্য পোশাকের প্রশংসা করেছেন। নবম শতাব্দীতে আরব পরিব্রাজক সুলায়মানের সবিস্তার বর্ণনায় বলা হয়েছে—‘রাহমি রাজ্যে (বাংলা) তৈরি সুতিবস্ত্র এতটাই সূক্ষ্ম যে, গোটা একটি পোশাক একটি আংটির মধ্যে গলিয়ে বের করা যায়’ তারই প্রতিধ্বনি আছে চৌদ্দশ শতকের ইবনে বতুতার বয়ানে। তিনি বলেছেন, রাজকীয় উপঢৌকনের উপযোগী এই অনন্য পেলব কাপড়। আবুল ফজলের আইন-ই আকবরীতে বঙ্গের অত্যাশ্চর্য এই মসলিনের বিশ্ব বাণিজ্যে আধিপত্যের কথার উল্লেখ রয়েছে। অষ্টম এবং নবম শতাব্দীতে আরব বণিকরা পূর্ব ভারতে প্রবেশ করেন। ত্রয়োদশ শতকে বাংলা মুসলিম শাসকদের অধীনে চলে যায় এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে এই মসলিন, যা আরব বণিকদের হাত ধরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি নবিজির মাজারে হজযাত্রীদের অর্পিত বিশেষ গিলাফটিও হয়ে ওঠে বাংলার কারুকার্যময় মসলিন রুমাল।

জামদানি, তাঁতজাত মসলিন, ঢাকাই তাঁতের শ্রেষ্ঠ কীর্তি বলে বিবেচিত। জামদানি শব্দের উত্পত্তি ফরাসি শব্দ থেকে। জামদানি মানে বুটিদার কাপড়। এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর কারুকাজখচিত নকশা, যা নিখুঁতভাবে তৈরি হয়। জর্জ ওয়াটস এসব অপরূপ নকশার উত্পত্তি পারস্যে বলে দাবি করেন এবং তাকে সমর্থন দেন পার্সি ব্রাউন—তারও অভিমত এসবের ধরন ও বৈশিষ্ট্য পারস্যের। এটা সহজেই অনুমেয়—কারণ, মুহম্মদ বিন তুঘলক থেকে মোগল সম্রাট পর্যন্ত সকলেই পারস্যের বয়নশিল্পীদের নিয়ে এসেছিলেন, ভারতের ওস্তাদ কারিগর বয়নশিল্পীদের সঙ্গে এই সুচারু বস্ত্র তৈরিতে একসঙ্গে কাজ করতে। জামদানির নকশা এবং গঠন দেখেও সেটা সহজেই ধারণা করা যায়। কারণ নকশাসমূহের ফুলেল ও জ্যামিতিক গঠন এবং ফারসি নামকরণ যথা—পান্না হাজরা, ফুলওয়ার, তোড়াদার, গুলদাস্তা, জামেওয়ার, তুরাঞ্জ, আশরাফি—এসব ইসলামি উেসর সমর্থন দেয়। মূলত তিনটি মৌলিক ফুলেল ও রৈখিক বিন্যাসকে অসংখ্য সম্মিলনে উপস্থাপন করা হয়েছে। গোটা বস্ত্রের জমিনে বুটির মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সহজ নকশাগুলোকে বলা হয় বুটিদার। ফুলেল বা রৈখিক নকশা জমিনে আড়াআড়িভাবে বেঁকে উঠে যাওয়ায় নকশার নাম হয় তেছরি, আর সারাজমিনে কারুকাজময় নকশার বিস্তার ঝালর বা জাল বলে উল্লিখিত। মসলিন অচিরেই নজর কাড়ে মুসলিম শাসকদের, যাদের রুচিতে অনুরূপ জাঁকজমক ও সমৃদ্ধির প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। জামদানি এবং মসলিন দুটোই সুতি কাপড়। মসলিন ছিল তাদের জন্য এক অনুপম বিকল্প। ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী রেশম পরিধানে পুরুষদের বিধিনিষেধ থাকায়, মোগল আমলে তাই স্বভাবতই হাতের কারুকাজ করা মসলিন এবং জামদানি কাপড় বিশেষভাবে জায়গা করে নেয়। জামদানির তৈরি জামা, আঙরাখা, পাটকা বা কোমরবন্ধ, চাদর, ওড়নি, রুমাল ইত্যাদির প্রচলন এক অতুলনীয় শ্রেষ্ঠত্বে পৌঁছে যায়। 

