পৃথিবীতে যুগে যুগে মানুষকে পথ দেখাইবার নিমিত্তে ত্রাতা আসিয়াছেন। সেই সকল ত্রাতাকে অনেক ক্ষেত্রেই ভোগ করিতে হইয়াছে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা আর কষ্ট। তাহার পরও আমরা দেখিতে পাই, ত্রাতাদের নিকট মানুষের প্রতি ভালোবাসার ফল্গুধারা কখনো কমে নাই। এমনি এক ত্রাতার আবির্ভাব হইয়াছিল আজি হইতে দুই সহস্রাধিক বত্সর পূর্বে। তিনি মহামতি যিশুখ্রিষ্ট। এই পৃথিবী যখন তসমাচ্ছন্ন ছিল, মহামতি যিশু আলোর দিশারি হইয়া পথ দেখাইয়াছেন মানবজাতিকে। কথিত আছে যে, বেথলেহেমের নভোমণ্ডলে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের আবির্ভাব দেখিয়া সুদূর প্রাচ্যের তিন জ্ঞানী ব্যক্তি মহাপুরুষ যিশুখ্রিষ্টের জন্মের বার্তা পাইয়াছিলেন। ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে, এই শিশুই একদিন মানবতার ত্রাতা হিসাবে আবির্ভূত হইবেন। অতঃপর মহামতি যিশু জন্মগ্রহণ করিলেন অত্যন্ত দীনবেশে, একটি গোশালায়। আজীবন দীনবেশেই জীবন যাপন করিয়া তিনি দরিদ্রকেই ধন্য করিয়াছেন। এই জন্য আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠে শুনিতে পাই—‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান। তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিষ্টের সম্মান।’
যিশুর ধর্ম-কর্ম-জীবন যুগ যুগ ধরিয়া পৃথিবীর মানুষকে অন্ধকার হইতে আলোর পথে, অসত্য হইতে সত্যপথের দিশা দিয়াছে—যাহা আজও প্রবহমান। আজ যিশুখ্রিষ্টের জীবন ও বাণী শুধু খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীই নহে, পৃথিবীর মুক্তিকামী শান্তিপ্রিয় মানুষকে আলোর পথ দেখাইতেছে। কেননা, খ্রিষ্টধর্মের মূল সুরটিই হইতেছে ‘ভালোবাসা’। ‘ঈশ্বর’ ও ‘ভালোবাসা’ দুইটি ধারণাই খ্রিষ্টধর্মে পাশাপাশি উচ্চারিত হয়। ঈশ্বরকে কেবল ভক্তি বা ভয় করাই নহে, তাহাকেও যে ভালোবাসা যায়, এবং বিনিময়ে ঈশ্বরের নিকট হইতে নিছক করুণা বা দয়া নহে, সেই ভালোবাসাই পাওয়া যায়, খ্রিষ্টপূর্ব সময়কালে এমনটি আমরা অন্য সকল ধর্মে সচরাচর দেখিতে পাই নাই। খ্রিষ্টীয় মতে, যিশু ঈশ্বরের পুত্র এবং জগতের সকল মানুষেরই ত্রাণকর্তা। শাসকের অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি শোষিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত মানুষের পক্ষ নিয়াছিলেন বলিয়া তত্কালীন শাসকের নির্যাতনের শিকার হইয়াছিলেন। মাত্র ৩৩ বত্সর বয়সে তাহাকে ক্রুশবিদ্ধ হইয়া জীবন উত্সর্গ করিতে হইয়াছিল। যেই সাতটি বাণী ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় তিনি উচ্চারণ করিয়াছেন, তাহার প্রথম কথাটিই হইল—ক্ষমা। তিনি বলিয়াছেন—‘পিতঃ, ইহাদিগকে (যাহারা তাহাকে ক্রুশবিদ্ধ করিয়াছে) ক্ষমা করো; কেননা ইহারা কী করিতেছে তাহা জানে না।’ এইভাবে জীবনাচরণে তিনি প্রেম, সেবা ও সৌহার্দের প্রতীক হইয়া উঠিয়াছিলেন। দুই সহস্র বত্সর পূর্বের যে বাণী নিয়া মহান যিশু আত্মাহুতি দিয়াছিলেন তাহার মাহাত্ম্য আজও সমানভাবে বিরাজিত।
বিশ্ব আজ অনেক বেশি সংঘাতময়। এখন অনেকের কাছেই আর ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ নহে। হানাহানি আর মতলববাজিতে ভরিয়া গিয়াছে গোটা বিশ্ব। এখনই সময় খ্রিষ্টের ক্ষমা ও মানবপ্রেমের দৃষ্টান্ত বিশ্বের কাছে তুলিয়া ধরিবার। খ্রিষ্টের শুভ জন্মতিথিতে পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করিতেছি এই মহতী পরমাত্মাকে। আমরা শুভ বড়দিনে বিশ্বের খ্রিষ্টধর্মের কোটি কোটি অনুসারীকে জানাই প্রীতি শুভেচ্ছা ও সম্ভাষণ।