জ ল বা য়ু ও খা দ্য নি রা প ত্তা

জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের কৃষি

আর্থ-সামাজিক নানা খাতে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি অসামান্য। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের অগ্রগতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বিশ্ববাসীর। তবে বাংলাদেশের উন্নয়নে এখনও নানাবিধ সক্রিয় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা উল্লেখযোগ্য দুটি বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের জন্য।

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা এখনও ব্যাপকভাবেই নির্ভর করে কৃষি উত্পাদনের ওপর। দেশটির মোট শ্রমশক্তির এখনও প্রায় ৪৫ পার্সেন্ট এই কৃষি খাতে যুক্ত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাংলাদেশের মোট জিডিপি’র ১০.৪ পার্সেন্ট অবদান কৃষির। জিডিপি-তে কৃষির অবদান দিন দিন কমছে। ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ৩৩.০৭ পর্যাপ্ত। জিডিপিতে কৃষির অবদান কমে যাওয়া অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আশঙ্কার  কিছু নয়, কিন্তু মোট শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেক যে খাতটিতে সম্পৃক্ত, জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে সেই খাতের অবদান মাত্র ১০ পার্সেন্ট-এর মতো হওয়া কাঙ্ক্ষিত নয়। আশঙ্কা করার মতো অনেককিছু আছে কৃষির অবদান কমে যাওয়ার কারণগুলো অনুসন্ধান করলে। এর একটা অন্যতম কারণ, কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়া, বছরে প্রায় ১ পার্সেন্ট হারে কমে যাচ্ছে আমাদের কৃষিজমি। দ্রুত নগরায়ন, অকৃষি খাতে চলে যাওয়া ছাড়াও কৃষিজমি কমে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে, বিশেষ করে নদী ভাঙনের ফলে, উপকূলীয় এলাকার লাখ লাখ মানুষ নিজেদের বাড়ি-ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, এদের প্রায় সবাই কৃষি থেকে অন্য পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করেছে। এই সামগ্রিক বিষয়গুলো সংকট তৈরি করেছে কৃষির জন্য, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্যও যা হুমকিস্বরূপ।।

বাংলাদেশের মতো দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং বিপদাপন্ন দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী কার্বন, আর যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু সেই কার্বন উদ্গীরণের হার ১৭.৬২  মেট্রিক টন, রাশিয়ায় ১২.৫৫ মেট্রিক টন এবং চীনে ৬.৫২ মেট্রিক টন, অথচ বাংলাদেশে মাথাপিছু কার্বন উদ্গীরণের হার মাত্র ০.৩৭ মেট্রিক টন! এটা বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণিত যে, ধনী দেশগুলোর ভোগবাদী মানসিকতা এবং ভোগবাদী আচরণের নির্মম শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো। খুব সহজেই আমরা বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো উপলব্ধি করতে পারছি। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন  বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা এক থেকে দেড় ডিগ্রি বাড়বে এবং এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রায় ১৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হবে—তার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা!  জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান ২০৫০ সালের মধ্যে ৬.৮ পার্সেন্ট নিচে নেমে যেতে পারে!

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাস্তচ্যুতির ঘটনা বাংলাদেশে খুব সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশল হিসাবেও অনেক সময় এই বাস্তুচ্যুতি ঘটে বলে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১১ থেকে ২০৫০-এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৯৬ লাখ মানুষ জলবায়ুতাড়িত বাস্তুচ্যুতির শিকার হবে। এই একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ কারণে দেশের দারিদ্র হার ১৫ পার্সেন্ট বেড়ে যেতে পারে। জলবায়ু উদ্বাস্তু বা বাস্তুচ্যুতি বাংলাদেশের জন্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের কৃষির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মোট আবাদযোগ্য ভূমির ৩০ পার্সেন্ট উপকূলীয় এলাকায়। গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০৩০ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রের উচ্চতা ৩০ থেকে ৫০ সে:মি: বাড়লে উপকূলীয় এলাকার ৩ পার্সেন্ট থেকে ৬ পার্সেন্ট কৃষিজমি সমুদ্রে তলিয়ে যাবে। এর ফলে প্রায় ৩ কোটি ৫ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুতির শিকার হতে হবে। ইতিমধ্যে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ লবণাক্ততায় আক্রান্ত, ২০৫০ সালে প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ লোক লবণাক্ততায় আক্রান্ত হবে। প্রতি বছর ৬ লাখ ৫৯ হাজার মেট্রিক টন চাল উত্পাদন কমে যেতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বাড়ছে। এসব ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় ফণী। সরকারি হিসাব অনুযায়ী এই ঝড়ের ফলে প্রায় ৩৯ কোটি টাকার শস্য নষ্ট হয়েছে। এই শস্যগুলো আর কিছুদিনের মধ্যেই কৃষকের ঘরে তোলার কথা ছিল।  দেশের ৩৫টি জেলার ২০৯টি উপজেলায় প্রায় ৬৩,০০০ হেক্টর জমির ফসল এই ঝড়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলত ধান, শাক-সবজি, ভুট্টা, সুপারি ও পাট শস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয় এই ফণীর ফলে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা প্রায় ১৩,৬৩১ জন। 

