নদী বাঁচিলে বাঁচিবে বাংলাদেশ

সহযোগী একটি জাতীয় দৈনিকে বলা হইয়াছে বরিশালের কীর্তনখোলা হইতেছে ‘বুড়িগঙ্গা’। ইহার অর্থ, কীর্তনখোলা বুড়িগঙ্গার মতো এক করুণ পরিণতি বরণ করিতে যাইতেছে। যেই যৌবনদীপ্ত বুড়িগঙ্গা পারের ঢাকা নগরীকে একসময় লেখক টেইলর ভেনিসের সহিত তুলনা করিয়াছিলেন, যেই বুড়িগঙ্গা তীরে গড়িয়া উঠা ঢাকা নগর ছিল আরবীয়, পর্তুগিজ, ফরাসি, ওলন্দাজ, গ্রিক, আরমেনীয় ও ব্রিটিশদের প্রিয় স্থান, সেই শ্রীমতী বুড়িগঙ্গার রূপ-লাবণ্য-জৌলুস আর নাই। দখলে-দূষণে, শিল্প ও পলিথিনের বর্জ্যে তাহার ত্রাহিদশা। এখন দেখা যাইতেছে, দেশের অন্য নগরের প্রান্ত ঘেঁষিয়া বহিয়া চলা নদীগুলির অবস্থাও শোচনীয়। বুড়িগঙ্গার পথে কর্ণফুলীও। চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলীর পর এখন বরিশালের কীর্তনখোলার দুর্দশার খবর পড়িয়া আমাদের মাতম করিতে ইচ্ছা হয়। কারণ প্লাস্টিক বর্জ্যের পুরু স্তর রহিয়াছে ৪০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এই নদীর তলদেশে। পরিবেশবিদরা বলিতেছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে নদীর তলদেশ হইতে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ না করা হইলে নষ্ট হইবে ইহার জীববৈচিত্র্য। ইহাতে হুমকির মধ্যে পড়িবে বরিশালের সামগ্রিক পরিবেশ।

সম্প্রতি লঞ্চঘাট এলাকার নাব্য ফিরাইয়া আনিতে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করিতে গিয়া কীর্তনখোলার তলদেশে পলিথিন আর প্লাস্টিক বর্জ্যের পুরু স্তর জমিয়া যাওয়ার বিষয়টি নজরে আসে। যাত্রী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন কাজে ব্যবহূত এইসব বর্জ্য-আবর্জনা লঞ্চে কিংবা পন্টুনে বসিয়াই সরাসরি নদীতে ফেলা হয়! নৌবন্দরের টার্মিনাল এলাকা হইতে শুরু করিয়া নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় তিন হইতে চার ফুট এমনকি আট ফুট পর্যন্ত উচ্চতর আলাদা একটি স্তর তৈরি হইয়াছে। এই জন্য শুধু আইন করিয়া বা লঞ্চমালিকদের চিঠি দিয়া এই প্রবণতা বন্ধ করা যাইবে না, সকলের পূর্বে দরকার জনসচেতনতা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’ নাটকে পদ্মা-ইছামতীর জলস্রোতের দুঃখ-বেদনার কথা বিবৃত হইয়াছে। ‘ছিন্নপত্রাবলী’তেও মিলিবে অনুরূপ বক্তব্য। যেইখানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হইতেছে, বিশ্বে সুপেয় পানিসংকটকে কেন্দ্র করিয়া দক্ষিণ এশিয়ায় জলযুদ্ধ শুরু হইবার আশঙ্কা প্রবল; এমনকি ২০৩০ সালের পর হইতে পানি নিয়া এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায়ও ছড়াইয়া যাইতে পারে—সেইখানে আমরা স্বচ্ছ নদীর পানিকে এহেন অবহেলার মুখে ঠেলিয়া দিতেছি।

আমরা বরাবরই বলিয়া আসিতেছি নদী বাঁচিলে বাংলাদেশ বাঁচিবে। কিন্তু কে শোনে কাহার কথা! নদী ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা ও আয়োজন চলিতেই আছে। পলিথিনই একমাত্র বস্তু যাহার দ্বারা ধ্বংস হইয়া যাইতে পারে একটি দেশ। ইহা স্লো-পয়জন এবং ইহার মধ্য হইতে ‘বিষফেনোল’ নামক বিষ নির্গত হয়। ইহা নদনদীতে মত্স্য প্রজাতি ধ্বংসকারী, মাটির উর্বরাশক্তি নষ্টকারী এবং চর্মরোগ, ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের এজেন্ট। ইহাতে ব্যবহূত ক্যাডমিয়াম মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিভিন্ন উন্নত দেশেও নদী-সমুদ্রে এইরূপ বর্জ্য পাওয়া যাইতেছে, যাহা খাইয়া মত্স্য প্রজাতি ধ্বংস হইতেছে এবং সেই মত্স্য খাইয়া মানব জাতি অকাতরে প্রাণ হারাইতেছে। অতএব, বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী, কীর্তনখোলা যে নদীই হউক না কেন, তাহার পানি প্লাস্টিক ও পলিথিনসহ যে কোনো বর্জ্যমুক্ত রাখা জরুরি।