প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, যে দুর্নীতি করবে সে যেই হোক, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বিমানবন্দরের নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, সব বিমানযাত্রীকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা মেনে চলতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপত্তার যে নিয়মাবলি রয়েছে, আমাদের সব যাত্রীকে সেটা মেনে নিতে হবে। সেখানে কেউ কোনো বাধা দিতে পারবেন না। যদি কেউ এক্ষেত্রে বাধা দেন, তাহলে ভবিষ্যতে তার বিমানে চড়াই বন্ধ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল শনিবার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণকাজের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিমানবন্দরের যাত্রী ও কার্গো পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বাহিনীপ্রধানগণসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনারা যখন বিদেশে যান, তখন যেভাবে নিরাপত্তাটা নিশ্চিত করা হয়, ঠিক সেইভাবে আমাদের বিমানবন্দরে করতে হবে এবং এটা সবাইকে মেনে নিতে হবে। একটা কথা মনে রাখবেন, আমি সারা দিন দেশের জন্য কাজ করি। কোথায় টুকটাক কী হয় না হয়, সেই খবর নেওয়ার চেষ্টা করি। কাজেই কেউ কোনো রকম অনিয়ম ও ব্যত্যয় ঘটালে সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে খবর চলে আসে। এটা সবাইকে মনে রাখতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের যারা বিদেশে কাজ করে, যাদের অর্থে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি, আমাদের রিজার্ভ নিশ্চিত হয়, তারা যখন কর্মস্থল থেকে দেশে ফেরে, নানাভাবে তাদের অনেক সময় হয়রানি করা হয়। তবে এখন এটা অনেকটা কমে গেছে। তারপরও আমি বলব, তাদের সুবিধাগুলো দেখতে হবে। তাদের যেন কোনো রকম হয়রানি এখানে করা না হয়।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি আমার জীবন উত্সর্গ করেছি বাংলাদেশের জনগণের জন্য। এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন যেভাবে আমার পিতা চেয়েছিলেন, আমি সেভাবেই করতে চাই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দিন-রাত পরিশ্রম করব দেশের উন্নয়নের জন্য। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থ উপার্জন করবে আর দেশের উন্নয়নের কাজ সঠিকভাবে হবে না, সেখান থেকে কেউ অসাধু উপায়ে নিজের ভাগ্য গড়তে যাবে, সেটা কখনো সম্ভব হবে না। এটা আমরা কখনো বরদাশত করব না।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত করে গড়ে তুলতে চাই।’ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পরই বিমানের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে তার সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তবে তিনি বলেন, যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে হলে একদম বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। তাহলে সকালে এক রকম বিকেলে অন্যরকম তারা করতে পারে।’ আরো তিনটি বিমান আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ রুটের জন্য আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আরো কিছু বিমান যুক্ত করা হবে, যাতে দেশের সব বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়।’ কক্সবাজার বিমানবন্দরকেও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যাতে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে এবং পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্যে যত বিমান যাতায়াত করে, তাদের একটা ‘হাব’ হতে পারে কক্সবাজার। সেখানে রিফুয়েলিংসহ কয়েক দিন যাতে কেউ প্রয়োজনে বিশ্রাম নিতে পারে। এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।
আমাদের নিজস্ব কোনো কার্গো বিমান না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে অত্যাধুনিক কার্গো ভিলেজ নির্মাণ করা হবে। আমরা দুটি কার্গো বিমানও ক্রয় করব। কারণ কার্গো বিমান ছাড়া বিমান লাভজনক হবে না।’ এ সময় তিনি বিমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে গুরুত্বারোপ করে বিমানবন্দরে বিদেশিসহ প্রবাসফেরত বাংলাদেশিদের আগমনের সময়কার নানা হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট মহলকে নির্দেশনা প্রদান করেন। শুধু বিমান ক্রয় নয়, এটা যেন যথাযথভাবে চলে এবং বিমানের যাত্রীসেবা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদেরও তিনি যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণকে দেশের ‘অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের একটি সূচক’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের সব স্থান থেকে বিমানের টিকিট ক্রয়ের সুবিধা-সংবলিত একটি মোবাইল অ্যাপসও উদ্বোধন করেন। বেসামরিক বিমান পরিবহন পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম মাহবুব আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন এবং পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান র আ ম উবায়দুল মোতকাদির চৌধুরী, সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মহিবুল হক, বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত নাওকি ইতো ও জাইকার বাংলাদেশ অফিসের চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ হিতোসি হিরোকা বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে বিমানের নির্মাণাধীন তৃতীয় টার্মিনাল এবং সিভিল এভিয়েশনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি অডিও ভিজ্যুয়াল পরিবেশনা প্রদর্শিত হয়। মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধানগণ, সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সদস্যসহ আমন্ত্রিত বিপুলসংখ্যক অতিথি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
তৃতীয় টার্মিনালে যেসব সুবিধা থাকবে
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে গতকাল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে স্বপ্নের থার্ড টার্মিনালের। বিমানের সদর দপ্তর বলাকার দক্ষিণ পাশের বিশাল উদ্যানে এখন দিবারাত্রি চোখে পড়ে দেশি-বিদেশি একদল পরিশ্রমী মানুষের কর্মতত্পরতা। এই টার্মিনাল হবে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়। টার্মিনাল নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি স্থাপনে কোয়ালিটির বিষয়ে কোনো আপস করা হচ্ছে না। ২ লাখ বর্গমিটারের টার্মিনাল ভবনটি হবে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড—যাতে থাকবে গোটা বিমানবন্দরের যে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নির্ণয়ের সংকেত। শুধু থার্ড টার্মিনাল দিয়েই বছরে কমপক্ষে ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে বর্তমান টার্মিনালের ৮০ লাখ যোগ হলে বছরে সেবা দেওয়া যাবে ২ কোটি যাত্রীকে। প্রায় সাড়ে ৩০০ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে এই টার্মিনাল।
বিমানবহরে আরো দুটি ড্রিমলাইনার
জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসংবলিত সম্পূর্ণ নতুন পঞ্চম ও ষষ্ঠ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ বোয়িং ৭৮৭-৯ যুক্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিতা কেটে বিমানের পঞ্চম ও ষষ্ঠ ড্রিমলাইনার ‘সোনার তরী’ এবং ‘অচিন পাখি’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ দুটি উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিমানবহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াল ১৮টিতে।