প্র যু ক্তি
সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে ২০২১ সালে দেশে ফাইভ জি চালু করা হবে। ২০২৩ সালে সারা দেশ ফাইভ জি নেটওয়ার্কের আওয়াতায় আসবে। ফাইভ জি নেটওয়ার্ক মানে ব্রাউজিং স্পিড বাড়বে তা নয়। এর মানে হলো প্রতিটি বস্তু একটি আরেকটির সঙ্গে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে যাবে। আমার টিভি, এসি, ঘড়ি, মোবাইল, রিমোট, ফ্যান এককথায় সবকিছু একটির সঙ্গে অন্যটি যুক্ত থাকবে। শুধু তাই নয়, ওষুধও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কন্ট্রোল করা যাবে। যেমন :ইনসুলিন নেওয়া, হার্টের পেস মেকারসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত হবে
সৈয়দ আলমাস কবীর
বাংলাদেশে আইটি ইন্ডাস্ট্রির বয়স মোটামুটি ত্রিশ বছর। এ সময়ের মধ্যে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। গত ১০ বছরে আমাদের এই এগোনোটা অনেক দ্রুততর হয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে অবশ্যই সরকারের ভিশন-২০২১ বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। যে কারণে আইটি সেক্টরে সরকারের বিশেষ নজর ছিল এবং অভূতপূর্ব সফলতাও এসেছে। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, ২০০৮-০৯ সালের দিকে আইটি সেক্টরে সব মিলিয়ে ১ লাখের মতো মানুষ কাজ করত, আজকে সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখেরও বেশি। অর্থাত্, গত ১০ বছরে আইটি-সম্পৃক্ত মানুষ দশগুণ বেড়েছে। আরেকটা উদাহরণ দিতে পারি, ১০ বছর আগে আমাদের এক্সপোর্ট ছিল সব মিলিয়ে ৩০ মিলিয়ন ইউএস ডলারের কাছাকাছি। এখন সেটা ওয়ান বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। প্রচুর মানুষ আইটি সেক্টরে যুক্ত হচ্ছে। আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে ক্যারিয়ার গড়ছে। এ থেকে বোঝা যায়, আইটি সেক্টরে একটি বড়ো বিপ্লব সাধিত হয়েছে। এজন্য অবশ্যই সরকার বিশেষ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
ভবিষ্যতের জন্য আমরা চারটি সুপারিশ করতে চাই। প্রথমত, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। এ নিয়ে অনেক লেখালেখিও হচ্ছে। আমি শুধু এতটুকু বলতে চাই, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে। শুরুতেই আমাদের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য এখন থেকেই আইটি এক্সপার্ট জনশক্তি তৈরি করতে হবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চার বছর মেয়াদি আইটি কোর্স চালু করতে হবে। সেখানে ব্লক চেইন, রোবটিকসসহ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলায় যা যা দক্ষতা থাকা দরকার, ওসব বিষয়ে হাতে কলমে শেখানোর ব্যবস্থা থাকবে।
আমি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষদের বলব, আজ থেকেই এ উদ্যেগ নিন। কেননা, আজ থেকে চার বছর পর যে ছেলেমেয়েগুলো গ্র্যাজুয়েশন শেষ করবে, ততদিনে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব চলে আসবে। তখন তারা যেন দক্ষতার সঙ্গে আইটিবিষয়ক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে, সে টার্গেট নিয়ে আমাদের এগোতে হবে।
দ্বিতীয় সুপারিশ হলো, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এলে ব্যাপক সংখ্যক জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়বে। এটা হবেই, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যেমন রোবটিক্স সিস্টেম চালু হয়ে গেলে গার্মেন্ট সেক্টরে বিশাল একটা পরিবর্তন আসবে। অথবা যদি ড্রাইভার ছাড়া গাড়ি চালু করা হয়, তাহলে অনেক ড্রাইভার বেকার হয়ে পড়বে। এটা তখন রাষ্ট্রের জন্য বড়ো একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের কয়েকটি গার্মেন্ট রোবটিকস সিস্টেম চালু করার জন্য পুরোপুরি তৈরিও আছে। এক্ষেত্রে যেটা করতে হবে, সরকারকে একটি নীতিমালা করতে হবে যে শুরুতেই হুট করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে না। বরং অল্প অল্প করে ব্যবহার শুরু করতে হবে। যেমন প্রথম বছর দশ শতাংশ রোবট ব্যবহার করল। দ্বিতীয় বছর আরো দশ শতাংশ। এভাবে ধারাবাহিকতার সঙ্গে করলে একটা ভারসাম্য থাকবে। বোবটিকস প্রযুক্তির ফলে যে জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়বে, তাদের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে দক্ষ করে আবার কাজের সুযোগ করে দিতে হবে, নয়তো প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্য কোনো কাজে যুক্ত করে দিতে হবে। যাতে বেকারত্বের বিস্ফোরণ না ঘটে। যেমন, কেউ গার্মেন্টসে কাজ করে। তাকে কীভাবে আধুনিক মেশিন বা রোবটিকস প্রযুক্তি পরিচালনা করতে হয়, তা শেখাতে হবে। অথবা তাকে নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরির সুযোগ করে দিতে হবে। আমাদের দেশে নার্সের অনেক সংকট আছে। এভাবে সমন্বয় করে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
