মাসে ব্যাট তৈরি হচ্ছে গড়ে ১ লাখ
আহমেদ সাঈদ বুলবুল, যশোর অফিস
মিস্ত্রিপাড়ার শীতের নিস্তব্ধতা ভেঙে অবিরাম শব্দের ছন্দময়তা জানিয়ে দেয় এটা আর পাঁচটা গ্রামের মতো নয়। হাতুড়ি-বাটালি আর নানা যন্ত্রের শব্দে গ্রামটি ভোর থেকেই মুখর থাকে। এই গ্রামেই যে সূতিকাগার ছোটোদের ক্রিকেট ব্যাটের। এখানে প্রতিদিন তৈরি হয় হাজার হাজার ক্রিকেট ব্যাট। মিস্ত্রিপাড়ার একেকটা ঘর যেন একেকটা কারখানা। এখানকার ক্রিকেট ব্যাট ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে। এজন্য নরেন্দ্রপুুর সারাদেশে পরিচিতি পেয়েছে ‘ব্যাটের গ্রাম’ নামে।
যশোর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে নরেন্দ্রপুর ইউনিয়নের গ্রাম মিস্ত্রিপাড়া। এই গ্রামের সঞ্জিত মজুমদারের হাত ধরেই ১৯৮৬ সালে শুরু হয় দেশীয় কাঠ দিয়ে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কারখানা। গ্রাম ছাড়িয়ে মহাজেরপাড়া, বলরামপুর, রুদ্রপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে ক্রিকেট ব্যাটের কারখানা। এসব গ্রামে ছোটো-বড়ো মিলিয়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ৪০টি কারখানা। প্রতিটি কারখানায় চার থেকে ১০-১২ জন শ্রমিক দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন। এসব কারখানায় মাসে গড়ে ১ লাখের মতো ব্যাট তৈরি হচ্ছে। এসব ব্যাট ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের প্রায় সব জেলায় সরবরাহ করা হয়। এ গ্রামের প্রথম ব্যাটের কারিগর সঞ্জিত মজুমদার বর্তমানে আর ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করেন না। তিনি ফরিদপুরে স্বর্ণালংকারের দোকানে কাঠেরই প্রয়োজনীয় কাজ করেন। তবে তার সন্তানসহ পরিবারের সদস্যরা এই গ্রামেরই নিজ বাড়িতে ব্যাট তৈরি করেন। সঞ্জিত মজুমদার মোবাইলে ইত্তেফাককে বলেন, ১৯৮৬ সালে ভারত থেকে ব্যাট তৈরির কাজ শিখে আসি এবং প্রতিজ্ঞা করি সবাই যা করে, আমি তা করব না। বিদেশি ব্যাট আমি বিক্রি হতে দেব না। রতন অ্যান্ড রিপন ক্রিকেট ব্যাট কারখানার স্বত্ব্বাধিকারী রিপন মজুমদার জানান, সারাবছরই তারা ব্যাট তৈরির মধ্যে থাকেন। তবে পৌষ মাসের শুরু থেকেই তাদের মূল মৌসুম শুরু হয়। এ মাসের শেষের দিকে এসে ব্যাট বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। আর তা চলে জ্যৈষ্ঠ মাস অবধি। তবে বছরের অন্যান্য সময় কাঠ সংগ্রহ ও মজুদ করা হয়। আষাঢ় মাস থেকে সংগ্রহ করে অন্তত ছয় মাস শুকানোর পরই তা সিজন হয়। এরপর কারিগরের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় হয়ে ওঠে একেকটি ব্যাট।
তিনি আরো জানান, তার কারখানায় প্রতিদিন ৪০০ ব্যাট তৈরি হয়। কদম, জীবন, বকাল নিম, আমড়া, গুল্টে (পিটুলি), পুয়ো, ছাতিয়ান, ডেওয়া কাঠ দিয়ে এসব ব্যাট বানানো হয়। তবে ভালো ব্যাট হয় বকাল নিম ও জীবন কাঠে। আকার ও মান ভেদে একেকটি ব্যাট পাইকারিতে বিক্রি হয় ২০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। ব্যাট হয় সাতটি আকারের।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কারখানায় তৈরি হয় মূল ব্যাট। ব্যাটের হাতল তৈরি হয় স্থানীয় স’ মিলে। কারখানায় আঠা দিয়ে জোড়া দেওয়ার পর ফিনিশিংয়ের কাজ করা হয়। এসব কাজের মধ্যে ঘষে পরিষ্কার ও পুডিং করা, ক্ষেত্রবিশেষে রং করা, স্টিকার, পলিথিনে মোড়ানো ও গ্রিপের কাজ করা হয়। এসব কাজ কারখানা মালিকের স্ত্রী, সন্তানসহ পরিবারের লোকেরা করে থাকেন। মিনতি রানী জানান, ৪০-৪৫ বছর আগে তার বিয়ে হয়েছে। আগে সংসারের কাজ ছাড়া কিছুই করতেন না। বর্তমানে স্বামীর পাশাপাশি নিজেও কাজ করেন। কথায় কথায় বললেন, রং-পুডিং করা, স্টিকার লাগানোর মতো কাজে অনেক কষ্ট আছে। সমস্যার কথা বলতে গিয়ে বলেন,‘এখন বহু মানুষ কারখানা পাতিছে। এখন খদ্দেররা আর নিতি (নিতে) চাচ্ছে না।’ হাসতে হাসতে বললেন, ‘মজুরি বলতি (বলতে) পেটে-ভাতে।’ সংসারের অভাব-অনটন মেটাতে স্কু-পড়ুয়ারাও ব্যাট কারখানায় শ্রমিকের কাজ করছে। রূপদিয়া ওয়েলফেয়ার হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র সাকিব জানায়, প্রতিদিন ২৫০ টাকা মজুরিতে সকাল সাতটা থেকে দুপুর তিনটা পর্যন্ত কাজ করে। রোজগারের পুরোটাই তুলে দেয় মা-বাবার হাতে। স্কুলে যাওয়া বলতে শুধু পরীক্ষা দিতে যাওয়া। মিস্ত্রিপাড়া বটতলার কারখানা মালিক তরিকুল ইসলাম জানান, তার কারখানায় মাসে ৪ হাজার ব্যাট তৈরি হয়। এসব ব্যাট ৮০ থেকে ২০০ পিস করে বস্তায় ভরা হয়। এরকম চার-পাঁচ বস্তা থেকে ১০ বস্তা ব্যাট প্রতিদিন পাঠানো হয় দেশের নানা প্রান্তে। পরিবহন, কুরিয়ার বা ট্রান্সপোর্টের মাধ্যমে সারাদেশে ব্যাট সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে ব্যাট সরবরাহ শুরু হয়েছে। তবে পৌষ মাসের শেষে ভরপুর যাবে। তিনি জানান, আশেপাশের গ্রাম থেকে তারা ব্যাট তৈরির কাঠ সংগ্রহ করেন। কিন্তু বটতলা-মিস্ত্রিপাড়া-মন্ডলপাড়া পর্যন্ত রাস্তাটি মোটেও ভালো না। বর্ষা মৌসুমে যখন কাঠ সংগ্রহ করা হয়, তখন কাদায় বিরাট সমস্যা হয়। প্রায়ই নসিমন-করিমন ভেঙে পড়ে যায়। এজন্য রাস্তাটি দ্রুত পিচের করার দাবি জানান।