খাদি :গুজরাটি শব্দ খদ্দর থেকে খাদি শব্দটা এসেছে। খাদি কার্পাস তুলা থেকে হাতে কাটা সুতা দিয়ে হাতে বোনা কাপড়। বস্ত্রশিল্পের আধুনিকায়নে বস্ত্রবিপ্লবের পাশাপাশি খাদি এখনো টিকে আছে সীমিত আকারে। আমাদের মসলিনও খাদি গোত্রভুক্ত। চরকায় হাতে কাটা ৪০০ থেকে ৬০০ কাউন্টের মিহি সুতা দিয়ে হাতে বোনা হতো ফিনফিনে মসলিন। যার প্রসিদ্ধি ছিল বিশ্বব্যাপী।

মানুষের মৌলিক প্রয়োজন আহারের পর বস্ত্রের স্থান দ্বিতীয়। আদি ইতিহাসে গুহাচিত্র থেকে শুরু করে মূর্তি পেইটিং এমনকি মিশরের পিরামিডে হাতে বোনা কাপড়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। ৫,০০০ বছর আগে বৈদিক ও তিব্বত যুগে হাতে বোনা খাদি কাপড় বিশেষ প্রশংসিত ছিল। সেই সময় চরকা বিয়ের উপহার হিসাবে দেওয়া হতো। রামায়ণ ও মহাভারতেও সূক্ষ্ম হাতে বোনা খাদিতে সোনালি কারুকাজ করা কাপড়ের ব্যাপক প্রশংসা রয়েছে। প্রাচীন ২,৫০০ বছর আগে সিন্ধু মহেঞ্জোদারো সভ্যতায়ও খাদির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ সালে পর্যটক মহান আলেকজান্ডার ভারত উপমহাদেশের খাদির কথা উল্লেখ করেন। এছাড়া চীনা পরিব্রাজক ইয়ং তাং বাংলার সূক্ষ্ম খাদির ভূয়সী প্রশংসা করেন।

টাঙ্গাইল :মুর্শিদাবাদ থেকে এই বঙ্গে এসেছে টাঙ্গাইলের তাঁতির পূর্বপুরুষরা। একসময় তারা ধামরাইতে ছিল। সেখান থেকে টাঙ্গাইলে থিতু হয়েছে। বর্তমানে টাঙ্গাইলের তিন থানার ৩০টি গ্রামে হস্তচালিত তাঁতে কাপড় বোনা হয়। এই গ্রামগুলো হলো—কালিহাতি থানার সহদেবপুর, বাংরা, কোকডহরা, উতরাইল, টেরকি ও পাঠন—টাঙ্গাইল সদর থানার সুরুজ, বড়রিয়া, গোসাই জোয়াইর, নেগি জোয়াইর, ভুকতা, ভাতকুড়া, তারোটিয়া, বাজিতপুর, বেড়াই ও গাড়াইল, আর দেলদুয়ার থানার পাতরাইল, চণ্ডী, নলসোধা, ভাবকি, চরপাড়া, মঙ্গলহোড়, চীনাখোলা, বড়টিয়া, দেওজান, গাদতলা, টেগুড়ি, বান্দাবাড়ি ও ডুমুরিয়া। তার মধ্যে কিছু কিছু গ্রাম ‘বিশেষ শাড়ি’ বোনার জন্য বিখ্যাত। আগে টাঙ্গাইল শাড়ি সবার কাছে ‘টাঙ্গাইল বিটি শাড়ি’ নামে বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। সেখানকার বসাকরা অতীতে হাতে কাটা ৩০০-৪০০ কাউন্ট সুতোয়ও কাপড় বুনেছেন।

২০০১ সালের জরিপ অনুযায়ী, টাঙ্গাইলে পিটলুম ছিল ২৭,৬৮২টি। বর্তমানে এর সঠিক পরিসংখ্যান জানা যায় না। তবে প্রতি বছর দ্রুতহারে কমছে ঐতিহ্যবাহী এই তাঁত। যার হার কমপক্ষে ৫ পার্সেন্ট হবে। উল্লেখ্য, বুননে জ্যাকার্ড পদ্ধতি সংযোজনের কৃতিত্ব ব্রিটিশদের। ব্রিটিশ আমলে ন্যাশনাল কোম্পানিই এর উদ্ভাবক।