তৃতীয় সুপারিশ হলো, সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে ২০২১ সালে দেশে ফাইভ জি চালু করা হবে। ২০২৩ সালে সারা দেশ ফাইভ জি নেটওয়ার্কের আওয়াতায় আসবে। ফাইভ জি নেটওয়ার্ক মানে ব্রাউজিং স্পিড বাড়বে তা নয়। এর মানে হলো প্রতিটি বস্তু একটি আরেকটির সঙ্গে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে যাবে। আমার টিভি, এসি, ঘড়ি, মোবাইল, রিমোট, ফ্যান এক কথায় সবকিছু একটির সঙ্গে অন্যটি যুক্ত থাকবে। শুধু তাই নয়, ওষুধও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কন্ট্রোল করা যাবে। যেমন :ইনসুলিন নেওয়া, হার্টের পেস মেকারসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত হবে।
এ প্রযুক্তির সবচেয়ে বড়ো ঝুঁকি হলো, তখন অপরাধের ধরনও বদলে যাবে। নিত্যনতুন স্টাইলে খুব সহজেই অপরাধ করা যাবে। এখন অপরাধীরা আমার সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে। তখন সে চট্টগ্রামে বসে আমার পেস মেকার হ্যাক করে সহজেই আমাকে মেরে ফেলবে। অপরাধী আমার এসি বা টিভিটা বাস্ট করিয়ে দিল। ঘরে আগুন ধরিয়ে দিল। এমনভাবে নানা অপরাধ সংগঠিত করল। শুধু তাই নয়, না বুঝে নিজেরাও নিজেদের ক্ষতি করে ফেলতে পারে। যেমন :ফোন বাস্ট হয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে, তেমনি তখন এই প্রযুক্তিগত দুর্ঘটনা অনেক বেশি বেড়ে যাবে। এজন্য প্রযুক্তিতে দক্ষলোক তৈরির পাশাপাশি অপরাধ ঠেকানোর জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। এটাকে সংস্কার করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বিষয়আশয় যোগ করতে হবে। এ আইনের প্রয়োগ যথাযথ হবে, এটাও নিশ্চিত করতে হবে। একুশ সালের কিন্তু বেশি বাকি নেই। ফাইভ জি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়বে এই প্রযুক্তির ওপর। তখন যে বিস্ফোরণ ঘটবে, তা থেকে বাঁচতে এখনই সতর্ক-সচেতন হবে হবে। কার্যকরী উদ্যেগ হাতে নিতে হবে সরকারসহ দায়িত্বশীল মহলকে।
আমার জানা মতে, সরকার এখনো এইসব ঝুঁকির ব্যাপারে ভাবেনি। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, যারা প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, তাদের অনেকের এইসব সম্পর্কে ভালো জানাশোনাও নেই। সরকারের ফাইভ জি প্রজেক্টকে আমরা স্বাগতম জানাই। তবে এই ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে এখনই না ভাবলে নতুন প্রযুক্তি আমাদের জন্য বুমেরাং হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
চতুর্থ সুপারিশ হলো, আমাদের এখন এক্সপোর্ট বাড়ছে। এখন আমাদের এক্সপোর্ট এক বিলিয়নের মতো। খুব দ্রুত এটা পাঁচ বিলিয়নে উঠে আসবে। খুশির কথা হলো, আমাদের ফ্রি ল্যান্সাররা ভালো করছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক জরিপ মতে, ফ্রি ল্যান্সের দিক থেকে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। এই ঈর্ষণীয় অবস্থান ধরে রাখার জন্য আমাদের যা করতে হবে, তা হলো, ফ্রি ল্যান্সিংসহ আইটি ইন্ডাস্ট্রিকে তিন-চারটি ক্ষেত্র বাছাই করে ওইসব সেক্টরে সেরাদের সেরা হতে হবে। এখন আমরা সব ধরনের কাজই করছি। সবকিছুতেই অল্পবিস্তর ভালো করছি। কিন্তু এখন তো বিশেষত্বের যুগ। তাই অল্প কয়েকটি বিভাগে আমাদের সেরা হতে হবে। যেমন অ্যানিমেশন অথবা অ্যাপস তৈরি, কিংবা গেমস বানানো ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাত্, প্রযুক্তিসচেতন প্রতিটি মানুষই যেন জানে, অ্যাপস তৈরিতে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো আর কেউ নেই। অথবা অ্যানিমেশন বানাতে হলে ভালো কারা এই খোঁজ নিতে গেলে যেন সবার আগে বাংলাদেশের নাম চলে আসে। যেমন কেউ যদি গেমসের কথা বলে, তাহলে প্রথমেই কোরিয়ার নাম চলে আসে। কারণ কোরিয়া গেমসে তাদের অবস্থান সেরা করতে পেরেছে। তো এমনিভাবে বাংলাদেশকেও সব সেক্টরে ভালো করার পাশাপাশি এক-দুইটি সেক্টরে সেরাদের সেরা হতে হবে। তাহলে গ্লোবাল আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে আমাদের শক্ত অবস্থান গড়ে ওঠবে। এক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে ইন্ডাস্ট্রিকেই বেশি ভূমিকা রাখতে হবে।
লেখক : প্রেসিডেন্ট বেসিস
শ্রুতি লিখন :আল ফাতাহ মামুন