প্রতিষ্ঠাবার্ষিক

দৈনিক ইত্তেফাক :সাহসের সমাচার

যেদিন আমাদের বাড়িতে প্রথম ইত্তেফাক নেয়া শুরু হলো, সেদিনের কথা আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। ইত্তেফাকের প্রতিটি সংবাদ প্রায় দুবার করে পড়েছিলাম। আজোব্দি সেই ১৯৭৬ সাল থেকে একদিনের জন্যেও ইত্তেফাক পড়া বাদ যায়নি। ইত্তেফাক না পড়লে মনে হয় সারাদিন কী যেন হয়নি। এটা কি শুধু অভ্যাস— নিজেকে প্রশ্ন করেছি, না তা নয়; বরং দেশ ও দেশের বাইরের প্রকৃত সংবাদ জানতে ইত্তেফাকের কোনো বিকল্প নেই। যত বড়ো হয়েছি ততই ইত্তেফাকের গুরুত্ব আমার সামনে উন্মোচিত হয়েছে। ইত্তেফাক এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসের জ্বলন্ত দলিল। প্রতিটি জনগণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে, ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে ইত্তেফাকের যুক্ততা আছে। ইত্তেফাক কখনো অযাচিত ক্ষমতাসীনদের প্রশংসা করেনি। জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি বরং প্রতিটি সংকটে থেকেছে অকুতোভয়। সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছে সংকট।

প্রায় ৭ দশক ধরে ইত্তেফাক সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, তাদের প্রতি অন্যায়-অবিচার আর বৈষম্যের ইতিহাস তুলে ধরেছে। এজন্যে ইত্তেফাক এত জনপ্রিয়, এত গুরুত্ববহ। ইত্তেফাকের ভাষাটিও মানুষের হূদয়ের। একটা ধ্রুপদী রীতি নিজস্ব বলার ভঙ্গি, যা অন্য কোনো কাগজে পাইনি। ইত্তেফাক দেশকে জাতিকে সমগ্রভাবে দেখে। সেখানে কান পাতলে বর্তমান ভবিষ্যত্ এবং অতীতের স্পন্দন শোনা যায়। ইত্তেফাক বাংলাদেশের মানুষের রুচি বদলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক একটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দিয়েছে। রেনেসাঁর প্রকৃত প্রতিনিধি ইত্তেফাক। মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং চিন্তার মুক্তির যে আন্দোলন তার মুখপাত্র দৈনিক ইত্তেফাক।

আমি আশির দশকে ঘনিষ্ঠ হই ইত্তেফাকের সঙ্গে লেখালিখির সুবাদে। মনে আছে, ১৯৮০ সালে কোনো এক ঈদ সংখ্যায় আমার একটা লেখা ছাপা হয়েছিল—আমি তখন যশোরে অর্থনীতি অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র। সারা শহরে একটা শোরগোল—যেখানে যাই সবাই বলে, তোমার লেখা ছাপা হয়েছে ইত্তেফাকে। সেই স্মৃতি আজো বহন করে চলেছি। আমার মতো পঞ্চাশ ষাট সত্তর এবং আশির লেখকগণ যাঁরা ইত্তেফাকে লিখতেন তাঁরা স্বীকার করবেন এই স্বর্ণযুগের কথা।

বাঙালির সবচে গৌরবের জায়গা স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ। ইত্তেফাক সেই গৌরবের অংশীদার। মুক্তিযুদ্ধের রক্ত লেগে আছে ইত্তেফাকের পাইকা টাইপে। রুশ দার্শনিক বাখতিন বলেছেন, ‘জীবনের প্রতিটি তাত্পর্য সংগ্রামের ভেতর দিয়ে অর্জনীয়।’ দৈনিক ইত্তেফাক আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে তাত্পর্য তৈরি করেছে, তার পেছনে আছে এক মহত্তম শ্রম।

কমিউনিটি জার্নালিজম বলতে যা বোঝায় ইত্তেফাক তার পথনির্মাতা। বাঙালি জাতির আত্মপ্রকাশের যে তাগিদ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্ফূরিত হয়েছিল তার নান্দনিক ও শিল্পীত বিকাশ ঘটেছিল দৈনিক ইত্তেফাকের হাতে। ইত্তেফাক যে গদ্যশৈলী তৈরি করেছে তা বাংলাভাষার শক্তিকে স্বচ্ছন্দ ও গতিশীল করেছে—নদীর যেমন বাঁক থাকে, ইত্তেফাকের ভাষাবিন্যাসও আমাদের এক স্রোতাবহ বাঁক নেয়া নদীর প্রতিরূপ। এখানে বলে রাখা ভালো—প্রাকৃত ভাষাই প্রকৃত ভাষা। ইত্তেফাক প্রাকৃত ভাষার পৃষ্ঠপোষক। ইত্তেফাক বাঙালির প্রকৃত ইতিহাস জানে এবং তার রূপরেখার মধ্যে সব সময় এই কথাটির সুর বাজে—বাংলাদেশ সমন্বয়ের দেশ। দৈনিক ইত্তেফাক নিশ্চয় সে-ই বিশ্বাস করে, যে কোনো দেশের পাঠক কেবলমাত্র নগরকেন্দ্রিক নয় বরং গ্রাম বন্দরেও তার অজস্র পাঠক আছে।

দৈনিক ইত্তেফাক চায়ের দোকান থেকে সচিবালয় পর্যন্ত সমাদৃত। আমি মনে করি, দৈনিক ইত্তেফাক তার ঐতিহ্য এবং সংবাদপত্রের সৌন্দর্য রক্ষা করে চলেছে। বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস রচনার প্রতিটি পর্যায়ে ইত্তেফাকের অনন্যসাধারণ ভূমিকার কথা উল্লেখ আছে এবং থাকবে। আমি মনে করি—যতটুকু সাহস ততটুকুই শিল্প ততটুকুই উত্তরাধিকার। ইত্তেফাক আমাদের সাহসের সমাচার, ঐতিহ্যের কর্ণধার।