বেনারসি :কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, পাণিনির রচনা এবং আরো পরে ফ্রাঁসোয়া তেভারনিয়েরের বিবরণেও বেনারসের বস্ত্রবয়ন শিল্পের উল্লেখ মেলে। তেভারনিয়ের বেনারসকে ‘প্রাচ্যের এথেন্স’ আখ্যা দেন। এরপর নানা উত্থান-পতন সত্ত্বেও আজও স্বমহিমায় বিরাজমান বেনারসি শাড়ি। বলে রাখা প্রয়োজন, এই শাড়ির ডিজাইন এবং মানোন্নয়নে মোগলদের অবদান অনস্বীকার্য। ভারতের সীমানা ছাড়িয়েছে এই বেনারসি শাড়ি। বাংলাদেশে এই শিল্প পরিযায়ী পরিস্থিতি থেকে এ মাটিরই হয়ে গেছে। একে লোকজ শিল্পের যথার্থ অভিবাসন হিসাবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। এখানে যেমন বোনা হতো, তেমনি বেনারস থেকেও কাপড় এনে বিক্রি করা হতো। এই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

আদিবাসী বয়নশিল্প :পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আদিবাসীদের বয়ন বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তারা মূলত কোমরতাঁত বা ব্যাকস্ট্র্যাপ লুমে কাপড় বুনে থাকে। আমাদের দেশের আদিবাসীরা এর বাইরে নয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো—তাঁত বোনে কেবল নারীরা, পুরুষরা নয়। তবে পাহাড়ের আদিবাসী আর সমতলের আদিবাসীদের বয়নেও পার্থক্য রয়েছে—সেটা বয়নপদ্ধতিতে। পাহাড়ের নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীরা যে কোমরতাঁত ব্যবহার করে, তার একপ্রান্ত একটি খুঁটির সঙ্গে আটকানো থাকে। অন্যপ্রান্ত বয়নশিল্পীর কোমরে আবেষ্টন করা থাকে। অন্যদিকে সমতলের নৃ-গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। কারণ তারা কাপড়ের ওপর বসে বোনে। তাদের কোমরে একপ্রান্ত বাঁধা থাকে না। এই রীতি দেখা যায় আমাদের দেশের গারো সম্প্রদায়ের মধ্যে।

বাংলাদেশের পাবর্ত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতেই মূলত ১০ ভাষাভাষির ১১টি নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় রয়েছে রাখাইন জনগোষ্ঠী। এরা প্রত্যেকেই কোমরতাঁতে কাপড় বুনে থাকে। পাবর্ত্য চট্টগ্রামের নৃ-গোষ্ঠীগুলোর প্রত্যেকের বয়নপদ্ধতি এক হলেও তাঁতের মাপ, বয়ন-নকশা আলাদা। প্রত্যেক গোষ্ঠীর বয়ন স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। তারা বস্ত্রবয়ন করে মূলত নিজেদের প্রয়োজনেই।

চাকমা সম্প্রদায়ের বয়নে ‘আলম’ বিশেষ ভূমিকা রাখে। আলমকে বস্তুত তাদের মোটিফ আর ডিজাইনের অভিধান বলা যেতে পারে। কারণ একটি আলমে চাকমা সম্প্রদায়ের পোশাকে ব্যবহূত সব মোটিফ আর ডিজাইনে বোনা হয়। এটা তারা রেখে দেয় পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। এভাবে টিকে থাকে বয়নের পরম্পরা। চাকমা পুরুষদের পোশাক বলতে গেলে বৈচিত্র্যহীন। এরা জামা (জুন্নাছিলুম), পাগড়ি (খবং) এবং ধুতি জাতীয় কাপড় পরে থাকে। 