তবে আশার কথা হলো—জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক এসব প্রভাবের সঙ্গে সংগ্রাম-লড়াইটা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে আমাদের কৃষক সমাজের। সরকারি- বেসরকারি নানা উদ্যোগ এক্ষেত্রে কৃষকের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা নিজেরাই উদ্ভাবন করছেন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার নানা কৌশল।

উপকূলীয় জেলা ভোলার আয়তন দিনের পর দিন ছোট হয়ে আসছে। নদী ভাঙনের ফলে জেলার কৃষক হারাচ্ছে কৃষিজমি। ২০০১ সালের আদম শুমারিতে ভোলার মোট আয়তন উল্লেখ করা হয়েছে ৩৭৩৭.২১ বর্গ কিলোমিটার, অন্যদিকে ২০১১ সালের আদম শুমারিতে এর আয়তন উল্লেখ করা হয়েছে ৩৪০৩.৪৮ বর্গ কিলোমিটাির। অর্থাত্ ১০ বছরে ভোলার আয়তন কমে গেছে প্রায় ১২৮ বর্গ কিলোমিটার। জেলাটি দেশের  পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর মধ্যে একটি হিসাবে চিহ্নিত। জেলার অধিকাংশ মানুষের জীবিকার মূল উত্স কৃষি এবং মত্স্য খাত। নদী ভাঙনের ফলে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত নানা কারণে মত্স্য খাত থেকে নিশ্চিত আয়ের পথও নানাভাবে বাধাগ্রস্ত। জীবিকার জন্য তাহলে কী করা যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুুঁজে টিকে থাকার, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার বেশকিছু উপায় অবলম্বন করছেন জেলার কৃষক ও জেলেরা। সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থা এক্ষেত্রে কৃষকদের ও জেলেদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় মূলত দুটো ক্ষেত্রে কাজ করছে কৃষক ও জেলেরা। একদিকে তারা পরিবেশবান্ধব এমন কিছু কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, যেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনে ভূমিকা রাখছে, অর্থাত্ পরিবেশের ক্ষতি যথাসম্ভব কমিয়ে এনে কৃষি উত্পাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে নানা বিকল্প উপায়, বিশেষ করে বিকল্প জীবিকার উপায় তারা কাজে লাগাচ্ছেন জলবায়ু অভিযোজনের কৌশল হিসাবে।

