আমার জীবন আমার সংগীত

দ্বিতীয় পর্ব

 

ডিসেম্বর এলেই আমার মনে পড়ে—আর এক ডিসেম্বর মাসে, ১৯৬৯ সালে আমি বেশ কিছু গান তৈরি করেছিলাম। তার মধ্যে নয়ীম গওহরের লেখা দুটি গানের একটি ছিল ‘পুবের ঐ আকাশে সূর্য উঠেছে/...জয় জয় জয়, জয় বাংলা’ এবং অন্যটি ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো...’। রেকর্ড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারিভাবে গান দুটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই গান দুটি তখন আর কেউ শুনতে পারেননি। তবে রেকর্ড হওয়ার মুহূর্তে যাঁরা সংগ্রহ করেছিলেন তাঁরা গোপনে বাজিয়ে শুনতেন, তাঁদের অনেকেই আমার কাছে গান দুটির প্রশংসা করেছেন।

অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমার সুর-সংগীত পরিচালনায় বেশকিছু গান রেডিও-টেলিভিশনে রেকর্ড করা হয়। সেই গানগুলি আমি প্রতিদিনই তখন বিভিন্ন স্থানে দল নিয়ে গাইতাম। এইসব গানে ফেরদৌসী রহমান, সৈয়দ আবদুল হাদী, মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, আঞ্জুমান আরা বেগম, এম এ হামিদ, আক্তার জাহান, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, জিনাত রেহানা ও খুরশীদ আলমসহ সেই সময়ের সকল শিল্পী বিভিন্ন সময়ে অংশগ্রহণ করতেন। একটি গানের কথা উল্লেখ করতে চাই: ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম/চলবে দিন-রাত অবিরাম’—টিভিতে ধারণকৃত এই গানটি প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনগণের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। কবি ফজল-এ-খোদা রচিত আমার সুর-সংগীত পরিচালনায় এই গানটি  সেই সময়ে সবার মুখে মুখে শোনা যেত। এর সঙ্গে আরো কিছু গান রেকর্ড করা হয়। আমি বিশেষভাবে পরিকল্পনা করে সুর করতাম; অনেক গানের ক্ষেত্রে সেই সুরের উপর কথা বসানো হতো। সেই সময়ের কয়েকটি গান—‘রক্তেই যদি ফোটে জীবনের ফুল/ফুটুক না ফুটুক না ফুটুক না—কথা: সৈয়দ শামসুল হুদা। ‘বন্ধু এবার তুলে নাও হাতে হাত’—কথা: কবি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। ‘আবার নতুন করে জানলাম/সন্ধিতে বন্দি ছিলাম’—কথা: মুহাম্মদ আসাফউদ্দৌলা। ‘আমার ঘরে আগুন জ্বেলেছ শান্তি নিয়েছ কেড়ে/সে আগুন আমি নেভাতে গেলেও শত বাধা আসে তেড়ে—কথা: কবি হাবীবুর রহমান।

আমার এই গানগুলি প্রতিদিনই বারবার টিভিতে দেখানো হতো, রেডিওতে বাজানো হতো। রেডিওতে রেকর্ড করা এবং টিভিতে ধারণকৃত গানগুলিতে এদেশের প্রথম সারির শিল্পীরা অংশ নিয়েছিলেন। শিশু-কিশোর-নবীন-প্রবীণ কণ্ঠশিল্পীদের নিয়েও আমি গান করেছিলাম। এইসব গান সে সময়ের একজন গুণী টেলিভিশন কর্মকর্তা মুস্তাফা মনোয়ার চিত্রায়ন করেছিলেন। চিত্রায়নে এক বিশেষ পদ্ধতিতে ডিজিটাল অ্যাফেক্ট দেওয়া হয়েছিল, তাতে টিভি-পর্দায় গানগুলি দেখে মনে হতো অসংখ্য মানুষ গান গাইছে।