মারমা মেয়েদের প্রধান পোশাক থামি বা থুবুই। নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী নকশায় থামি বোনা হয়। থামি নিম্নাংশে পরা হয়। আর ঊর্ধ্বাংশের পোশাক বেদাই আঙ্গি। এটা মূলত বক্ষবন্ধনী। পুরুষরা মোটা কাপড়ের লুঙ্গি এবং একাধিক পকেটযুক্ত কলারবিহীন জামা পরে। অন্যদিকে ত্রিপুরা মেয়েরা পরে রিনাই; এর দৈর্ঘ্য ৪.৫ হাত এবং প্রস্থ ২.৫। রিনাই-এ চাকমাদের পিননের মতো আঁচল থাকে না, তবে ওপরে ও নিচে চওড়া পাড় থাকে। রিনাই-এর জমিন সাধারণত লাল এবং পাড় কালো রঙের হয়। ত্রিপুরা নারীদের বক্ষবন্ধনীকে বলা হয় রিসা। এতে কোনো সেলাই থাকে না, দৈর্ঘ্যে ৩ হাত এবং প্রস্থে ১ হাত বা আধা হাত। রিসায় নানান রঙের জমিনের ওপর পাখি, প্রজাপতি, ফুল, লতাপাতার নকশায় সমৃদ্ধ বর্ডার থাকে। আঁচলের দুই প্রান্তে অনেক সময় পুঁতির ঝালর যুক্ত থাকে। বয়স্ক ত্রিপুরা মহিলারা মাথায় সাদা কাপড় বাঁধে। পুরুষরা ধুতি ছাড়াও নিজেদের তৈরি গামছা পরে থাকে। আর মাথায় পাগড়ির মতো সাদা কাপড় বেঁধে রাখে।

ম্রো মেয়েরা ওয়াংক্লাই আর ছেলেরা দং পরে। ওয়াংক্লাই প্রস্থে মাত্র ৯ ইঞ্চি। এটা কোমরে জড়িয়ে রাখে। মেয়েদের কোমরের মাপ অনুযায়ী দৈর্ঘ্যের মাপ নির্ধারণ করা হয়। তবে ম্রো মেয়েরা বক্ষবন্ধনী পরে না। পরিবর্তে প্রয়োজনে ওয়ানচা নামে চাদর জড়িয়ে রাখে। দং আসলে নেংটির মতো একটি কাপড়। কোমরে জড়ায় পুরুষরা। আর ব্যবহার করে তাপুং।

তঞ্চঙ্গ্যা নারীরা এখনো পর্যন্ত পিনন ও খাদি ছাড়া ঊর্ধাঙ্গে জুন্নাছিলুম ও কোমরবন্ধনী হিসেবে ফা-ধরি ব্যবহার করে। জুন্নাছিলুমের গলায় ও কাঁধে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা থাকে। ফা-ধরি আসলে বেল্টের মতো দেখতে কোমরবন্ধনী। এর দুই প্রান্তের রঙিন সুতোয় কারুকাজ করা থাকে। তবে এদের পিনন চাকমাদের পিননের চেয়ে চওড়ায় কম। নারীরা এছাড়া মাথায় খবংয়ের মতো দেখতে পাগড়ি পরে।

নদীমাতৃক দেশ এই বাংলাদেশ, উর্বরা এই মাটি। মাটির টানে, শেকড়ের টানে আমাদের এখনো অন্যতম জীবিকা তাঁত। সেই বৃহত্তর ঢাকার—মসলিন, জামদানি, বেনারসি; নরসিংদী, আড়াইহাজার, কুমিল্লার—লাল সালু, গামছা, লুঙ্গি, শাড়ি; ঘোড়াশাল পলাশের—চওড়া বহরের সুতি কাপড়; কুমিল্লার—খাদি; সিরাজগঞ্জের—গামছা, লুঙ্গি, শাড়ি, আদি মলমল; চাঁপাইনবাবগঞ্জের—সিল্ক অথবা এন্ডি; টাঙ্গাইলের—তাঁতের শাড়ি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের বৈচিত্র্যময় পোশাকের সম্ভার আমাদের গর্ব। তাঁত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যশোর, কুষ্টিয়া এবং আরো অন্যান্য স্থানে। আমরা এখন বলি Save The Handloom. এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের, ধরে রাখার দায়িত্ব পরবর্তী প্রজন্মের। 

 

লেখক : ফ্যাশন ডিজাইনার, ভাইস প্রেসিডেন্ট, এফডিসিবি