জলবায়ু প্রশমনের কৌশলগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘জাদুর ফাঁদ!’ দেশজুড়ে সবজি চাষিরা সবজির খেতে পোকার আক্রমণে অস্থির। পোকার হাত থেকে সবজি বাঁচাতে কৃষকেরা বিভিন্ন বিষ ব্যবহার করে থাকেন। এইসব বিষ পোকা ধ্বংস করে দেওয়ার পাশাপাশি নানাভাবে ফসলের, কৃষির এবং মানুষের ক্ষতি করে থাকে। ক্ষতি হয় পরিবেশের তথা জলবায়ু পরিবর্তনের দায়ী বিভিন্ন রাসায়নিকের ব্যবহার এতে করে বাড়ে। ফসলের জন্য কিছু  বন্ধু পোকা আছে, যেগুলো থাকলে ফসল ভালো হয়, সবজি চাষে ব্যবহূত বিষ সেইসব বন্ধু পোকাও মেরে ফেলে, এই বিষ মাটির উর্বরতা কমিয়ে দেয়, এই বিষ জমিতে ব্যবহারের সময় আমাদের শরীরে প্রবেশ করে, ফলে আমাদের নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।  এইসব সমস্যা থেকে সমাধানের জন্য কৃষকেরা ব্যবহার করছেন‘জাদুর ফাঁদ।’ আসলেই এই যন্ত্র জাদু জানে! এর ভালো নাম ‘সেক্স ফেরোমন।’ খুব সস্তা এই যন্ত্রটি খেতের মাঝখানে রাখলে বিষ ব্যবহার না করলেও পোকা  ধ্বংস হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে, সকল পুরুষ ও স্ত্রী পোকা একজন আরেকজনকে তাদের সুগন্ধের মাধ্যমে আকর্ষণ করে বা কাছে টানে। গন্ধের টানে এক পোকা আরেক পোকার কাছে আসে। জাদুর ফাঁদে ঐ গন্ধসহ একটি যন্ত্রকে একটি প্লাস্টিকের বোতল বা বয়ামে রাখা হয়, আর সেখানে রাখা হয় সাবানের পানি। গন্ধের আকর্ষণে পোকা যখন ঐ বোতলে আসে—তখন সে ঐ সাবান পানিতে আটকে যায়। এই ফাঁদ ব্যবহার করলে জমিতে কোনও বিষ দিতে হয় না,  খরচ অনেক কম।

ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার উত্তর মাদ্রাজ গ্রামের সবজি চাষি ওমর ফারুকের অভিজ্ঞতার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। অতিরিক্ত বিষ ব্যবহার করতে করতে বিরক্ত হয়ে ফারুক বেগুন চাষ ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি জানালেন, তার ৪০ শতাংশ বেগুনের জমিতে আগে ১৫,০০০ টাকার মতো বিষ ব্যবহার করতেন, অথচ সেই একই জমিতে জাদুর ফাঁদ ব্যবহার করতে তার খরচ হয় মাত্র ১,৬০০ টাকার মতো!

বাংলাদেশের কৃষি, বিশেষ করে ধান চাষ ব্যাপকভাবে সেচনির্ভর। প্রতি বছর জমিতে সেচ করতে গিয়ে আমাদের প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই সেচ করতে গিয়ে অনেক সময় আমরা প্রয়োজনেরও বেশি পানি সেচ করে ফেলি, ফলে প্রচুর পানির অপচয় হয়। আর এভাবে পানির অপচয় করতে করতে আমরা দিন দিন পানির সংকট তৈরি করছি। কিন্তু জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য পানির অপচয় রোধ করার খুব সহজ একটি উপায় আছে, খুব সহজ ও খুব সস্তা এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করে আমরা পানির অপচয় রোধ করতে পারি। একটি প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে একজন কৃষক নিজেই এই যন্ত্রটি তৈরি করে ফেলতে পারেন। এর জন্য লাগে ৫ সেন্টিমিটার গোল এবং ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা একটি পাইপ। পাইপটির চারপাশে ছোট ছোট কিছু ছিদ্র করতে হয়, জমিতে বিভিন্ন প্রান্তে, সাধারণত চার কোণায় চারটি পাইপ স্থাপন করতে হয়। মাটির নিচে থাকবে ২০ সেন্টিমিটার এবং মাটির ওপর থাকবে ১০ সেন্টিমিটার। জমিতে সেচ  দেওয়ার পর এই বোতল পরীক্ষা করতে হবে। যদি বোতলের ৫ সেন্টিমিটারের ওপরে পানি থাকে, তাহলে জমিতে সেচ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, আর ৫ সেন্টিমিটারের নিচে পানি চলে গেলে সেচ দিতে হবে। এই পাইপ ব্যবহার করলে জমিতে ঠিক পরিমাণমতো সেচ দেওয়া যায় এবং পানির অপচয় কমে।

দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে বীজ সংরক্ষণ করে রাখা একটা কঠিন কাজ। অনেক সময় বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বীজ নষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া ভালো বীজ বাছাই করাও একটা কঠিন কাজ।  ভালো বীজে ভালো ফসল, এ কথা আমরা সবাই জানি। ভালো মানের বীজ ছাড়া কোনোভাবেই ভালো ফসল আশা করা যায় না। ধান চাষের ক্ষেত্রে এখনও অধিকাংশ জাতের ধানের বীজই আমরা কৃষক থেকে সংরক্ষণ করি এবং পরে জমিতে চাষ করি। কিন্তু মুশকিল হলো—চাষ করার সময় ভালো বীজের পাশাপাশি অনেক সময় আমরা খারাপ বীজও বপন করে ফেলি। কিন্তু সহজেই আমরা ভালো ও মন্দ বীজ আলাদা করতে পারি। বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর উপজেলার একটি গ্রামের নাম মারিয়া। এই গ্রামের নারীরা ভালো বীজ চেনার একটি সহজ উপায় আবিষ্কার করেছেন। গ্রামের নামের সঙ্গে মিলিয়ে এই পদ্ধতির নামকরণ করা হয়েছে মারিয়া মডেল। পদ্ধতিটি খুব সহজ। একটি বালতিতে ৪-৫ লিটার পানি নিয়ে তাতে একটি ডিম ছেড়ে দিতে হবে। এরপর এই পানিতে ১ লিটার লবণ মিশাতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত ডিমটি ওপরে ভেসে না উঠে ততক্ষণ পর্যন্ত তাতে লবণ মেশাতে হবে। ডিমটি পানির ওপরের দিকে ভেসে উঠলে লবণ মেশানো বন্ধ করে তাতে যে বীজগুলো জমিতে বপন করার জন্য রাখা হয়েছে—সেগুলো দিতে হবে। কিছুক্ষণ পর দেখা যাবে কিছু বীজ পানির ওপরের দিকে ভেসে উঠেছে। এই ভেসে ওঠা বীজগুলো ফেলে দিতে হবে। এগুলো মন্দ বীজ। বাকি বীজগুলো ভালা। ভালো বীজগুলো রোদে শুকিয়ে জমিতে বপন করার জন্য সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। পানিতে ভেসে ওঠা বীজগুলো দেখতে ভালো মনে হলেও এগুলো বন্ধ্যা এবং জমিতে বপন করলে এগুলো থেকে চারা গজাবে না। বীজগুলো সংরক্ষণেরও একটি পদ্ধতি আছে। রোদে শুকানো বীজ একটি বোতলে নিমপাতা কিংবা তামাক পাতাসহ রেখে দিতে হবে। বোতলে যেন বাতাস ঢুকতে না পারে।  এভাবে সংরক্ষিত বীজ পরে জমিতে বপন করলে তা থেকে ভালো চারা ও ফসল আশা  করা যায়।

এমন একটি উপায় হলো মিনি হ্যাচারি। মিনি হ্যাচারি এমন একটি স্থানীয় কৌশল, যা ধানের তুষ ব্যবহার করে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটায়। একটি মিনি হ্যাচারি ইউনিট কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার ডিমের ধারণক্ষমতার হতে পারে। ছোট আকারে, খুব ছোট একটি ঘরে এই হ্যাচারি স্থাপন করা যায়। মিনি হ্যাচারি মালিকরা ডিম কিনে ছানা উত্পাদন করেন। বাংলাদেশে হাঁস পালন খুব সহজ, যেহেতু এই দেশে প্রচুর পানির উত্স আছে। কিন্তু বাচ্চা পাওয়া একটা বেশ কঠিন কাজ। মিনি হ্যাচারি এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। এটি বিকল্প একটি জীবিকার উত্সও বটে।

এরকম আরও অনেক কৌশল ইতিমধ্যে আমাদের কৃষক, জেলেরা আয়ত্ব করে ফেলেছেন, প্রয়োগ করছেন। এই কৌশলগুলো দেশের অন্যান্য এলাকার জন্যও প্রায় সমানভাবে ব্যবহার উপেযোগী। এই কৌশলগুলো ব্যবহার করা গেলে পরিবেশ রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও কৃষকও উপকৃত হতে পারেন। আর যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তন অনিবার্য এক বাস্তবতা, এর নেতিবাচক প্রভাবও তাই অনিবার্য বাস্তবতা। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই কৃষি ও কৃষকের জন্য নানা বিকল্প নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। ভাবতে হবে বিকল্প নানা জীবিকার উপায়ের কথাও। আর তখনই কেবল পরিবর্তিত সকল পরিস্থিতিতে অটুট থাকবে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা। 

 

লেখক : উন্নয়ন কর্মী