দুটি গান সম্পর্কে বিশেষভাবে এখানে বলতে চাই—

গান-১:

পুবের ঐ আকাশে সূর্য উঠেছে

আলোকে আলোকময়

জয় জয় জয়, জয় জয় জয়

জয় জয় জয়, জয় বাংলা

গান-২:

জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো

এমন করে আকুল হয়ে আমায় কেন ডাকো

ইএমআই গ্রামোফোন কোম্পানি এই দুটি গান নিয়ে একটি রেকর্ড বের করে। সে সম্পর্কে ৬ মার্চ ১৯৭১-এ ভারতের দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ছবির নিচে। এর একটি ফটোকপি অনেক পরে আমার হস্তগত হয়, তাতে দেখতে পাই—বঙ্গবন্ধুর ছবির নিচে বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতি—‘ছয় দফা ছাড়বো না/আর/ছাড়বো না বাংলা ভাষা।’

সে সময়ে আমি আজকের বাংলাদেশ বেতার মানে ‘রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা-’য় কর্মরত ছিলাম। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন সবেমাত্র আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। রেডিওর শিল্পী চাকুরে আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করি। সেই সময় তাঁর সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে আমরা কথা বলার সুযোগ পাই। আমি দেখলাম, তিনি সংস্কৃতি অঙ্গনের সকলকে নাম ধরে ডাকছেন, আমাকেও নাম ধরে ডাক দেওয়ায় আমি অবাক হয়েছিলাম। তিনি আন্তরিকভাবে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।

অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে আমি একদিন রেডিওর বিপরীত দিকে শাহবাগ হোটেলের (আজকের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল) দোতলায় যাওয়ার জন্য লিফটের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তখন হঠাত্ করে তিনি লিফটের সম্মুখে উপস্থিত, আমার দিকে নজর পড়তেই আমার উদ্দেশে বললেন, ‘আজাদ জোরালো গান দরকার, ঐ গান কোথায়?’ আমি বললাম, ‘স্যার আমি জোরালো গান করবো।’ তিনি বললেন, ‘জয় বাংলা নিয়ে জোরালো গান করেন।’ লিফট এসে গেল, তিনি উঠলেন এবং আমাকেও ইশারা দিয়ে উঠতে বললেন। নেতার এই আন্তরিক ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম।

আমার মাথায় সেই মুহূর্ত থেকে চিন্তা শুরু হলো। ঢাকা রেডিওতে তখন বেশি সংখ্যক যন্ত্রসংগীতশিল্পী ছিলেন না। উদ্দীপনামূলক কয়েকটি গানের সুর রচনা করে রেখেছিলাম, যে গানে আমি ব্রাস-ব্যান্ডের কিছু সংগীতযন্ত্র ব্যবহার করতে চাইছিলাম। আমার জানামতে সেই যন্ত্রসংগীতশিল্পী ঢাকায় পাওয়ার সুযোগ ছিল না। এর কয়েকদিন পর আমি করাচি গেলাম; আমার সঙ্গে বন্ধু গীতিকবি নয়ীম গওহর ছিলেন। তাঁর আত্মীয় অভিনেত্রী রেশমা, রেশমার স্বামী পাকিস্তান টিভির জামান আলী খান— এই দম্পতির করাচির বাসায় গিয়ে উঠলাম। নয়ীম গওহর তাঁর কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। আমার সঙ্গে রেডিও, টিভি, সংগীত, চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি অঙ্গনের চেনাজানা মানুষের দেখা-সাক্ষাত্ শুরু হলো। অত্যন্ত জনপ্রিয় গুণী সংগীত পরিচালক দেবু ভট্টাচার্য নিজে এসে আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে গিয়ে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ালেন। এই হূদয়বান মানুষটির আন্তরিকতার কথা আমি এখনো স্মরণ করি।

একদিন আহমেদ উল্ল্যাহ সিদ্দিকীর সঙ্গে দেখা হলো, যিনি কিছুদিন আগেই রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা কেন্দ্রে চাকরি করতেন, সেখানেই তাঁর সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তিনি রেডিওর চাকরি ছেড়ে করাচিতে ইএমআই গ্রামোফোন কোম্পানির চাকরিতে যোগ দিয়েছেন; আমাকে জানালেন ইএমআই গ্রামোফোন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদ লতিফ যিনি আমার পূর্বপরিচিত তিনি আমাকে আমন্ত্রণ করেছেন। আমি সম্মতি জানালে তাঁর বাসায় আমার সম্মানে তিনি ডিনার আয়োজন করতে চান, আমার সুবিধামতো যে কোনো দিন সন্ধ্যায় হতে পারে। সেই অনুযায়ী একদিন সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় ডিনারে উপস্থিত হলাম। ডিনার টেবিলে তাঁর স্ত্রী রোজী লতিফ এবং রাশেদ লতিফ দুজনেই তাঁদের কোম্পানির ব্যানারে কিছু উদ্দীপনামূলক দেশের গান করার জন্য আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানালেন। আমি বললাম, গান করতে আমি আগ্রহী—তবে আমার পছন্দমতো যন্ত্রশিল্পীদের নিতে হবে। তাঁরা সানন্দে জানালেন, তাঁরা রাজি। প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হলো দুটি গান করব। আমি ঢাকা রেডিও থেকে ছুটি নিয়ে করাচি বেড়াতে এসেছি, ছুটি প্রায় শেষ হতে চলেছে। বাসায় ফিরে হারমোনিয়াম নিয়ে বন্ধু নয়ীম গওহরকে অনুরোধ করলাম কাগজ-কলম নিয়ে বসতে, আমার সুরে কথা বসানোর জন্য। নয়ীম গওহর বললেন, ‘আমি পরশু চলে যাব, এর মধ্যে

গান হবে?’ আমি বললাম, ‘বসেন সব হবে।’ তারপর সুরের উপর কথা বসিয়ে গান তৈরি হলো—‘পুবের ঐ আকাশে সূর্য উঠেছে আলোকে আলোকময়/জয় জয় জয়, জয় বাংলা’ এবং ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’।

নয়ীম গওহর ঢাকা ফিরে গেলেন। আমি করাচিতে মহড়া শুরু করলাম। গ্রামোফোন কোম্পানির কর্মকর্তারা আমার কণ্ঠে গান শুনে ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’ আমার কণ্ঠে রেকর্ড করতে বললেন। তাঁদের ধারণা—তাতে গানটি সুন্দর হবে। গুণী শিল্পী ফিরোজা (বেগম) আপা আমাকেই গানটি গাইতে অনুরোধ করলেন। আমি সবিনয়ে জানালাম, আমি প্যানেলে বসলে গানটি আরো সুন্দর হবে, আমি বহুকাল ধরে রেকর্ডিস্ট হিসাবে কাজ করছি।

আমার চাহিদা অনুযায়ী কণ্ঠশিল্পী ফিরোজা বেগম, সাবিনা ইয়াসমীন এবং সে সময়ে করাচিতে অবস্থান করা শিল্পী নাসির হায়দার, জিনাত রেহানা, কাজী এহসান, রোকসানা, আসাদুল হকসহ যন্ত্রশিল্পীদের নিয়ে গানের মহড়া চলতে থাকল। সারাদিন ধরে আমি যন্ত্রশিল্পীদের নিয়ে মহড়া দিলাম। সন্ধ্যার পর ‘পুবের ঐ আকাশে সূর্য উঠেছে...জয় জয় জয় জয় বাংলা’ গানটি বাণীবদ্ধ করা হলো। ইএমআই গ্রামোফোন কোম্পানির কর্মকর্তারা, যন্ত্রশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী উপস্থিত সকলেই আবেগ-আপ্লুত—সবাই গানটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু সারাদিনে একটি গান হলো, এর পরে সাতদিন যন্ত্রশিল্পীদের পাওয়া যাবে না; তাঁরা চলচ্চিত্রের গান রেকর্ডিং নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। আমি অনেক ভেবে পরের দিন উপস্থিত হলাম করাচি রেডিও ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের পরিচালক সৈয়দ জিল্লুর রহমানের কাছে। তাঁকে জানালাম আমাকে দুই-তিন দিনের মধ্যে ঢাকায় ফিরে যেতে হবে। এবং অনুরোধ জানালাম—যদি তিনি রেডিওর ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের স্টুডিও যন্ত্রশিল্পীসহ একদিন রেকর্ডিংয়ের জন্য দেন, তাহলে আমি আরেকটি গান  রেকর্ড করতে পারি এবং রেকর্ডটি বের হতে পারে। তিনি প্রথা ভেঙে আমাকে রেকর্ডিংয়ের জন্য স্টুডিও দিলেন। শুধু অনুরোধ করলেন—গানটি তাদের এক কপি রেডিওর জন্য দিতে হবে। মূল কপি আমি নিয়ে যেতে পারব। বিষয়টি কেউ জানবে না, সবাই ভাববে গানটি ট্রান্সক্রিপশনের জন্য হলো। এইভাবে সমবেত কণ্ঠে বাণীবদ্ধ হলো দ্বিতীয় গান ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’। পরের দিনই আমাদের রেকর্ড তৈরির সব ব্যবস্থা হলো। আহমেদ উল্ল্যাহ সিদ্দিকী সাহেব এবং আমি প্যানেলে বসে বাণীবদ্ধ করা গান দুটি বারবার শুনে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করলাম। তৃতীয় দিনেই রেকর্ড বেরিয়ে গেল। করাচিতে বসবাসকারী বাঙালিরা রেকর্ড শুনে অভিভূত। আমাকে তাঁরা অভিনন্দন জানাতে আরম্ভ করলেন। শিল্পী ফিরোজা বেগম বললেন, ‘এমন অসাধারণ গান, এত সুন্দর অর্কেস্ট্রাইজেশন যে হতে পারে তা আমি ভাবতে পারি না।’

কিন্তু রেকর্ড ব্যান্ড হয়ে গেল। ঢাকা থেকে কেউ লাগালাগি করেছে—এটা নাকি দেশভাঙার গান, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এ গান একটি ষড়যন্ত্র।

আমি ঢাকায় এসে হাতে পেলাম রেডিওর একটি পত্র, যাতে আমার কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কেন আমি করাচি গিয়ে বেআইনি কাজ করেছি? আমি কোনো জবাব দিলাম না। কিছু বললে চুপ করে থাকতাম। এদিকে বিভিন্ন স্থানে মঞ্চে, রেডিও, টেলিভিশনে সংগ্রামী গান, দেশের গান পরিবেশন করতে থাকলাম। মার্চের শুরুতে ‘পুবের ঐ আকাশে সূর্য উঠেছে...জয় জয় জয়, জয় বাংলা’ রেডিওতে বাজতে লাগল।

এভাবেই ৭ই মার্চ এসে গেল। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে পূর্ব বাংলার জনগণ একাত্ম হয়ে গেল—সে এক অভূতপূর্ব অনুভব-অনুভূতি। কোটি কোটি মানুষ একজনের ডাকে তাঁর অঙ্গুলি নির্দেশনায় চলার জন্য প্রস্তুত। টিভি, রেডিও সিনেমা হলে সবখানেই জাতীয় সংগীতের পরিবর্তে আমার গান বাজতে থাকল—‘পুবের ঐ আকাশে সূর্য উঠেছে আলোকে আলোকময়/জয় জয় জয়, জয় জয় জয়, জয় জয় জয়, জয় বাংলা’ এবং ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো/এমন করে আকুল হয়ে আমায় কেন ডাকো’ গান দুটি ডিজিটাল অ্যাফেক্টে চিত্রায়িত, ঢাকা টিভিতে বারবার দেখানো হচ্ছিল।

আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের ঐক্য না হওয়ায় সব আলোচনা রুদ্ধ হয়ে গেল। অবশেষে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রাতের অন্ধকারে পূর্ব বাংলায় যে গণহত্যার পরিকল্পনা—সবই আমরা অনেক প্রাণ বিসর্জনের পরে বুঝলাম।

আমাদের প্রবীণ নারী শিল্পীদের নিয়ে ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ  টিভিতে আমার একটি গান চিত্রায়ন হওয়ার কথা ছিল। এখন যেখানে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অফিস, সেই ভবনের নিচের তলায় তখন টিভি স্টুুডিও ছিল। সেইদিন আমরা গিয়ে দেখি অফিসে তেমন কেউ নেই। যাঁরা দু-একজন ছিলেন, তাঁরা আমাকে বাসায় চলে যেতে বললেন। সেদিন পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেই রাতে টিভিতে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত বাজানো হবে না। সেই ভয়াবহ রাতের ঘটনা শুরুর আগে আগে আমরা টিভিতে দেখলাম গান বাজছে—‘পুবের ঐ আকাশে সূর্য উঠেছে আলোকে আলোকময়/জয় জয় জয়, জয় জয় জয়, জয় জয় জয়, জয় বাংলা’ এবং এই গান শেষেই টেলিভিশন বন্ধ হয়ে গেল।

২৫ মার্চ ১৯৭১-এর মধ্যরাত এবং তারপরে কী ঘটেছিল তা এদেশ এবং বিশ্বের সব মানুষ জানে।

কারফিউ শেষ হলো, অফিস-আদালত চালু করার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের বুদ্ধিমতো চেষ্টা করতে লাগল। আমরা যারা রেডিওর চাকুরে তাদের উপর নজর রাখা হয়েছিল, বিষয়টি বুঝলাম যখন সিদ্ধেশ্বরীতে যে বাসায় আমি ভাড়া থাকতাম তার সামনে থেকে একটি মিলিটারির গাড়িতে আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো রাজারবাগের কোনো একটি অফিসে। আমাকে জেরা করা শুরু হলো—কেন জয় বাংলা গান করেছি?

উচ্চাঙ্গ সংগীতের হিন্দি বই পড়ার আশায় আমি হিন্দি শিখেছিলাম, সেই কারণেই হিন্দিতে আমি কথা বলতে পারতাম। যখন আমাকে গাড়িতে তোলা হয়, তখন থেকেই আমি হিন্দিতে কথা বলতে শুরু করলাম। রাজারবাগে আমার বুকে পিস্তল ধরে জেরা করা হচ্ছিল। হিন্দিতে বললাম, আমি বাংলা জানি না। তাই বাংলায় সব কথা বুঝি না। তবে জয় বাংলা গানে দেশ ভাঙার মতো কিংবা দেশের বিরুদ্ধে কিছু বলা হয় নাই—এটাই আমি জানি। আপনাদের সন্দেহ হলে রেডিওতে স্টেশন ডাইরেক্টরকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে পারেন। আমাকে সারারাত আটকে রাখা হলো।

স্টেশন ডাইরেক্টর সৈয়দ জিল্লুর রহমান, যিনি করাচি থেকে ঢাকা রেডিওতে বদলি হয়ে এসেছিলেন; আমার সম্পর্কে তাদের জানিয়েছিলেন, আমি একেবারেই বাংলা জানি না এবং ঐ গানে দেশের বিরুদ্ধে কিছু বলা হয়নি। পরের দিন সকালে আবার তিনি অনুরোধ করে বলেছিলেন, যেহেতু আমি বাংলা জানি না তাই আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলে রেডিওর সংগীতের অনুষ্ঠান চালানো সহজ হবে। সেজন্য আমাকে সকালেই ছেড়ে দেওয়া হলো। এভাবেই প্রাণে বেঁচে যাই।