বাংলা চলচ্চিত্রের মান উন্নয়ন জরুরি

জয় পাল

বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে আমাদের অনেকেই চলচ্চিত্রকে বেছে নেই। জীবনের হাসি-আনন্দ, দুঃখ-বেদনা, আবেগ-অনুভূতি প্রতিটি জায়গা জুড়েই রয়েছে চলচ্চিত্রের কাহিনি-কথা। আদর্শ চলচ্চিত্র একদিকে যেমন দর্শক মনের ভাবাবেগকে জাগ্রত করে, অন্যদিকে দর্শক মনকে করে তুলে স্পর্শকাতর। চলচ্চিত্র শুধু চলচ্চিত্রই নয়, এ যেন জীবনচিত্র! কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, সাম্প্রতিককালের নির্মিত বাংলা চলচ্চিত্রগুলো ততটা সফলভাবে জীবনচিত্রের পরিচয় বহন করছে না। দর্শকের প্রাণ স্পর্শ করার ন্যায় বিশেষ কোনো উপাদানই যেন নেই নির্মিতব্য এই চলচ্চিত্র সমূহে। জীবনের বাস্তবতাকে গৌণ করে মনগড়া কাহিনি-কথাকে নিয়েই নির্মিত হচ্ছে এ সকল চলচ্চিত্র। ফলে দর্শকরা খুব সহজেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বাংলা চলচ্চিত্র থেকে। অনেকেই আবার ঝুঁকে পড়ছেন বিদেশি চলচ্চিত্রের দিকে!

সত্য বলতে, এ দশকের বাংলা চলচ্চিত্র অসফলতার হতাশায় আচ্ছন্ন। উন্নত রুচিসম্মত চলচ্চিত্র এদেশীয় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে খুব কমই তৈরি হচ্ছে। ফলে দর্শককে বারবার মুখ ফিরিয়ে নিতে হচ্ছে—চলচ্চিত্রের এরূপ বেহাল অবস্থা দেখে। চলচ্চিত্রের এই নাজেহাল দশার সঙ্গে আবার সম্পৃক্ত দেশের সিনেমা হলগুলোর দুর্দশাও। পর্যাপ্ত দর্শকের অনুপস্থিতিতে অনেক সিনেমা হল প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে এমন নজিরও দেশে কম নয়!

চলচ্চিত্রের এই বেহাল দশা দেখেও এর মান উন্নয়নে দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এবং দেশীয় বড়ো মাপের চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালকদের কোনোরূপ তত্পরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বাংলা চলচ্চিত্রের এই নাজেহাল অবস্থা যে কেবল এর শিল্পমানকেই ক্ষুণ্ন করছে তা নয়, বরং বহির্বিশ্বেও এর ভাবমূর্তিকে ক্রমশই নষ্ট করে চলছে।

বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাথমিক যুগে যেখানে সত্যজিত্ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রটি বিশ্বজয় করে অস্কার পুরস্কার নিয়ে এসেছে, সেখানে আজকের এই রুপালি পর্দায় বাংলা চলচ্চিত্রের এহেন করুণ অবস্থাই বা কেন!

চলচ্চিত্রের এই নাজেহাল অবস্থার জন্য প্রথমেই দোষারোপ করা যেতে পারে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযোজকদের খামখেয়ালি কাহিনি বা চিত্রনাট্য নির্বাচনকে। এদেশীয় চলচ্চিত্রে চিত্রনাট্যর আখ্যানভাগে প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেম-ভালোবাসার বড্ড ছড়াছড়ি! প্রেম-ভালোবাসার গণ্ডি পেরিয়েও যে সমাজের বিভিন্ন উপাদানকে কেন্দ্র করে হূদয় স্পর্শী চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব তা যেন নব্য প্রযোজকদের অবোধগম্য! তাছাড়া চলচ্চিত্রে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ত্রুটিপূর্ণ অভিনয়, অসংগতিপূর্ণ উপকাহিনির উপস্থিতি, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের অভাব, জনপ্রিয় তারকাদের অনুপস্থিতি, দর্শকের নিম্নমানের রুচিবোধকে প্রাধান্য, পরিচালকদের ভিত্তিহীন প্রতিযোগিতা ইত্যাদি বিষয়গুলো আজকের বাংলা চলচ্চিত্রের বেহাল দশার জন্য শতভাগে দায়ী। চলচ্চিত্রের এহেন করুণ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অচিরেই বাংলা চলচ্চিত্র বিশ্বের সম্মুখে তার ভাবমূর্তি হারিয়ে চরম অবহেলার নজিরে পড়ে থাকবে। তাই বাংলা চলচ্চিত্রের মান উন্নয়নে দেশীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বিশেষ সচেতনতা আবশ্যক। বিশেষত কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল চলচ্চিত্র যেন কোনোক্রমেই বাজারে মুক্তি পেতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। অন্যথায় আজকের বাংলা চলচ্চিত্র অন্ধকারের এই ভ্রান্ত পথচলা থেকে মুক্তি পাবে বলে আদৌ মনে হয় না।

n লেখক :শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট