ডাক্তারের সঙ্গে রোগীর সম্পর্কটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ

মাহনাজ তাবাসসুম প্রভা

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে খুব ভালো ফলাফল নিয়ে পাস করি, কিন্তু ক্যারিয়ার নিয়ে তেমন কোনো স্থির ইচ্ছা ছিল না, বাসা থেকেও তেমন কোনো চাপ ছিল না বা আলাপও হয়নি। অঙ্কপাগল ইঞ্জিনিয়ার বাবার কাছ থেকে দুই ভাইবোনই পেয়েছিলাম অঙ্কের নেশা, এমনকি স্কুলে যাওয়ার আগেই। এদিকে মা ছিলেন জাতীয় জাদুঘরের কিপার (পরিচালক), মাইক্রোবায়োলজিতে পিএইচডি। ফলে ডাক্তার হওয়ার পূর্ব-পরিকল্পনা বলে কিছু ছিল না আমার। আমার লক্ষ্য ছিল পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় থাকব। জীবনযাত্রা কিছুটা সহজ হবে ভেবে আব্বু চেয়েছিলেন, আমি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হই। যথেষ্ট ভালো রেজাল্ট নিয়ে বুয়েটে ইলেকট্রিক্যালে ভর্তিও হয়েছিলাম। বুয়েটে ভর্তির আগে চোখের ডাক্তারের কাছে যেতে হলো আমাকে। তখনও মেডিক্যালের রেজাল্ট বের হয়নি। ডাক্তার লাইট অফ করে আমার চোখ পরীক্ষা করতে করতে আব্বুকে জিজ্ঞেস করছিলেন—ধরেন, আপনার মেয়ে যদি মেডিক্যালেও চান্স পেয়ে যায়, কোথায় পড়াবেন? মনে আছে, আব্বু তখন বলেছিলেন—আমার তো খুব ইচ্ছে ছেলেমেয়েদের কেউ একজন ডাক্তার হোক, আমাদের গ্রামে গিয়ে ডাক্তারি করুক।

ওই কথার পর যখন লাইট অন হলো, দেখলাম আব্বুর চোখে পানি! তার কয়দিন পর দেখি, আমি ঢাকা মেডিক্যালে চান্স পেয়েছি। সবমিলিয়ে মেডিক্যালে পড়ার সিদ্ধান্ত। মজার ব্যাপার হলো, আমার ছোট ভাইও এখন ডাক্তার, সার্জারিতেই আছে।

ঢাকা মেডিক্যাল থেকে পাস করে, ২০১০ থেকে এই পেশার সঙ্গে আছি। ২০১৮-তে সার্জারিতে এফসিপিএস সেরে সার্জিক্যাল অনকোলজিতে (ক্যানসার বিষয়ক সার্জারিতে) মাস্টার্স করেছি। পরিবার ও কাছের অনেকের ক্যানসারের কষ্ট দেখে এই সাবজেক্টে আসার সিদ্ধান্ত নিই।

পরিবারে ডাক্তার তেমন নেই বলেই হয়তো, ডাক্তার হওয়ার পর ডাক্তার-রোগীর এই পার্থক্যটা আমি আরো ভালো করে বুঝতে পারলাম। রোগীরা তাদের কথাটা অনেক সময় আমাদের ঠিকমতো বুঝিয়ে বলতে পারেন না। ডাক্তার হিসেবে আমরাও তাদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে শুনতে পারি না। সেক্ষেত্রে ডাক্তার এবং রোগী—এই দুই পক্ষেরই এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা উচিত। আরেকটা অভ্যাস আমাদের আছে—সবাই ছোটখাটো কিছু হলেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছেই যাই। কিন্তু এতে তার কাজে অযথা চাপ বাড়ছে, তিনি সবাইকে ঠিকমতো দেখতে পারেন না। এতে রোগী সুচিকিত্সা পাচ্ছেন না বা পেলেও সন্তুষ্ট নন বেশি সময় না দেওয়ায়। কিন্তু এমনটা হতো না যদি রেফারেল সিস্টেম ঠিকমতো চালু হতো।

রোগীর উপসর্গগুলো শুনে, পরীক্ষা করে, প্রাথমিক চিকিত্সা দিয়ে প্রয়োজনবোধে একজন জিপি (জেনারেল প্র্যাক্টিশনার) রেফার করবেন উপযুক্ত বিশেষজ্ঞের কাছে। উন্নত বিশ্বে এই ব্যবস্থা আছে। এটা চালুর জন্য সবার আগে আমাদের যেটা বুঝতে হবে : আমরা যখন ডাক্তারি পাস করে গেছি, তখন আমাদের সিম্পল এমবিবিএস বলা হয়। এমবিবিএসের কোনো অংশই আসলে সিম্পল না। প্রাথমিকভাবে তারাই যথেষ্ট—এই আস্থা আনতে হবে। এবং জিপি সিস্টেম চালু করতে কোর্স ও পদোন্নতির ব্যাপারটাও নিশ্চিত করতে হবে।

আমি যুক্তরাজ্যের রেজিস্টার্ড সার্জন। আমি চাই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে শিখে বাংলাদেশে তা প্রয়োগ করতে। আমি ‘লাগসই প্রযুক্তিতে বিশ্বাস করি। প্লাস্টিকের পানির বোতল দিয়ে স্বল্প খরচে দেশীয় প্রযুক্তিতে বানানো হচ্ছে বাচ্চাদের শ্বাসের যন্ত্র, প্রসবপরবর্তী রক্তক্ষরণ বন্ধে সায়েবা ম্যাডামের আবিষ্কৃত কনডম ক্যাথেটার তো বিশ্বখ্যাত। অনেক নিরাশার মধ্যে এগুলো আশার কথা।

থার্ড ইয়ারে একজন হার্ট অ্যাটাকের পেশেন্ট পেয়েছিলাম, যাকে চলন্ত ট্রেনের চেন টেনে থামিয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন বমিমাখানো, অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে এসে জীবন বাঁচায়। পেশেন্টের কী সৌভাগ্য যে এমন সুহূদ ব্যক্তি ঠিক সেই বগিতে ছিলেন, গন্তব্যে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে যিনি মাঝরাতে একা এই কাজটি করেন সামান্যতম ধন্যবাদটুকু দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে। সেদিন থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিই, যেখানে যেভাবেই থাকি না কেন আমার উপস্থিতি যেন মানুষের জীবনে অর্থ বহন করে তার চেষ্টা করব। তার অংশ হিসেবে গরিব রোগীদের জন্য সরকারি বরাদ্দকৃত সুবিধাদি নিশ্চিতের পাশাপাশি কিছু রোগীদের নিজস্ব ও বন্ধুদের ফান্ডের মাধ্যমে সাহায্য করছি।  তবে আমি শুধু আর্থিক সাহায্য করাকে প্রমোট করি না। কারণ সবসময় সমস্যাটা আর্থিকও না। আমি চাই সাহায্যকারী ও গ্রহীতার মধ্যে যোগাযোগ হোক, আন্তরিকতা তৈরি হোক। বিপদে সাহায্য, সাহস পেলে চোখে মুখে যে আনন্দ আর কৃতজ্ঞতা ফুটে ওঠে, সেটার দেখার আনন্দের নেশা তৈরি হোক সাহায্যকারীর মনে। এভাবে পাশে দাঁড়ালে আর কী লাগে!

