শহিদ হোসেন খোকন
প্রায় সব মানুষের সফলতার গল্প অনেকটা একই রকম—অ্যাম্বিশন থাকা চাই, জীবনের লক্ষ্য ঠিক করতে হবে, কঠোর পরিশ্রমী আর দূরদর্শী হতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ওয়ারেন বাফেট পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ইনভেস্টর ও উদ্যোক্তাদের একজন। স্কুলে পড়ার সময়েই চুইংগাম বিক্রি, কোকাকলার বোতল বিক্রি, বাসায় বাসায় পত্রিকা বিলি করা ইত্যাদি অনেক কাজ করেই টাকা রোজগার করার চেষ্টা করতেন। নিজের দাদুর দোকান থেকে চিপস কিনে কিছুদূর হেঁটে গিয়ে ৫ সেন্ট লাভে বিক্রি করার ঘটনাও তিনি ঘটিয়েছিলেন বাল্যকালে।
ওয়ারেন বাফেটের বাবা ছিলেন কংগ্রেস ম্যান বা সংসদ সদস্য। সব সংসদ সদস্যের ছেলেরা ওয়ারেন বাফেট হয় না। বড়োজোড় বাবার চেয়ে খানিকটা বড়োকিসিমের ম্যাসেলম্যান হন। বাফেটের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার আর বাফেট পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো দানশীল ব্যক্তি। ২০০৬ সালে তিনি তার সম্পদের প্রায় অর্ধেক ৩৪ বিলিয়ন ডলার দান করে দেন। এ বছর তিনি দান করেছেন ৩.৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের পলিটিশিয়ানরা কিংবা ব্যাবসায়ীরা যখন দান করেন তখন কয়েকটা মাইক, রিক্সা আর ক্যানভাসার ভাড়া করা করেন। শুধুমাত্র জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে প্রতি বছর শ’খানেক লোক মারা যায়।
বাংলাদেশে যারা সফল উদ্যোক্তা তারা যে কত রকম পুলসেরাতের পুল পার হয়ে সফলতার মুখ দেখছেন, তা কেবল তারাই জানেন। আমার ধারণা পৃথিবীর সবচেয়ে সফল উদ্যোক্তার বসবাস বাংলাদেশে। এত অনিয়ম-দুর্নীতির খানাখন্দ পার হয়ে সফল হওয়া সহজ কর্ম নয়। আমার এক বন্ধুর গল্প বলি। এ বছরের গোড়ার দিকে আমি, আমার এক বন্ধু শাহেদ আর আমাদের ঢাকা ইউনিভার্সিটির এক প্রিয় শিক্ষক—আমরা গেছি মেরিনা বে স্যান্ডস স্কাই লাউঞ্জে। উদ্দেশ্য, স্যারকে এই বিখ্যাত স্থাপনাটা দেখানো আর একটু আড্ডা দেওয়া। ঢোকার মুখেই পেছন থেকে মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক ‘খোকন ভাই’ বলে কাঁধ চেপে ধরল। পাকাচুলের মোটা ফ্রেমের চশমায় আবৃত লোকটাকে চিনতে সময় লাগল ‘আমি রানা, ব্রাদার’—এই বলে যখন সে হাসল, ঠিক তখনই তার অমলিন হাসিতে ফিরে পেলাম পুরনো সেই বন্ধুকে। প্রায় ২৫ বছর আগে বাড়ি থেকে রাগ করে সে সিঙ্গাপুরে এসেছিল পড়াশোনা করতে। পড়াশোনার চাপ আর পার্ট টাইম জবের খাটা-খাটুনিতে টিকতে না পেরে সিদ্ধান্ত নিল দেশে গিয়ে নিজে কিছু করবে। এরপর ২৫ বছর চলে গেছে, আমাদের আর দেখা হয়নি। গত মাসে আমি তার ফ্যাক্টরি ভিজিট করেছি, ১৫ হাজার লোক কাজ করছে তার প্রতিষ্ঠানে। বছরে এক্সপোর্ট ৪০০ মিলিয়ন ডলার।
আমার আরেক বন্ধু জয়নাল আবেদিন বাবার থেকে ৭ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন ৩০ বছর আগে। H&M-এর নমিনেটেড ফ্যাক্টরি। বছরে এক্সপোর্ট করে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার। চিটাগংয়ের সালাম সাহেব খুবই ছোটখাটো মানুষ। এ রকম বিনয়ী মানুষ খুব কম দেখা যায়। আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন তার ফ্যক্টরি ভিজিট করতে। বললেন, তিনিও কিছু এক্সপোর্ট করেন আমেরিকাতে। তার ১৫টা ফ্যাক্টরিতে প্রায় ৩০ হাজার এমপ্লয়ি। ৭০০ মিলিয়ন এক্সপোর্ট। ৫টা ফ্যাক্টরি ভিজিট করার পর বাকিগুলো ভিজিট করার আর এনার্জি ছিল না।
মাজহারুল ইসলাম, কামরুল ইসলাম শায়ক আমার দুই স্বনামধন্য প্রকাশক বন্ধু। নিজেদের নিবেদিত করেছেন প্রকাশনাশিল্পে। দেশে-বিদেশে দুজনই তারা স্বনামধন্য। কবি বন্ধু তারিক সুজাত আর ইনটেরিয়র ডিজাইনার মিমি ভাবী দুজনেই সফল উদ্যোক্তা। অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ, নাট্যকার শাকুর মজিদ আমার ভালো বন্ধু। দীর্ঘদিনের সখ্য আমাদের। সবাই বেশ সাকসেসফুল নিজেদের জীবনে, পেশায়।
এদের মধ্যে আমি কোথায়? আমি আমার বিফলতার গল্প বলি—ইচ্ছে ছিল রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হব, সানজিদা খাতুন আর ওয়াহিদুল হক স্যারের পদতলে বসে ছায়ানটে দু’বছর গান শিখলাম। পরে ভাবলাম অভিনেতা হলে মন্দ হয় না—রামেন্দুদা’র থিয়েটার স্কুলে ভর্তি হলাম। বছরখানকে নানারকমের নাট্যতত্ত্ব শিখলাম। পোষাল না, চলে এলাম সিঙ্গাপুর। শুরু হলো বেঁচে থাকার কঠিন স্ট্রাগল। কত রকমের মানুষ কতভাবে ঠকাল, আবার কেউ কেউ এগিয়ে এল ভালোবাসার ডালি নিয়ে। দেখতে দেখতে ২৫ বছর হয়ে এল।
দশ বছর আগে একটা ফ্যশান ব্র্যান্ড SAY'ON নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। সিঙ্গাপুরে সব ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ডের সাথে টিকে থাকা সহজ ব্যাপার নয়। চেষ্টা করে যাচ্ছি। ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, মায়ানমার, ইন্ডিয়া, বাংলাদেশ আর সিঙ্গাপুরের ২৫ জন লোক কাজ করছে সে প্রতিষ্ঠানে, মন্দ কি? বাংলাদেশ হলো ওয়ার্ল্ড সেকেন্ড লারজেস্ট গার্মেন্টস প্রডিউসার। সারা পৃথিবীর মানুষকে কাপড় দিয়ে বাঁচিয়ে রখেছে বাংলাদেশ। সে দেশে জন্মে হেরে গেলে চলবে? যে দেশে লালন জন্মেছে, শেখ মুজিব জন্মেছে, জাহানারা ইমাম জন্মেছে, অনেক প্রজ্ঞাবান অর্থনীতিবিদ জন্মেছে, যে দেশের মানুষ গান গায়—ও আমার দেশের মাটি তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা—তারা একদিন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেই।
লেখক :উদ্যোক্তা ও কথাসাহিত্যিক