হাড়কিপটের গল্প

আমি একজন হাড়কিপটে মানুষ। কিপটে মানে কৃপণ, কনজুস। হাড়কিপটে মানে যে ব্যক্তি বেশি কৃপণ,  যে টাকা পয়সা খরচ করতে চায় না। আমার পিতৃদত্ত একটা নাম আছে। কিন্ত সে  নামে কেউ আমাকে চেনে না। হাড়কিপটে বললে সবাই একবাক্যে আমাকে চেনে। আমার বাড়ির নাম হাড়কিপটের বাড়ি। আমার ছেলেকে বলে হাড়কিপটের ছেলে। আমার বৌকে বলে হাড়কিপটের বৌ। আমি সবসময় নিতে শিখেছি, দিতে শিখিনি। আমি ভালো কাজের জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে এক টাকাও দিইনি। এমনকি গরিব মিসকিনকে কোনো দান খয়রাত করি না। আমার সঙ্গে পাড়ার লোক বড় একটা মেশে না। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি আমাকে আর আমার পরিবার নিয়ে বেশ ভালোই  থাকি।

আমি বাজারে যাই প্রতিদিন বিকেলে। সকালে বাজারে মাছ তরকারির দাম বেশ চড়া থাকে। বিকেলে বাজার যখন ভাঙার উপক্রম হয় অর্থাত্ দোকানদাররা বা বিক্রেতারা যখন ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিতে থাকে তখন আমি কেনাকাটা করতে যাই। শেষ মুহূর্তে বিক্রেতারা সব জিনিস সস্তায় ছেড়ে দেয়। আমি এই সুযোগটা গ্রহণ করি।

 আমার শ্যালক আমাকে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছে। আমি সারাদিন সেটা হাতে নিয়ে টিপতে থাকি। বিভিন্ন শপিংমল তাদের হ্রাসসকৃত মূল্যের জিনিপত্রের বিজ্ঞাপন  মোবাইল ফোনে মেসেজ করে জানায়। সস্তায় পাবার আশায় আমি সেই শপিং মলে ছুটে যাই। প্রয়োজন থাকুক আর না থাকুক আমি সেসব জিনিস কিনি। দামে তো সস্তা। ঢাকা শহরে কোন দোকানে সস্তায় কী কী জিনিস পাওয়া যায়—তা আমার নখদর্পণে। যে ফামের্িস বেশি ডিসকাউন্ট দেয়, আমি সেখান থেকে ওষুধ কিনি। নকল ওষুধ হলেও কিনি। দাম তো কম। যে ডাক্তার ফিস কম নেয় অসুস্থ  হলেও তার কাছে যাই। ফুটপাতে আজকাল জাঙ্গিয়া থেকে স্যুট-টাই পর্যন্ত সব পোশাক সস্তায় কিনতে পাওয়া যায়। লন্ড্রিতে দিলে সব দু নম্বরি মাল এক নম্বরি হয়ে যায়। এসব পোশাক পরে ফিটফাট চলি।  কারো সাধ্য নেই যে বুঝতে পারে এগুলো ফুটপাত থেকে কেনা। ভালো ভালো জুতাও ফুটপাতে পাওয়া যায়। বড়ো বড়ো জুতার দোকানের অবিক্রীত মাল সস্তায় পাওয়া যায়। মাল বহন করার জন্য কুলি নিই না। একটু কষ্ট হলেও আমি নিজেই বহন করি। নিজের কাজ নিজে করাই ভালো। পর নির্ভরশীল হওয়া ভালো নয়। এখন অবশ্য বেশি পোশাক কিনতে হয় না। আমার ছেলে গায়ে  গতরে আমার সমান হয়েছে। কয়েক মাস নতুন জামা কাপড় পরে ফেলে দেয়। আমি সেগুলো পরি। বাপের টাকায় ফুটানি করে তো করুক। কারণ ছেলে তো আমার একখান। চুল কাটার জন্য আমি ফুটপাতের ‘ইটালিয়ান’ সেলুনে যাই। এত লোকের মাঝে আমাকে কে চিনবে?

বউকে খুশি করার জন্য মাঝে মধ্যে গয়না কিনে দিই। সেগুলো খাঁটি সোনার নয়। ইমিটেশন। এগুলো যে দু নম্বরী, কারো সাধ্য নেই তা বুঝার। আসল সোনা আর নকল সোনা দেখতে এক রকম। বউ খুশি হয়। আমিও খুশি। গৃহশান্তি বজায় থাকে।

আমি সবসময় বাসে যাতায়াত করি। কখনো রিক্সা, বেবিট্যাক্সি ব্যবহার করি না। আমার বউ আমার কিপটামির জন্যে আমাকে বকা ঝকা করে। আমি প্রতিবাদ করি না। আমার গা সওয়া হয়ে গেছে।

তাই বলে আমাকে গরিব ভাববেন না। আমি ছোটখাটো চাকরি করলেও ঢাকা শহরে আমার দুটি বাড়ি আছে। আমার বেতন এবং বাড়ি ভাড়া থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে আপনি সপ্তাহে দু’বার ঢাকা-সিঙ্গাপুর, ঢাকা ব্যাংকক বিমানে যাতায়াত করতে পারেন। ঘুষ খাওয়ার অভ্যাস এখনো  ছাড়তে পারিনি।

আমি সব টাকা ব্যাংকে জমা রাখি। ডিপিএস এফডিআর সঞ্চয়পত্র কোনোটা বাকি রাখি না। প্রতি মাসে ব্যাংক থেকে স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করি। সুদসহ কত টাকা জমেছে তার হিসাব রাখি। জমা টাকার অঙ্ক দেখে আনন্দে আমার মন ভরে ওঠে। টাকার নেশা আমাকে পেয়ে বসে। এই নেশা হিরোইন, ইয়াবার চেয়ে কম নয়। যদিও ওসব খাওয়ার অভ্যাস আমার নেই। (আসলে খরচের  ভয়ে খাই না)।

অকারণে টাকা পয়সা-খরচ করা আমার মোটেও পছন্দ নয়। ছোটবেলায় এক কৃপণের গল্প শুনেছিলাম। তালই এবং পুত্রা এক অন্ধকার ঘরে বসে গল্প করছে। তালই গল্প করছে আর সেইসঙ্গে তামাক সেবন করছে। হঠাত্ তালই কলকির আগুনে লক্ষ করল, পুত্রার পরনে কাপড় নেই। তালই বলল, পুত্রা তুমি ন্যাংটো কেন? তোমার লুঙ্গি কোথায়? পুত্রা বলল, অন্ধকারে তো কিছুই দেখা যায় না। তাই ভাবলাম লুঙ্গি ব্যবহার করে নষ্ট করি কেন? লুঙ্গি পাশেই খুলে রেখেছি।

একদিন বারান্দায় বসে খবর কাগজ পড়ছি—এমন সময় এক লোক তার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এলো। আমি বললাম, কী চাই? লোকটি সবিনয়ে বলল, হুজুর আমার ছেলে খুব মেধাবী। এসএসসি পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করেছে। কিন্ু্ত ভর্তির ফি জোগাড় করতে না পারায় ছেলেটি ভর্তি হতে পারছে না। আমি বললাম, আমি কী করতে পারি। লোকটি  বলল, আপনি যদি হাজার পাঁচেক টাকা দেন তাহলে সে ভর্তি হতে পারে। আমি বললাম—আপনার ছেলে কলেজে ভর্তি হতে পারলে আমার কী লাভ? আমার কথা শুনে লোকটি চুপ করে রইল। আমি বললাম, ছেলে মেয়েদের বেশি লেখাপড়া শিখিয়ে কেনো লাভ নেই। বেশি পড়াশোনা করে তারা বড় চাকরি করবে, বিদেশ যাবে। গরিব বাপ-মার খবরও রাখবে না। আমার পাশের বাড়িতে দু্ই বুড়োবুড়ি বাস করে। তার তিন ছেলেকে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে তারা সেখানে ভালো বেতনে চাকরি করছে। গত তিন বছরে একদিনের জন্যও দেশে আসেনি। বাবা মা’র খোঁজও নেয়নি। বিনা চিকিত্সায় অভাবে অনটনে বুড়োবুড়ি ধুঁকে ধুঁকে মরছে। লোকটা নীরবে আমার কথা শুনতে লাগল। বললাম ছেলেকে বেশি লেখাপড়া না শিখিয়ে কোনো কাজে লাগিয়ে দিন। দু চার পয়সা আয় করবে। সংসারের কাজে লাগবে।  বাবা-মাকে ফেলে যাবে না। বড় লোকের ছেলেরা বাবা মা’র খোঁজ নেয় না। গরিব ছেলেরা বাবা-মা’র যত্ন নেয়। এটাই সংসারের নিয়ম।

লোকটা কোনো কথা না বলে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেল। সাহায্য না করার চমত্কার যুক্তি দেখিয়ে আমি মনে মনে পুলকিত হলাম।

আমার এসব কাণ্ডকারখানা লক্ষ করে আমার বউ একদিন আমাকে বলল, তোমার মাথায় মানুষ ঠকানোর এত বুদ্ধি! এসব বুদ্ধি সংসারের কাজে লাগালে তো অনেক টাকা আয় করতে পারতে। আমি বললাম, টাকা ব্যয় না করাটাও একটা আয়। বউ মুচকি হেসে চলে গেল।

সম্প্রতি আমার ডায়াবেটিস রোগ ধরা পড়েছে। ডাক্তার ওষুধ দিয়ে বললেন, প্রতিদিন কমপক্ষে এক ঘণ্টা হাঁটবেন। ডাক্তারের নির্দেশমতো আমি এখন প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে হাঁটি। ফুটপাত দিয়ে হাঁটি। ফুটপাতে হকারদের জিনিসপত্র দেখি। কোনো জিনিস সস্তায় পেলে কিনি । দামদর করতেও ভালো লাগে।

এক জায়গায় ফুটপাতের এক পাশে কয়েকজন মাছ বিক্রেতা মাছ নিয়ে বসে থাকে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাছ বিক্রি করে। তবু কিছু মাছ অবিক্রীিত থেকে যায়। আমি লক্ষ করলাম, এক মাছ বিক্রেতা এক পাশে চুপ করে বসে থাকে। তার ডালার ওপর ওপর কিছু পুঁটিমাছ আর লইট্যা মাছ। লোকটার গায়ে ছেঁড়া ময়লা জামা। মাথার চুল উস্কুখুস্কু। কত মাস ওই চুলে তেল পড়েনি কে জানে। অন্য সব মাছ বিক্রেতারা নিজেদের মধ্যে গল্প করে, হাসাহাসি করে। এই লোকটি তাতে যোগ দেয় না। কারো সঙ্গে কথাও বলে না।

লোকটাকে দেখে আমার কেমন যেন মায়া হলো। আমি লোকটিকে বললাম, তুমি আরো বড় মাছ আনতে পারো না? লোকটি বলল, বড় মাছ আনতে বড় টাকা লাগে। আমি অত টাকা টাকা পামু কোথা থেকে? আমি একটুও চিন্তা না করে বললাম, টাকা আমি দেব। তবে দান নয়, ধার দেব। মাসে পাঁচ হাজার টাকা ধার দেব। তিন কিস্তিতে শোধ করবে। কোনো সুদ দেওয়া লাগবে না।

লোকটি আমার প্রস্তাব শুনে একটু চিন্তা করল। তারপর বলল, পারবে। লোকটির মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে খুশি, আমিও খুশি। কাউকে সাহায্য-সহযোগিতা করার মানে যে কী আনন্দ তা আমি ইতিপূর্বে কখনো উপলব্ধি করতে পারিনি। এই প্রথম সেই স্বর্গীয় আনন্দ পেলাম। নেওয়ার চেয়ে দেওয়ার সুখ বেশি।

লোকটির নাম হাবিব। টাকা ধার দেয়ার ব্যাপারে কোনো লেখাপড়া হলো না। আমি ওকে বিশ্বাস করলাম। এভাবে ছয় মাস কাটল। আমি টাকা ধার দিই। হাবিব শর্ত অনুযায়ী তা পরিশোধ করে। সে এখন হাসি খুশিতে থাকে। তার গায়ে ভালো জামা কাপড়। মাথার চুল তেল দিয়ে আঁচড়ানো। একদিন দেখি হাবিব মুখ ভার করে বসে আছে।  মাছ বিক্রিতে তার মন নেই। কী যেন ভাবছে। আমি বললাম কী হাবিব মিয়া,  চুপচাপ বসে আছ কেন? কী ভাবছ? হাবিব বলল, আমার বউয়ের শরীরটা ভালো না। তার পেটে টিউমার হইছে। ডাক্তার কইছে অপারেশন করন লাগবে।  অপারেশনে অনেক খরচ। আমি অতো টাকা পামু কই? আমি বললাম, তুমি চিন্তা করো না। যত টাকা লাগে আমি দেব। তবে একটা শর্তে। যত টাকা খরচ হবে তার সব বিল ভাউচার আমাকে দেখাতে হবে। হাবিব লাফিয়ে আমার পায়ে পড়ল। আমার ভীষণ অস্বস্তি হতে লাগল। তাকে তুলে দাঁড় করালাম। আশেপাশের লোকজন আমাদের দেখছে। হাবিবের বউয়ের অপারেশনে খরচ হয়েছে আশি হাজার টাকা। হাবিব সব বিল ভাউচার আমাকে দেখাল। আমি হাসপাতালে গিয়ে সব টাকা পরিশোধ করলাম।

এত টাকা খরচ হওয়ায় আমার একটুও আফসোস হলো না। একজন মৃত্যুপথযাত্রীকে বাঁচাতে পারার আনন্দে মন ভরে উঠলা। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। আমার হাঁটার শেষ হয় না। হাবিবের গায়ে নতুন নতুন জামা। মাথায় টুপি। তার পোশাক দেখে বুঝতে পারি এগুলো ফুটপাতের থেকে কেনা। কেননা আমার জামা- কাপড়ও ফুটপাত থেকে কেনা।

একদিন দেখি হাবিব বিষণ্ন মুখে বসে আছে। আমি বললাম কী হাবিব মিয়া কি ভাবছ? হাবিব বলল, মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব আইছে। কোন দাবি-দাওয়া নাই। ছেলে এক অফিসের পিয়ন। আমি বললাম, কত টাকা লাগবে? হাবিব হিসাব করে বলল হাজার দশেক হলেই  চলবে। আমি হাবিবকে দশ হাজার টাকা এনে দিলাম। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে সাহায্য করা সওয়াবের কাম। ধীরে ধীরে হাবিবের সঙ্গে আমার একটা অন্তরঙ্গ ভাব গড়ে ওঠে। ওকে না দেখলে ভালো লাগে না। আমি নিয়মিত টাকা ধার দিই। সেও তা যথাসময়ে পরিশোধ করে। কখনো শর্ত ভঙ্গ করে না।

একদিন হাবিবকে কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করি। তোমার বাবাও কি তোমার মত মাছ বিক্রি করতেন? হাবিব জবাব দেয়, আমাদের বংশের কেউ মাছ বিক্রি করেনি। আমার আব্বাজন মসজিদের ইমাম ছিলেন। যুদ্ধের সময় তিনি কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে ঘরে আশ্রয় দিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে পাকিস্তানি সৈন্যদের খবরাখবর দিতেন। খবর পাইয়া একদিন রাজাকারেরা আমার আব্বাজানকে  মিলিটারি ক্যাম্পে ধইয়া লইয়া যায়। আব্বাজান আর ফিরে আসেন নাই। রাজাকারেরা আমাদের ঘরে আগুন দেয়। আগুনে আমার আম্মাজান ও ছোট বোন কুলসুম পুইড়া মরে। আমি ছোট মামুর বাড়িতে থাকায় বাইচা যাই।

দিন কয়েক হাবিবের দেখা নেই। কেউ বলতে পারে না সে কোথায় গেছে। একদিন হঠাত্ দেখি হাবিব চুপচাপ বসে আছে। তার সামনে মাছের ডালা নেই। আমি ভাবলাম, সব মাছ বোধহয় বিক্রি হয়ে গেছে। আমি বললাম, কী হাবিব মিয়া আজ এত সকাল সব মাছ বিক্রি হয়ে গেছে? হাবিব আমার কথায় জবাব না দিয়ে দাঁড়িয়ে হাত কচলাতে থাকে। আমি বললাম, কিছু বলবা? হাবিব মুখ কাঁচুমাঁচু করে বলল, আর কত আপনারে বিরক্ত করমু? আপনি আমারে অনেক সাহায্য করেছেন। আমি বললাম—যা বলতে চাও সোজাসুজি বলো। হাবিব বলল, জামাই একখণ্ড জমি কিনছে। হাজার দশেক টাকা পাইলে সে জমিটা রেজিস্ট্রি করতে পারে। আমি বললাম, জামাই তোমার কাছে টাকা চায় কেন? সে তার বাবার কাছে টাকা চাইতে পারে না? হাবিব বলল, জামাইয়ের বাবা কইছে, তোর শ্বশুরের কাছে যা, সে টাকা দিবে। আমি বললাম বিয়ের ছয় মাস না যেতেই জামাই যৌতুক চাইতে শুরু করেছে? আমি দৃঢ়কণ্ঠে বললাম, আমি যৌতুকের টাকা দিতে পারব না। যৌতুক নেওয়া ছেলেরা কখনো ভালো হয় না। একবার যৌতুক পেলে ওদের লোভ বেড়ে যায়। ওদের চাওয়ার শেষ থাকে না। তুমি এক কাজ করো, তোমার মেয়েকে তোমার কাছে নিয়ে এসো। ওকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দাও। ওর পড়ার সব খরচ আমি দেব। মেয়েকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দাও।

হাবিব কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে চলে যায়। যাবার আগে আমার ধারের সব টাকা শোধ করে দিয়ে গেল। নতুন করে ধার নিল না।

হাবিব মাছ বিক্রি করা ছেড়ে দিয়েছে। তার জায়গায় অন্য লোক বসে। ফুটপাত দিয়ে যাবার সময় হাবিবের অভাব বোধ করি। তার কথা সব সময় মনে পড়ে।

অনেক দিন পর একদিন দুপুরে রাস্তা পার হচ্ছিলাম। হাবিবের সঙ্গে আমার দেখা। আমাকে দেখেই সে লম্বা সালাম দেয়। তার মাথায় একটা বড় টুকরি। তাতে নানান ধরনের সবজি। হাবিব এখন সবজি বিক্রি করে। মাছ বিক্রি ছেড়ে দিয়েছে। গায়ে গেঞ্জি বা জামা নেই। রোদে পুড়ে গায়ের রঙ তামাটে হয়ে গেছে। সারা শরীর ঘামে ভেজা। তার চুল দাড়িতে পাক ধরেছে।

আমি বললাম, হাবিব মিয়া কেমন আছ? হাবিব মাথার টুকরিটা মাটিতে নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, আপনাদের দোয়া। আমি বললাম, তোমার মেয়ে জামাই কেমন আছে? হাবিব নির্লিপ্তভাবে জবাব দেয়— জামাই আমার মাইয়ারে তালাক দিয়া আরেকটা বিয়া করছে। সেখানে অনেক যৌতুক পাইছে। আমার মাইয়া গলায় দড়ি দিছে। আমি  জমি বেইচা জামাইরে দশ হাজার টাকা দিছিলাম। বলতে বলতে তার কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এলো। আমি হাবিবকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা খুঁজে পেলাম না। বললাম, তোমার এখন কিছু টাকা-পয়সা লাগবে? ফেরত দিতে হবে না।

হাবিব বলল টাকা-পয়সা দিয়া কী করমু? যার জন্যে টাকা পয়সা দরকার ছিল সেই যখন নাই। বললাম, কেন তোমার তো একটা ছেলে আছে? হাবিব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ছেলে বিয়া কইরা আলাদা সংসার করছে। আমি যা আয় করি তাতে আমাদের দুজনের দিন চইলা যায়।

হাবিবের কথা শুনে এবং তাকে কিছু দান করতে না পারার জন্য আমার মন খারাপ হয়ে গেল। আমার মনে হলো, না পাওয়ার কষ্টের চেয়ে কাউকে কিছু না দিতে পারার  কষ্টও কম নয়।