আরেকটা ঘটনা বলি—অর্থপেডিক্সে তখন আমি ইন্টার্নি করছি। একদিন হাতভাঙা একটা ছোট বাচ্চাকে পাই। দুই-তিন বছর বয়স। আকুল হয়ে কাঁদছে। ওর মা ভয়ে আরো বেশি কাঁদছেন! যে সার্জন হাত জোড়া দেবে তিনি আরেকটা ওটিতে। আমি কী করলাম, বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম। পরে তাকে চিকিত্সা করে ছেড়ে দিই। তার দেড় দুই-বছর পর আমি বিএসএমএমইউ-তে ট্রেনিং নিচ্ছিলাম—ওখানে কাজ করতে করতে—হঠাত্ দেখি একটা বাচ্চা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি তো অবাক! বাচ্চাটাকে চিনতেও পারছি না। বাচ্চাটা কিছু বুঝিয়ে বলতেও পারছে না। বাচ্চার মাও বুঝতে পারছেন না, ব্যাপারটা কী হলো। পরে ওর মা বুঝতে পেরে বলেন, এটা সেই বাচ্চা, যাকে আমি কিছুক্ষণের জন্য কোলে তুলে নিয়েছিলাম। এই ঘটনাটি আমাকে একটা শিক্ষা দিয়েছে, সেটা হলো—কাউকে সহযোগিতা করার জন্য বা জীবন বাঁচানোর জন্য ডাক্তারই হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। যে কেউ যেকোনো জায়গা থেকে এই কাজটা করতে পারেন। মানুষের প্রতি মানুষের এটা একটা দায়বদ্ধতাও।

মন থেকে ভালোবেসে ক্যারিয়ার বেছে নিতে, বিশেষত তা যদি হয় ডাক্তারি বা ডাক্তারি পাসের পর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের সাবজেক্ট। যে কাজ শারীরিক কি মানসিকভাবে সারাদিন সারাক্ষণ করা লাগে তাকে ভালোবাসা জরুরি।

ক্যানসার নিয়ে শেষ দুটো কথা বলতে চাই। প্রথমত, ক্যানসার রোগীর ঠিক সময়ে ডাক্তারের কাছে আসা নিশ্চিত করা। আর দ্বিতীয়ত, খাবারের ব্যাপারটাতে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ খাবারে ভেজালটা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আমার তো ওরকম সামর্থ্য নেই যে, আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব! নইলে বলতাম শুধু আইন বা কড়াকড়ি করে অনেককিছু সমাধান করা সম্ভব নয়। একজন ক্যানসার রোগীর কষ্টটা যদি ভেজাল ব্যবসায়ীরা কেউ দেখতেন, তাহলে বুঝতেন ব্যাপারটা আসলে কেমন! তা না করে যদি একেক অসাধু ব্যবসায়ী একেক ক্যানসার পেশেন্টের দায়িত্ব নিত! রোগীর যখন যেটা দরকার তিনি জোগাড় করে দেবেন—রক্ত কি ঔষধ, ব্যথায় যখন রোগী কাতরাবে তখন হাত ধরে পাশে বসে থাকবেন, সেই আহাজারি শুনবেন। নইলে কী করে হবে? মনের ভেতর থেকে পরিবর্তন না এলে অনেক কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব না। কারণ আমরা খাদ্যে ভেজাল ধরছি, কিন্তু খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার সিস্টেমটা বন্ধ করতে ততটা সফল নই। ক্যানসার হাসপাতালে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি—একটা বাচ্চা যখন মায়ের পেট থেকে পৃথিবীতে আসে—সঙ্গে নিয়ে আসে তার শরীরের সমান টিউমার। কখনো জন্মের তিন মাসের মধ্যে তার পুরো পা-টা কেটে বাদ দিতে হয়। এমন শিশুর সংখ্যা কত, তা ক্যানসার হাসপাতালে না গেলে বোঝা যাবে না। ক্যানসার হাসপাতালে আমার অফিস ছিল সাততলা-আটতলা। আমি দুই বছর লিফটে চড়িনি। সিঁড়ি দিয়ে উঠেছি, নেমেছি। লিফটে অনেক ছোট ছোট হাত-পা ছাড়া বাচ্চাদের দেখে আমি সহ্য করতে পারতাম না। কারো চোখে অনেক বড়ো বড়ো টিউমার, শরীরে ব্লাড ক্যানসার। বাচ্চা যখন পেটে তখন একজন মা কী খাচ্ছেন, কিসে শ্বাস নিচ্ছেন, আমরা ভেবে দেখেছি? বাচ্চাটা যখন পেট থেকে বেরোচ্ছে, সে কিন্তু ক্যানসার নিয়ে বেরোচ্ছে! আমাদের সামাজিকভাবে সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

 

লেখক:রেজিস্ট্রার, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল