নদীগুলো আমাদের জনপদের হূদপিণ্ড

পুনরুদ্ধারের নামে নদী হত্যার যে কাজটি চলছে সেটা খুবই দুঃখজনক। ধরুন একটা নদী ১০০ ফুট চওড়া ছিল। অযত্নে সেটা অগভীর হয়েছে। উজান থেকে পানি আসে না, সেডিমেন্ট ব্যবস্থাপনা নেই। সেটা হয়তো মাঝখান থেকে শীতকালে ৩০-৪০ ফুট একটা ধারাতে প্রবাহিত হচ্ছে। বর্ষকালে কিন্তু তার ১০০ ফুট লাগবে। আমরা শুকনা মৌসুমে গিয়ে ৩০-৪০ ফুট একটা ধারা কাটছি। কাটার পর সেডিমেন্টগুলোকে দুই পাড়ে স্তূপ আকারে রাখছি। অর্থাত্ ১০০ ফুটের নদীর আমরা দুই পাড়ে ২৫ ফুট ২৫ ফুট মোট ৫০ ফুট ছেড়ে দিলাম। নদী পুনরুদ্ধারের নামে যে কাজ হচ্ছে এতে আসলে নদীকে হত্যা করা হচ্ছে। দেশজুড়ে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হচ্ছে। এখন থেকে একেকটা নদীর যে ধারা ছিল এবং একটা নদীর সঙ্গে আরেকটা নদীর যে কানেকটিভিটি ছিল, যে সংযোগ ছিল এবং যে ধারাতে পানি প্রবাহিত হতো, সেই নদীটিই রক্ষা করা প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বের নদীর দিকে যদি তাকাই, টেমস, রাইন, ভলগা, সিন কিংবা মিসিসিপি, তার দুই পাড়কে তারা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে যে, সারা বছরের পানি যেন নির্বিঘ্নে প্রবাহিত হতে পারে। বাংলাদেশিরা বর্ষকালীন নদীকে ভয় পেতে পারে, কিন্তু সম্মান করে না। আমার ভয় হচ্ছে আজ থেকে ১০ বছর পরে আমি যদি বেঁচে থাকি তাহলে আর্টিকেলটা অন্যভাবে লিখতে হবে যে কীভাবে নদীগুলোকে আমরা পুনরুদ্ধারের নামে নষ্ট করে ফেলেছি। প্রশ্ন উঠতে পারে, নদী যখন কাটা হচ্ছে সেডিমেন্টগুলো কোথায় যাবে। সেডিমেন্টগুলোকে বহন করে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।

বর্ষাকালের নদী হচ্ছে নদী। কর্তৃপক্ষের অনেকে, মানে নদী রক্ষা যাঁদের দায়িত্ব, তেমন অনেকে মনে করেন শীত কালের শুকনো নদীই হচ্ছে নদী। ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী এই অঞ্চলের জেলা প্রশাসকরা বিচারপতি খায়রুল হকের দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী নদীকে চিহ্নিত করতে গিয়ে এর গলা চেপে ধরে শীতকালের শীর্ণ নদীর দু’পাশে পিলার বসিয়ে তাকে নদী হিসেবে চিহ্নত করেছিল। এই অফিসার কারা চিনি না এদের। কিন্তু তারা দেশের যে ক্ষতি করলেন, প্রকৃতির যে ক্ষতি করলেন তা ক্ষমাহীন। সম্প্রতি দেখতে পাচ্ছি হাই কোর্টের আরেকটা রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নদী রক্ষা কমিশন নতুন করে নদীকে চিহ্নিত করছে। আমার ধারণা, তারা নদীকে চিহ্নত করছেন পুরনো আরএস সিএস ম্যাপ ধরে। ম্যাপ ধরে চিহ্নিতকরণ ভালো। কিন্তু প্রয়োজনবোধে বর্ষাকালে নদীর জন্য যে আয়তন প্রয়োজন সেইটাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। নদী সরে গেছে বহু জায়গায়। এতে করে কোনো ব্যক্তির জমিকে দখলে নিয়ে নদীর অবয়বকে ফেরত দিতে হয়, তাহলে ওই ব্যক্তিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে সেই কাজটি করতে হবে। এটার জন্য আলাপ-আলোচনা প্রয়োজন। স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। এটা করতে গেলে প্রচুর বাধা আসবে। কয়দিন আগে কাগজে দেখলাম, নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান বলছেন মেঘনা নদী দখলের পেছনে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা, স্থানীয় শিল্পপতিরা ও প্রভাবশালীরা পুরোপুরি দায়ী। আমরা যদি বুঝি কারা নদী হত্যায় জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নিতে পারব না? ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের দরকারি শক্তি আছে। একটি রাষ্ট্র চলবে তার সংবিধান অনুযায়ী। আমরা হয়তো আগে বুঝিনি। ২০১১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমাদের সংবিধানে ১৮ (ক) ধারা যোগ করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি এবং বনভূমি রক্ষা করতে হবে। নদী একধরনের জলাভূমি। জলাভূমি বলতে কেবল স্থিতিশীল আধারকে বোঝায় না, জলাভূমি বলতে প্রবাহমান নদীকেও বোঝানো হয়। নদীর জীবন আছে। নদীর নিজস্ব বোধশক্তি আছে। আমাদের সম্মানিত বিচারপতিরা এটা অনুধাবন করে নদীকে জীবন সত্তা দিয়েছেন, মানুষের সাথে তুলনা করেছেন। তার যে ধর্ম, তার যে গতি-প্রকৃতি সেটা বুঝতে হবে। তার কথা কাউকে বলতে হবে। কে বলবে? নদীর কথা তো আমরা শুনি না। নদী কিন্তু কথা বলে। এই কথা যাতে বুঝতে পারা যায় এরকম দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। নদী নিয়ে যে প্রকৌশলীরা কাজ করেন, তাদের মধ্যে এ ধরনের দক্ষতার অভাব আছে। এজন্য দেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আমি যখন এই ধরনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলি, ছোট একটা টেস্টের মাধ্যমে তার বিদ্যার দৌড় বুঝি। সেটা হলো সেডিমেন্ট বলতে তিনি কী বোঝেন। যেখানে সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া আছে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের প্রতি, সেখানে বিচারপতিরা অনুধাবন করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন (২০০৯-এর একটি সিদ্ধান্ত এবং ২০১৯-এর একটি সিদ্ধান্ত)। এগুলোকে যদি আমরা ঠিকমতো প্রতিপালন করতে পারি তাহলে নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। মানুষের সাথে নদীর দ্বন্দ্ব তৈরি না করে দুজনের মধ্যে সহাবস্থান আনতে হবে।

আমাদের বিভিন্ন আকৃতির ও বিভিন্ন গতি-প্রকৃতির নদী আছে। অতি বৃহত্ নদী গঙ্গা কিংবা ব্রহ্মপুত্র কিংবা মেঘনা। বড়ো নদী যেমন তিস্তা, রামনাবাদ, বলেশ্বর কিংবা তেতুলিয়া। আমাদের মাঝারি সাইজের নদী আছে—ধরলা, দুধকুমার, সুরমা, কুশিয়ারা। আমাদের ছোট নদী আছে—গোমতী, ফেনী, মুহুরী, কিংবা করতোয়া, টাঙন, গড়াই, মধুমতি। আমাদের অতি ছোট নদী আছে—ঘাগট (রংপুর), চিকলি ও চরালকাটা। প্রত্যেকটা নদীর গতি-প্রকৃতি আলাদা। সুপ্রিম কোর্টের রায়কে সম্মান করি। তারা যেমন বলেছেন প্রতিটা নদীর কথা শুনতে হবে। তাকে মানুষের মতো ট্রিট করতে হবে। মানুষের মধ্যে যেমন কতগুলো কমন ব্যবহার আছে, একইভাবে নদীরও কমন ব্যবহার আছে। আবার প্রতিটি মানুষের যেমন নিজস্ব স্বকীয়তা আছে, নদীরও স্বকীয়তা আছে। নদীর এই স্বকীয়তাকে বুঝতে হবে। অর্থাত্ নদীমাতৃক বাংলাদেশে প্রতিটা নদীকে আলাদা আলাদাভাবে বোঝার প্রয়োজন আছে। আর প্রয়োজন আছে উপকূলীয় জোয়ার-ভাটার নদী এবং উপকূলের উজানে যে নদীতে জোয়ার-ভাটা নেই তার যে গতি-ধর্মের মধ্যে সম্পূর্ণ পৃথক ব্যবহার এটাকে বোঝা।

অনেক বছর আগে আমি বুয়েটে শিক্ষকতা করেছি। বুয়েট, কুয়েট, চুয়েট, রুয়েট, ডুয়েট—প্রকৌশল সংক্রান্ত সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একইভাবে পড়ানো হয়। কিন্তু জোয়ার-ভাটার ব্যাপারটা পড়ানো হয় না। শুনেছি অতিসম্প্রতি বুয়েটের পানিসম্পদ প্রকৌশল বিষয়ে; যেখানে বছরে ৩০ জন ছাত্র নেওয়া হয়, তাদেরকে জোয়ার-ভাটা সম্পর্কে কিছুটা পড়ানো হচ্ছে। কিন্তু বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগে যে ১৮০জন শিক্ষার্থী; দেশে অন্তত যে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরকৌশল বিষয়টি পড়ানো হয়, যারা পরবর্তীসময়ে নদী নিয়ে কাজ করবে, তারা কেউ-ই জোয়ার-ভাটা সম্পর্কে কিছুই পড়ে না। অর্থাত্ শিক্ষা ব্যবস্থাতেও এ ব্যাপারে গলদ আছে। আমিও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাইনি, পরবর্তীসময়ে নিজে নিজে পড়ে কিছুটা বুঝতে চেষ্টা করেছি। আমাদের উপকূলীয় নদীগুলোর ধর্ম সম্পূর্ণ আলাদা। আমি যখন উপকূলের কোনো ব্যাপারে কাজ করি, গ্রামের লোকের কাছে ব্যাপরটা বুঝি। কারণ তারাই আমাকে উপযুক্ত দিক-নির্দেশনা দিতে পারেন। একইভাবে আমি যখন উত্তরের যে নদীতে জোয়ার-ভাটার প্রভাব নেই, সেখানেও কাজ করার সময় আমি স্থানীয় লোকের কাছ থেকে ধারণা নিতে চেষ্টা করি। স্থানীয় জনসাধারণ তার এলাকার নদীগুলোকে ভালো বোঝে। অর্থাত্ স্থানীয় জ্ঞান এবং স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা নদী ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগে। এটাও কেন যেন আমরা হতে দেখি না। শেষ করি এ কথা বলে, জনসংখ্যা বাড়ছে আরো জমির প্রয়োজন হবে। এ কাজটি যেন আমরা নদী ভরাট করে না করি। প্লাবনভূমির সঙ্গে যে সমস্ত বিলাঞ্চল আছে সেগুলোকে যেন ভরাট না করে ফেলি। প্লাবনভূমির সঙ্গে যেন নদীর সংযোগ ফিরিয়ে দেই। প্রকৃতসম্মত, বিজ্ঞানসম্মত নদীর প্রাকৃতিক ধর্মকে ডিস্টার্ব না করে একটা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা দরকার। কিন্তু তার আগে বোঝা দরকার নদীগুলো কী পরিস্থিতিতে স্বস্তি পাবে। আমরা নদীগুলোকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছি না। এটাই আজ আমার আবেদন যে, নদীগুলোকে যথাযোগ্য সম্মান দেখিয়ে তাকে স্বস্তিতে চলাচল করতে দিন। নদী ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে। আজকে আমরা বুঝতে পারছি না। নদীগুলোকে ধ্বংস করে যে ক্ষতি করছি, ৫০ বছর পরে নদীগুলোকে তার জন্য যখন জায়গা ছেড়ে দিতে চাইব তখন হয়তো তা সম্ভব হবে না। দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো সময় আছে নদী ব্যবস্থাপনায় নদী বিজ্ঞানকে কাজে লাগানোর।           

 

অনুলিখিত